‘হামুন’তাণ্ডবে অচল কক্সবাজার

আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই তাণ্ডব চালিয়ে কক্সবাজার অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় হামুন। তবে যাওয়ার আগে সাড়ে ৪ লাখ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে ঘূর্ণিঝড়টি। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিধ্বস্ত করার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে কক্সবাজারকে প্রায় অচল করে দিয়ে শান্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় হামুন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার পর পরই গড়ে ১০০ কি.মি. বেগে কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় হামুন। তবে চলে যাওয়ার আগে কক্সবাজার ও মহেশখালি পৌরসভা সহ জেলার ৭১ টি ইউনিয়নেই হামুন তাণ্ডব চালিয়েছে। এতে জেলার ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫৪৯ জন বাসিন্দাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এছাড়া হামুন তার সর্বোচ্চ ১৪৮ গতিতে বিধ্বস্ত করেছে ৪২ হাজার ৯৫৯ টি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৫ হাজার ১০৫ টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা ৩২ হাজার ৭৪৯ টি। তাছাড়া হামুনের তাণ্ডবে পল্লী বিদ্যুতের ৩৫৪ টি বৈদ্যতিক খুঁটি ভেঙে গেছে, ২৩ টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়েছে, ৪৯৬ টি স্থানে তার ছিঁড়ে গেছে,৮০০টি স্থানে গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভা, সদর উপজেলা, মহেশখালী,কুতুবদিয়া,ও চকরিয়ায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। পাশাপাশি এসব এলাকায় মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামুন তাণ্ডবে শহরের হলিডে মোড়, সদর হাসপাতাল সড়কেই উপড়ে পড়েছে ২৫টির বেশি গাছ। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে বৈদ্যুতিক তার। ফলে এসব সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলাকাগুলো এখনও বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কহীন।

শুধু এই সড়কই নয়, হামুনে লন্ডভন্ড হয়েছে পৌরসভার ১, ২, ৫,৬,৭,৮,৯ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহেনা আক্তার পাখি বলেন, হামুনে ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৯৫ ভাগ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

প্যানেল মেয়রের এমন তথ্য পেয়ে ওই ওয়ার্ডে গিয়ে কথা হয় দক্ষিণ কুতুবদিয়া পাড়া গ্রামের লুৎফুন নাহারের সঙ্গে।

নিজের ভেঙে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমি ৫ মেয়ে নিয়ে এই ঘরে থাকতাম। এখন আমি কি করব বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ওই এলাকার বাসিন্দা জেলে ফরিদুল আলম বলেন, আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে আমাদের কোনোভাবেই সতর্ক করা হয়নি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, হামুন তাণ্ডবে শহরের চেয়ে গ্রামের অবস্থা করুণ। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহেশখালি ।

এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ বাদশা বলেন, দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়কে উপসড়কে বুধবার রাত সাড়ে ৭ পর্যন্ত অনেকগুলো গাছ পড়ে আছে। মঙ্গলবার রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। মানুষের ঘরবাড়ি পানের বরজ বিধ্বস্ত হয়েছে।

কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনের কাজ চলছে। আপাতত ১৫০ পরিবারকে ঢেউটিন দেওয়া হয়েছে ।এদিকে বিদ্যুৎ ও মোবইল নেটওয়ার্ক না থাকায় কক্সবাজারের স্থানীয় একটি পত্রিকাও বুধবার প্রকাশিত হয়নি।

কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বুধবার কক্সবাজারের স্থানীয় ২৪টি দৈনিক প্রকাশিত হয়নি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ঘূর্ণিঝড় হামুনের আঘাতে এ পর্যন্ত তিনজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। হামুনের আঘাতে সড়ক উপসড়কে গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক না থাকায় কক্সবাজারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপনের কাজ চলছে। পুরো জেলায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সচল করতে কয়েকদিন সময় লাগবে।