আনন্দ নগরে বিষণ্ন বাংলাদেশ

ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতার বিমানে চড়ার পর থেকেই মাথায় ঘুরছিল এপার বাংলার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কবীর সুমনের একটি গানের কটি লাইন, ‘মন খারাপ করা বিকেল মানেই মেঘ করেছে...তার সুরটা চেনাচেনা বলেই ছোঁয়াচ লাগে, কলকাতাতে সন্ধে হবার একটু আগে...।’

এই গান কি সুমন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে লিখেছিলেন? একটু মিলিয়ে দেখুন তো! দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাবে একদম। কাল বিকেলে কলকাতায় পা রেখেছে বাংলাদেশ দল। এই শহরের বিকেলের আকাশটা মেঘলা ছিল না। তবে তিনশো বছরের পুরনো শহরের তাজ বেঙ্গল হোটেলে চেক-ইন করা বাংলাদেশ বহরের আকাশ ছিল নিকষ কালো অন্ধকার। ভীষণ গোমরামুখো একটা আবহ সেখানে। আনন্দ শহরে (সিটি অব জয়) এসেও যেন শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রিকেটাররা। আগের রাতেই বড্ড বাজে আরেকটা হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছে তাদের। বিশ্বকাপে টানা চার হার। সেমিফাইনালের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ওয়াংখেড়েতে ১৪৯ রানের বড় হারে। তাই আর যা-ই হোক, কলকাতার নেক নামটার সঙ্গে বাংলাদেশ দলকে এখন একেবারেই মেলানো যাবে না।

আফগানিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর পর ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বিধ্বস্ত হয়ে দশ দলের আসরে তলানিতে বাংলাদেশ। সেই লজ্জা এড়াতে সামনে তাকানোর বিকল্প নেই। আসছে চার ম্যাচে ইতিবাচক কিছু কুড়িয়ে নিতে না পারলে ২০০৩-এর মতো ইতিহাসের পাতায় লজ্জাজনক আরেকটি অধ্যায় লিখতে হবে সাকিবদের নিয়ে।

ইডেনে ২৮-এ নেদারল্যান্ডসের পর ৩১-এ প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। এরপর ৬ নভেম্বর দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। ১১ নভেম্বর পাঁচবারের বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচটিকে অঙ্ক পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করলে আগের তিনটি শর্টহ্যান্ড, সমাজকল্যাণ, ধর্ম পরীক্ষার সঙ্গে মেলাতে পারেন।

আফগানদের বিপক্ষে লেটার মার্কসে শুরুর পর যে চারটি পরীক্ষা হয়ে গেছে তাতে টেনেটুনেও পাস নম্বর মেলেনি; বরং কিছু কিছু হারে বাংলাদেশের সামর্থ্য নিয়েই উঠে গেছে প্রশ্ন। যে দলটি বিশ্বকাপের অভিজাত মঞ্চে পা রেখেছিল দারুণ প্রত্যয়ে।

বিশ্বকাপ সুপার লিগের র‌্যাঙ্কিংয়ে নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের ঠিক পরের স্থানটিই ছিল বাংলাদেশের, সেই তারাই কিনা বিশ্বকাপে খেলতে এসে পথহারা পথিক! বিশ্বকাপ মানেই হলো, এখানে চলবে না কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কাটাছেঁড়া যা সেটা বিশ্বকাপের আগেই। এই মঞ্চটা চার বছরে কতটা এগুলো, তার প্রমাণ দেওয়ার। ঠিক যেমনটা করছে সুপার লিগে র‌্যাঙ্কিংয়ে আটে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা।

এই আসরে প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানরা ফি ম্যাচেই চারশো, পৌনে চারশো করছেন অনায়াসে। বোলাররাও সমান্তরালে ধসিয়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষের ব্যাটিং অর্ডার। অথচ এই দলটিই বিশ্বকাপের আগে ছিল পথহারা। ঠিক এখন যেমন বাংলাদেশের দশা।

বাংলাদেশের এই দুর্দশার কারণ দেশ-বিদেশের ক্রিকেট পন্ডিত, সাবেকরা খুঁজে নিচ্ছেন নিজের মতো করে। মোটা দাগে তারা সামনে টেনে আনছেন দলের ভেতরকার অস্থিরতা ও টিম ম্যানেজমেন্টের দল, বিশেষ করে ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে অতিমাত্রায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অনেকে আবার বিশ্বকাপের আগে তামিম ইকবাল ইস্যুতে দলের মোমেন্টাম নষ্ট হয়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন।

অনেকের দাবি, মিরপুরের স্লো-লো উইকেটে খেলার অভ্যাসে ভারতের স্পোর্টিং উইকেটগুলো পড়তে না পারাকে। এসব নিয়ে মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সমানে চলছে ময়নাতদন্ত। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিকট অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে তো চলবে না। বাইরের আলোচনা-সমালোচনা এড়িয়ে দুঃসময় কাটিয়ে হারানো পথের দেখা পেতে তারা এসেছেন কলকাতায়।

পাঁচ ম্যাচের চারটিতে হেরে আত্মবিশ্বাস তলানিতে। সেটা ফিরে পেতে হবে ডাচদের বিপক্ষে। সব হারিয়েও মানুষ চায় খড়কুটো আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়াতে। বাংলাদেশকেও আসছে চার ম্যাচে করতে হবে তাই। নিজেদের অবস্থানটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন অধিনায়ক সাকিব। পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, পুরো দল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে নিজেকে সামনে থেকে দিতে হবে নেতৃত্ব। সেটা অবশ্যই ব্যাটে-বলে। ব্যাট হাতে দিশা খুঁজে পাচ্ছেন না সাকিব। ২০১৯ বিশ্বকাপে ৬০৬ রান করা বাংলাদেশ অধিনায়ক পাঁচ ম্যাচে মোটে করেছেন ৫৬ রান। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০ রানই সর্বোচ্চ। প্রোটিয়াদের রানের পাহাড় টপকাতে গিয়ে করেছেন মাত্র ১ রান। সাকিবের ব্যাট হাসছে না তার মতো করে। তাই তো গোটা দলের গন্তব্য যখন কলকাতা, তখন সাকিব ঢাকায়! এরপর মিরপুরের নেটে দীর্ঘক্ষণ ঘাম ঝরিয়েছেন ছোটবেলার কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে পাশে নিয়ে। তার যে ফিরতে হবে রানে। নইলে...।

দিগভ্রান্ত সতীর্থদের পথ দেখাতে আছেন আরেক যোদ্ধা। তিনি মাহমুদউল্লাহ। বিশ্বকাপের দলে যার সুযোগ পাওয়াটা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, সেই তিনিই কিনা অন্যদের ব্যর্থতার দিনে একাই লড়লেন এবং এই বিশ্বকাপে দলের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি করলেন। প্রোটিয়ারা ৩৮২ করার পরই বোঝা গিয়েছিল এই ম্যাচটা আর বাংলাদেশের হাতে নেই। এরপর যখন ৮১ রানেই ৬ উইকেট নেই, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রানে হারের শঙ্কাটা যখন চোখ রাঙাচ্ছে, তখন টেলএন্ডারদের নিয়ে মাহমুদউল্লাহ লড়েছেন, খেললেন ১১১ বলে ১১১ রানের ইনিংস। তাতে বাংলাদেশ শেষ করেছে ২৩৩ রানে। তারপরও হারের ব্যবধানটা অনেক।

এই হারে রানরেটে বেশ পিছিয়ে পয়েন্ট টেবিলে এখন দশে বাংলাদেশ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। মাহমুদউল্লাহর বিরুদ্ধ স্রোতে একার লড়াই, সাকিবের নিজেকে ফিরে পাওয়ার তীব্র বাসনা দেখে যদি হুঁশ ফেরে অন্যদের। নইলে আনন্দ শহরে বিষণ্ন বদনে পা রাখা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সফরটাই হয়ে উঠবে দুঃস্বপ্নের।