আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে গমের দাম কমলেও দেশের বাজারে এর সুফল মিলছে না। এর মধ্যেই আবার প্যাকেটজাত আটার দাম ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু সেই দামের প্যাকেটজাত আটা বাজারে না আসতেই দাম বেড়ে গেছে প্রতি প্যাকেটে ১০ টাকা, অর্থাৎ কেজিতে ৫ টাকা।
করোনা মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে গমের দামে রেকর্ড গড়েছিল। কৃষ্ণসাগর হয়ে নিরাপদে যাতে শস্য পরিবহন হয়, সে জন্য তুরস্কের মধ্যস্থতায় দেশ দুটির মধ্যে শস্যচুক্তির কল্যাণে বিশ্ববাজারে গমের দাম নেমেছে অর্ধেকে। তার ধারাবাহিকতায় এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কমেছে ৩১ শতাংশ। শতকরা যতটা বেড়েছে, সেই তুলনায় নামমাত্র দাম কমেছে দেশের বাজারে।
আমদানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আটার দাম ৩১ শতাংশ কমলেও এক বছরে আটা উৎপাদানে অন্তত ৫০ শতাংশ খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ডলারের দাম বৃদ্ধি। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। গ্যাস-বিদ্যুৎ মিলিয়ে আরও ১২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কমলেও দেশের বাজারে এর প্রভাব তেমন একটা পড়েনি।
জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের পরিচালক (ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনস) মো. শফিউল আতাহার তাসলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও দেশের মানুষ তার সুবিধা নিতে পারছে না। এর বড় একটা কারণ, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া।
তিনি বলেন, এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩১ শতাংশ কমেছে এটি যতটা সত্যি। তার থেকে বেশি উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ২০২২ সালের দিকে ১ ডলারের মূল্য ছিল ৮৫ টাকা। কিন্তু তা এক বছরের ব্যবধানে ৩৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। খরচ বাড়ায় শুধু নারায়ণগঞ্জে ৯০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, গতকাল খুচরা পর্যায়ে প্যাকেটের আটার দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। আর খোলা আটার দাম ছিল প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৫ টাকা।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, নতুন করে দাম বাড়ার ঘোষণাতেই খুচরা বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দোকানিরা দুই কেজির প্রতি প্যাকেট আটা ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন; যা দুদিন আগেও ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, দুই সপ্তাহ ধরে কোম্পানির প্রতিনিধিরা বাজারে আটা সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। যা দিচ্ছেন তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। আবার কয়েকটা কোম্পানি সরবরাহ ঠিক রাখলেও পুরনো আটা নতুন দামে বিক্রি করছেন তারা। দামের বিষয়ে পান্থপথের মা স্টোরের স্বত্বাধিকারী সাইফুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে এই যুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ডলারের দাম বাড়ার কথাও বলেন।
প্রায় একই কথা বললেন তেজগাঁও এলাকার চাঁদপুর স্টোরের বিক্রয়কর্মী শফিক। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার যথেষ্ট কারণ জানতে পারে বিশ্ববাসী। কিন্তু দেশে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার কারণ জানতে পারে না মানুষ। তবে অধিকাংশ সময় এর জন্য বড় ব্যবসায়ীরা দায়ী।
পুরনো আটা নতুন দামে বিক্রির বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য বিপণনকারী কোম্পানি টি কে গ্রুপের পরিচালক (ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনস) মো. শফিউল আতহার বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়ে তার সঠিক ধারণা নেই। কিন্তু বাজারে আটা-গমের সংকট নেই। উৎপাদন খরচ বাড়ায় আটার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তারা। কিন্তু এখনো নতুন দামের আটা বাজারে আসেনি। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে বাজারে নতুন দামের আটা পাওয়া যাবে।
খোলাবাজারে খবর নিয়ে জানা যায়, প্যাকেটজাত আটার মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণায় খোলা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। কেজিতে ২ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে ৪৩ টাকায়; যা গত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৪১ টাকায় বিক্রি হয়েছে।