সব তলে তলে নয়, প্রকাশ্যেই আরেকটি নির্বাচন তুলে নেওয়ার যাবতীয় চেষ্টা চলছে। যে যা করুক-বলুক ‘নির্বাচন হবেই’ এমন সাফকথা আছে সরকারের ওপর মহল থেকে। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতির কথা জানান দিচ্ছে নিয়মিত। এরই মধ্যে বলা হয়েছে, এক শতাংশ ভোট পড়লেও নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ হবে। আসন্ন নির্বাচনটিতে জনগণ না প্রশাসন, কে বেশি জরুরি এ প্রশ্নের জবাবও এরইমধ্যে মিলছে নানা ঘটনায়।
অভাব-অনটনের কারণে কৃচ্ছ্র সাধনের আহ্বানের মধ্যেও প্রশাসনকে প্রণোদিত রাখার কোনো কমতি নেই। অনুমোদিত পদ না থাকলেও পদোন্নতিসহ সুযোগ-সুবিধার অংশ হিসেবে এবার প্লট দেওয়া হচ্ছে সচিবদের। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিবসহ ১৮ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব প্লট উপহার পাবেন রাজধানীর অভিজাত আবাসিক প্রকল্প পূর্বাচলে। রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ-রাজউকের বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এখন শুধু বুঝিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা। ডিসি-এসপি- ইউএনওদের উপহারের তুলনায় সচিবদের এ প্রাপ্তি তত বড় নয়। ডিসি এবং ইউএনওরা বিলাসবহুল গাড়ি পেলে সচিবরা হেলিকপ্টারের হকদার। সেই তুলনায় তাদের সামান্য বা একটি করে প্লট বরাদ্দটা এক অর্থে কমই। তা রিজার্ভে যত টানই থাক, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যত খারাপই হোক, বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের যত নাভিশ্বাসই উঠুক। ভোটের আগে ‘তাঁহাদিগকে’ খুশি রাখা বেশি জরুরি। কৃচ্ছ্র জনগণের জন্য, প্রশাসনের জন্য নয়। কারণ তারা নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। আইনমন্ত্রীর যুক্তি এ রকমই।
গত মার্চে মাসে কৃচ্ছ্র সাধনের অংশ হিসেবে নতুন গাড়ি কেনা যাবে না বলে সরকার পরিপত্র জারি করেছিল। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত পাল্টে কেন ডিসি-ইউএনওদের জন্য বিলাসবহুল ২৬১টি গাড়ি কেনার তোড়জোড়? কোনো রাখঢাক না রেখে আইনমন্ত্রী ড্যামকেয়ারে সাংবাদিকদের বলে দিয়েছেন, যাদের জন্য নতুন গাড়ি কেনা হচ্ছে, তারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। কথা একদম পরিষ্কার। এতে মোট ব্যয় হবে মাত্র ৩৮০ কোটি টাকা। নির্বাচন ‘সুষ্ঠু করতে হলে ডিসি-ইউএনওদের ভালো গাড়ি দিতে হবে। তাদের বাইরে অন্যরা কি বাদ যাবেন? জাতীয় নির্বাচনের সময় সাধারণত ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ইউএনওরা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে ডিসি-ইউএনওদের চেয়ে অবদান একটু কম বলে বাকিরা বিলাসী গাড়ির সুযোগ থেকে বাদ পড়ে যাবেন?
না, বাদ পড়বেন না। অবশ্যই তারাও পাবেন। সেই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আরও দামি গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ১ আগস্ট মন্ত্রণালয় থেকে এক নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এখন সর্বোচ্চ ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি কেনা যাবে। আগে সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ছিল ৯৪ লাখ টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন ধাপে গাড়ির দাম বাবদ ব্যয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনে ডিসি-এসপি, ইউএনও-ওসি পর্যায়ের প্রশাসনিক ব্যক্তিরা কাজ করবেন মাঠে। কেন্দ্র কি ফাঁকা থাকবে? সেখানে কাজ করবেন সচিবসহ বাদবাকিরা। তাদের পরিশ্রম কম নয়। মাঠের কর্তারা গাড়ি পেলে তারা গাড়ির সঙ্গে বাড়িসহ আরও অনেক কিছুর আশা রাখতেই পারেন। তাই সেখানে এক হিসাবে প্লট অনেক বেশি কিছু নয়।
অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিপুল অঙ্কের টাকায় গাড়ি-প্লট সরকারের কৃচ্ছ্র সাধন নীতির পরিপন্থী বা জনগণের অর্থের অপচয় কিনা এ প্রশ্নের আর সময়-সুযোগ কোনোটাই নেই। এছাড়া এসব বরাদ্দে আইন-যুক্তি সবই আছে। নীতি-নৈতিকতা ফ্যাক্টর নয়। কেউ সরকারি চাকরিতে অবদান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলে তারা বিশেষ কোটায় প্লট পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন-মর্মে তো বলাই আছে। পদ-পদোন্নতি-পদায়ন দেওয়ার আইন-বিধিও আছে। অনুমোদিত পদ না থাকলেও প্রয়োজনে সরকার তা দিতেই পারে। সেই আলোকে পদ না থাকলেও আসন্ন নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। সামনে আরও দেবে। অনুমোদিত পদের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক পদোন্নতির কারণে এসব কর্মকর্তার বেশির ভাগকে আগের পদে কাজ করতে হলেই বা কী? অথবা তারা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-ওএসডি হয়ে থাকবেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও জনপ্রশাসনে এই কিছিমের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। দাতা-গ্রহীতা কোনোদিকেই সমস্যা হয়নি। সামনেও হবে না, সেই ধারণা করাই যায়। এতে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হবে এমন শঙ্কা দেখছে না সরকার। টানা সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাদৃষ্টেই সরকারের এমন কনফিডেন্স।
ডিসি-ওসিসহ প্রশাসনের কেউ কেউ নির্বাচনের ঢের আগ থেকেই সরকারি দলের জন্য বেদম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানানোর ঘটনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে জামালপুরের ডিসি ইমরান আহমেদকে প্রত্যাহার করে আরেক জায়গায় দেওয়া হয়েছে। বদলিকৃত জায়গায় তিনি মোটেই অন্য আহ্বান জানাবেন না। জামালপুরে জেলা প্রশাসক হিসেবে তার বক্তব্যে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকারকে আবার ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান তিনি। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ওসি ফারুক হোসেন অর্থমন্ত্রী ও নাঙ্গলকোটের সংসদ সদস্য আ হ ম মুস্তফা কামালকে আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত করতে স্থানীয়দের প্রতি মিনতি জানিয়েছেন। ওসি ফারুক তার বক্তব্যে বলেন, ‘নাঙ্গলকোট উপজেলার মানুষ গণহারে গণমানুষের মতো করে উনাকে আবার নির্বাচিত করবেন। এটা আমার মনের দিক থেকে আপনাদের প্রতি মিনতি।’ এই ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হলে তাকে কুমিল্লা পুলিশ লাইনসে বদলি করা হয়। বদলিকৃত জায়গায় তিনি এখন কার জন্য ভোট চান, ভোটের সময় কী করবেন তা বুঝতে তার পেছনে ক্যামেরা বা আড়িপাতা দরকার করে না। ডিসি-ওসিদের ভোট চাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। আগেও ঘটেছে। একজন ডিসি বা একজন ওসির বক্তব্য অবশ্যই পুরো প্রশাসন বা পুলিশ বাহিনীর নয়। তারা আবার প্রশাসন-পুলিশ থেকে বিচ্ছিন্নও নন। কোনো একজন ডিসি বা ওসির এভাবে প্রকাশ্যে ভোট চাওয়ার বাস্তবতা তৈরি হলো কেন? প্রশ্নটির বিশ্লেষণ দরকার। তারা মোটেই আবেগে বা ইবাদত হিসেবে এটি করছেন না। তাদের এই অতি উৎসাহের পেছনে পদ-পদায়ন- পদোন্নতিসহ বেনিফিশিয়ারি হওয়াই মুখ্য। সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতি, বদলি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য যে এখন একটি বড় শর্ত, সেই অভিযোগও পুরনো।
এসবের বাইরে নির্বাচনের বছরে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুশি করার যথেষ্ট প্রকল্পও আছে। উচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভবন, সড়ক, সেতু নির্মাণের মতো প্রকল্প। ডিসেম্বরের আগে সাতটি বড় প্রকল্প উদ্বোধন হবে। সেখানে বিশেষ প্রাপ্তিযোগ আছে তাদের। এরপরও নির্বাচন প্রভাবিত করতে ‘আমরা’ কিছুই করব না বলে নিশ্চিয়তা দেওয়া হচ্ছে সরকার ও সরকারি দল থেকে। ডিসি-ওসি-এসি-ভিসিরা জনকর্মচারী। জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় তাদের বেতন হয়। তারা কোনো দলের কর্মচারী নন। এরপরও কর্ম করেন দলের জন্য। এর ফল যা হওয়ার তা-ই হয়, হয়ে আসছে। খেলোয়াড়-আম্পায়ার একই দলভুক্ত হলে গোল এক দিকেই হয়। তা রাজনীতির মতো বাণিজ্যেও। যারা পণ্যের ব্যবসা করেন তারা বা তাদেরই লোকজন নীতিনির্ধারণী জায়গায় বসে আছেন। এতে গোল খাচ্ছে জনগণ। আর ফল খাচ্ছে খানেঅলারাই। খাওয়া বা প্রাপ্তির আশা অন্যদেরও থাকে। ডিসি-এসপি-ওসি-সচিবদের মতো না হলেও নির্বাচনে ভূমিকা রাখা পক্ষ আরও আছে। ডিসি-ওসিরা ভোটের সব কাজ করে ফেললে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তেমন কাজ থাকে না। তাদের মধ্যেও এক ধরনের জেলাসি তৈরি হচ্ছে। আর শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যদের মধ্যে ভর করছে অপ্রাপ্তি। তাদের ভাগ্যে এমন পদ-পদোন্নতির তোহফা মেলে না। ন্যায্যটাই পান না ঠিকমতো।
এর মারাত্মক জের পড়ছে নানা সেক্টরে। মেডিকেল থেকে পাস করার পরেও বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশে যোগ দিচ্ছেন অনেক মেধাবী তরুণ। এর নেপথ্য কারণ যশ, খ্যাতি, সম্মান, দাপট এবং অর্থ। শিক্ষকদের পদোন্নতি দিয়ে অন্তত সম্মানটুকু দেওয়ার অভ্যাসও হয়ে ওঠেনি রাষ্ট্রের। তারা নির্বাচনে তেমন কাজে আসে না বলে? আবার এ কথাও তো সত্য, শিক্ষকরাও কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভোট কেন্দ্রে অবদান রাখছেন বা রাখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। নিজস্ব দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে আন্দোলনে নেমে মার খেয়ে কোনোমতে বাড়ি ফিরে গেছেন। কিন্তু বিশেষ বিশেষ সার্ভিসের লোকদের দাবি করতে হয় না। এর আগেই প্রাপ্তির চেয়েও বেশি জুটে যায়। এমন বৈষম্য বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্পিরিট ‘সাম্য ও সামাজিক সুবিচার’-এর সঙ্গেও যায় না। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রশাসনকে দিয়ে সবাইকে ‘শাসন’ করা, শাসিত রাখা সহজ বলে ক্ষমতাসীনরা সেই কাজটি বরাবরই করে। ভোটের মাঠে তারা আরও লাগসই। কিন্তু সমাজের জন্য মোটেই টেকসই নয়। রাষ্ট্রের সব সুবিধা একটি গোষ্ঠীর পকেটে চলে গেলে অন্যদের তা আহত করে।লেখক
সাংবাদিক-কলামিস্ট
mostofa71@gmail.com