কুরিয়ারে ঝুঁকি

মাদক-অস্ত্র-বিস্ফোরকের চালান আসার শঙ্কা

কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপর কোনো নজরদারি নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাধে গজিয়ে উঠেছে এবং উঠছে এসব প্রতিষ্ঠান। একশ্রেণির দুর্বৃত্ত আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরকের চালান আনছে এসব সার্ভিসের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময় অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারও করেছে আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থা। এসব কুরিয়ার সার্ভিসে সন্দেহজনক মালপত্র শনাক্তের জন্য কোনো ধরনের স্ক্যানার মেশিন নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই পণ্য পরিবহন চলছে দেশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে।

সম্প্রতি ঢাকার বেশ কটি কুরিয়ার সার্ভিসে সরেজমিনে গিয়ে নানা অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫০টির বেশি কুরিয়ার সার্ভিস আছে বলে জানা গেছে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে নজরদারি না থাকায় অপরাধ-বিশ্লেষকরাও অবাক হয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারির আওতায় আনতে না পারলে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি গোষ্ঠী বড় অপরাধ সংঘটনের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র বা বিস্ফোরকের চালান নিয়ে আসবে। ফলে রাষ্ট্র বড় ঝুঁকিতে পড়বে।

কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স দেওয়া ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মনিটরিং করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ। লোকবলের অভাবে এই কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো মনিটরিং করতে পারে না।

গত ৯ অক্টোবর এসএ পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিসে অগ্নিকাণ্ডের প্রধান উপাদান ছিল পটকা ও আতশবাজি। পটকা বা আতশবাজি বিস্ফোরকদ্রব্য কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহনের একটি মাধ্যম কুরিয়ার সার্ভিস। কিন্তু এ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি নেই। দু-একটি কুরিয়ার সার্ভিস ছাড়া অন্যগুলোতে মালামাল স্ক্যানের কোনো যন্ত্র নেই। এ সুযোগটিই কাজে লাগায় স্বার্থান্বেষী মহল মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে কোনো রাজনৈতিক মহল পরিস্থিতি ঘোলা করতে অজ্ঞাতপরিচয়ে বিস্ফোরকদ্রব্য বা স্বার্থান্বেষী মহল পণ্যের নাম গোপন করে মাদকদ্রব্য নিয়ে আসে, তাহলে কিছুই করার থাকবে না।

গত ৫ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মতিঝিল থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করে। ওই ব্যক্তি চট্টগ্রাম থেকে ৫০টি ব্যাগ কুরিয়ার করেন ঢাকায়। একটি ব্যাগে ৫০ হাজার ইয়াবা ছিল। ওই ব্যাগগুলো ঢাকায় ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দারুস সালাম থানা এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ডিবি শাখায় কর্মরত এসআই আবদুল জলিল মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয় কুরিয়ারে মাদক, অস্ত্র ও গুলি গোপালগঞ্জে পাঠানোর অভিযোগে। ওই ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্ত্র ও মাদক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত নির্বাচন উপলক্ষে এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজনৈতিক কারণে অস্ত্র ও মাদকের চালান কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বেড়ে যেতে পারে। এর প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও মনিটরিং বাড়াতে হবে।’

মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের সদস্য-১ (উপসচিব) ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লোকবল সংকটের কারণে সেভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হয় না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিই।’

কুরিয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসের অনুমতি পেতে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট-ট্যাক্সের সনদ, প্রধান কার্যালয় ও শাখার তালিকা, আমদানি-রপ্তানির নিবন্ধন সনদ, যানবাহনের তালিকা, বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের তালিকা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি, যৌথ মালিকানা হলে তার অ্যাগ্রিমেন্টের কাগজ, নিজস্ব জমিতে অফিস হলে তার মালিকানার কপি, কুরিয়ার সার্ভিসের অর্গানোগ্রাম ও পদসোপান প্রভৃতি একগুচ্ছ কাগজ জমা দিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়।

সম্প্রতি ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, মালিবাগ, আরামবাগসহ কয়েকটি স্থান এবং গাজীপুরে কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে সুন্দরবন, এসএ পরিবহন, করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিসে মালামাল সনাতন পদ্ধতি অর্থাৎ হাতে হাতে বিশ্বাসের ভিত্তিতে চেক করে ছাড়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং করার মতো কেউ নেই। মালিবাগ, খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের সামনে জেআর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসে গিয়ে দেখা গেছে, মালামাল নিরীক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরহাদুল ইসলাম বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন; দেখলেই বুঝতে পারেন। তারপরও তারা পরীক্ষা করে মাল পাঠান। তাদের স্ক্যানার নেই।

দেশ রূপান্তরের চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও গাজীপুর প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় সুন্দরবন, এসএ পরিবহন, করতোয়া, জেআর পার্সেল, কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসে দেখেন সেখানে স্ক্যানারে নয় ম্যানুয়ালি মালামাল দেখা হয়। সেখানে কর্মরতরা বলেন, তারা মালামাল দেখে রাখেন। সাধারণত খোলেন না। তবে সন্দেহ হলে চেক করেন। মালামাল গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখেন। পরিচিত হলে মালামাল বিশ্বাসের ওপর পাঠিয়ে দেন। তারাও মানেন যে, এতে অনেক সময় ঝুঁকি থেকে যায়। খুলনা প্রতিনিধি জানান, সেখানে প্রায় ২০টি কুরিয়ার সার্ভিস আছে। সেখানেও একই অবস্থা।

বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিস যেমন ডিএইচএল, ফেডএক্স, টিএনটি প্রতিটি বাক্স বা খাম খুলে পরীক্ষা করে এবং প্রেরকের সামনেই সেটা বন্ধ করে। এরপর একটা নির্দিষ্ট স্থানে রাখে। সেখানে আবার স্ক্যান করা হয়। বিমানে ওঠানোর আগে আবার স্ক্যান করা হয়। বাংলাদেশের কুরিয়ার সার্ভিসগুলো স্ক্যান মেশিনের দামের দোহাই দিয়ে ও ব্যবসার আয়তনের কথা বলে এ বিষয়ে নজর দেয় না।

কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান পুলক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে ১৫০টির মতো কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। দু-একটি কুরিয়ার সার্ভিস ছাড়া কারোর স্ক্যানার নেই। কারণ একটি মেশিনের দাম ৫ কোটি টাকার ওপর। সে কারণে এর পেছনে কেউ বিনিয়োগ করে না। তবে আমরা সচেষ্ট থাকি যেন মাদক বা অস্ত্রের চালান কুরিয়ারের মাধ্যমে আসতে না পারে। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে। সে ক্ষেত্রে তারা জড়িতদের আইনের আওতায় নিতে পুলিশকে সহযোগিতা করেন।’ তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন ঘিরে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটানোর জন্য অস্ত্র বা মাদক বা বিস্ফোরক যাতে কুরিয়ারের মাধ্যমে না যেতে পারে সে বিষয়ে স্টেক হোল্ডারদের নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু নির্বাচন নয়, সারা বছরই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর রাখতে হবে, মনিটরিং করতে হবে।’

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক সুলতানা ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পটকা, চকলেট বোমা বা যেকোনো ধরনের বোমা অবৈধ। যেসব বিস্ফোরকদ্রব্য আমাদের পরিদপ্তরের কার্যতালিকার মধ্যে আছে, সেগুলো আমদানি ও মজুদ করতে আমাদের ছাড়পত্র লাগে। এর বাইরের কিছুতে নজরদারি আমাদের এখতিয়ারাধীন নয়। মনিটরিংয়ের স্ট্রেংন্থ আমাদের নেই। আমরা লাইসেন্স দেওয়ার সময় চেকিংটা ভালো করে করি।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন সময় তাদের নিরাপত্তা সভাগুলোতে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি থাকেন। সেখানে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার কথাও বলা হয়।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় মাদক পরিবহন হয়েছে, তাই জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কেউ অস্ত্র পরিবহন করবে কি না বা করছে কি না সে ব্যাপারে আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কেউ এগুলো কুরিয়ারে পরিবহনের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জনসংযোগ) ইনামুল হক সাগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কীভাবে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান প্রতিরোধ করা যায় সে ব্যাপারে এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করা যায় সে বিষয়ে আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে।’