মাহমুদ বাদাভি। চোখের সামনে তিনি যে ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন, সেটি তার চেহারা দেখে আন্দাজ করা যায় না। ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের নির্জীব দেহ বের করে আনা, তাঁবুতে সাদা চাদরে মোড়ানো সারি সারি মৃতদেহ এবং বিমান হামলায় মাটির সাথে মিশে যাওয়া ইমারত। মাহমুদ বাদাভি তার চোখের সামনে মানবতা গুঁড়িয়ে যেতে, পুড়তে, ছিন্নভিন্ন হতে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক কঠিন পরিস্থিতি আসে। একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে, যা ঘটছে তার অনেক কিছুই দেখতে হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাত, মাথা… দেহ - যাই হোক, আমরা অভ্যস্ত।’
প্রত্যক্ষদর্শী মাহমুদ বাদাভির অ্যাম্বুলেন্স এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটে চলে। গাজার এক সরু গলিতে মাহমুদ দাঁড়ালেন বিমান হামলায় আহত দুই শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য। এক ব্যক্তি তার কোলে কিছু একটা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে এলেন। তার কোলে মারাত্মকভাবে আহত এক বালক।
মাহমুদের এক বন্ধু যিনি আহতদের উদ্ধারকার্যে নিযুক্তদের সাহায্য করছেন, তাকে চিৎকার করে ওই আহত বালক সম্পর্কে আরও যত্নশীল হতে অনুরোধ করে বলেন, ‘নাসির, ওর মাথা চৌচির হয়ে গেছে।’ তারপরও মাহমুদ বিচলিত না হয়ে শান্তভাব বজায় রাখেন। এমনটা নয় যে এই পরিস্থিতি তাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায় না।
কিন্তু মাহমুদ যে কাজে ব্রতী, তা সুষ্ঠু ভাবে করার জন্য স্থির থাকাটা ভীষণ দরকার, যাতে তিনি আহতদের দিকে নজর দিতে পারেন, যাদের বাঁচানো সম্ভব।
মাহমুদ বলেন, ‘এখানে যা অবস্থা তাতে বিরতি নেওয়ার ফুরসত আমাদের কারও নেই। পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। এখন আমাদের খোঁজার চেষ্টা করতে হবে, কোথায় এই বিস্ফোরণ হলো যাতে আহত আর মৃতদের কাছে পৌঁছাতে পারি।’ চিকিৎসা পরিষেবার কথা জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, ‘সবই চলছে।’
মাহমুদ যখন তার কাজে বাসা থেকে বের হন, তখন তার স্ত্রী আর ছয় সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন থাকেন। একইসঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরাও মাহমুদের নিরাপত্তার জন্য চিন্তায় থাকে। যেদিন বোমার হানা তীব্র হয় মাহমুদ চেষ্টা করেন, প্রতি ঘণ্টায় বাড়িতে ফোন করে কথা বলতে। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাও ভীষণ কঠিন। বাড়ির সকলে সুরক্ষিত আছে কি না সেটুকু জানার জন্যও যতটুকু পরিষেবা প্রয়োজন তাও অনেকসময় থাকে না।’
সংসার চালাতে মাহমুদ কঠিন পরিশ্রম করেন। সঙ্গে তার সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার তীব্র আকাঙ্খা। মাহমুদের এক মেয়ে ডাক্তার হতে চায়, বাবাই তার অনুপ্রেরণা। আর সঙ্গে রয়েছে গাজায় থাকাকালীন চোখের সামনে দেখা যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। মাহমুদের এক ছেলেও রয়েছে যে নার্স হিসেবে কাজ করতে চায়। অন্য এক মেয়ে শিক্ষিকা হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
এদিকে রাত ঘনিয়ে এলে একসময় বোমা হামলায় ছেদ পড়ে। মাহমুদ একটু থামেন, তারপর অ্যাম্বুলেন্স এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়ান। তার বাঁ হাতে ধরা স্ট্রেচার। পরের জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকেন মাহমুদ। উত্তেজনা ক্রমশ কমে আসে। কোনো অনুভূতিই যেন ছুঁতে পারে না তাকে। কিছুক্ষণের জন্য আবেগ-শূন্য হয়ে পড়েন তিনি, চোখ চলে যায় দূরে। যা কিছু তিনি দেখেছেন সেজন্য তার দু’চোখ কষ্টে ভরা।