প্রতি রাতে গরু চুরি

গাজীপুরের শ্রীপুরে গত আড়াই মাসে বিভিন্ন ক্ষুদ্র খামার ও কৃষকের বাড়ি থেকে রাতের আঁধারে দুই শতাধিক গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রতি রাতেই বিভিন্ন ইউনিয়নের কোনো না কোনো গ্রামে গরু চুরি হওয়ার খবর শোনা যায়। এতে নিঃস্ব হয়েছেন অর্ধশতাধিক গরু পালনকারী প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র খামারি। এমন গরু চুরির হিড়িকে দিশেহারা কৃষক ও খামারিরা।

প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো গ্রামে গরু চুরির নিয়মিত ঘটনা ঘটলেও নেই পর্যাপ্ত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা। চোরের দল মুহূর্তের মধ্যে গোয়ালের তালা কেটে গরু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের দায়িত্বহীনতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ। চুরির ভয়ে কৃষকরা গরু পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। খামারে থাকা গরু কম দামে বিক্রিও করে দিচ্ছেন কেউ কেউ। তবে এত গরু চুরির ঘটনা ঘটলেও থানায় গরু চুরির মামলা একেবারে যৎসামান্য। পুলিশ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা গরু চুরির পর থানায় অভিযোগ নিয়ে আসেন না। আবার কৃষকের অভিযোগ, থানায় মামলা করতে গেলে আরও হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। এতে উদ্ধার হয় না চুরি যাওয়া গরু। অন্যদিকে, পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে না এবং উল্টো মন্দ আচরণ করে বলেও ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের ২৬ তারিখে গোসিংগা ইউনিয়নের বাউনি গ্রামের কৃষক রিপন মিয়ার গোয়ালের তালা কেটে চারটি গরু নিয়ে যায় চোরের দল। যার মধ্যে একটি বড় গাভি আছে, যার বাজার মূল্য সাড়ে তিন লাখ টাকা। গাভিটি দৈনিক ১৫ কেজি দুধ দিত। এর তিন দিন পরই পাশের হায়াখারচালা উত্তরপাড়ার খোরশেদ আলমের চারটি গরু চুরি হয়। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় পটকা গ্রামের ইবরাহিম মুনশির চারটি গরু চুরি হয়। নারায়ণপুর গ্রামের ইসমাইলের পাঁচটি গরু চুরি হয়। তবে তাদের মধ্যে শুধু কৃষক রিপন মিয়া থানায় অভিযোগ দেন। পরে এ অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে পুলিশ।

এদিকে কাওরাইদ ইউনিয়নের শিমুলতলী গ্রামের কৃষক বাদল মিয়ার দুটি ষাঁড় গরু, নয়াপাড়ার কৃষক ইসমাইল হোসেনের একটি ষাঁড়, একটি গাভি, সোনাব গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ৪টি গরু, শিমুলতলার আক্তার মিয়ার দুটি গরু, উত্তর সোবাব গ্রামের বিল্লাল হোসেনর দুটি গাভি চুরি করে নিয়ে যায় চোরের দল। এমনিভাবে উপজেলা জুড়ে প্রতি রাতে বিভিন্ন গ্রামে গরু চুরির হিড়িক লেগেই আছে।

হায়াতখারচালা গ্রামের কৃষক রিপন মিয়া বলেন, ‘চুরির ঘটনা রাতেই টের পেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু করি। অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের কাছেও খবর পৌঁছানো হয়। চোর বাড়ি থেকে একটু দূরে নিয়ে গাড়িতে ভরে গরু নিয়ে যায়। পরে রাস্তায় গিয়ে গরু নেওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। গাড়িতে গরু তোলার স্থানে বেশ কয়েকটা স্প্রে পাওয়া গেছে, যা দিয়ে গরুগুলোকে অচেতন করা হয়েছে বলে ধারণা করছি। পরে সেগুলো পুলিশের কাছে দেওয়া হয়। ভোরে এ বিষয়ে ওসির কাছে গেলে তিনি বিরক্ত হয়ে খারাপ আচরণ করেন, একসময় গালিও দেন।’

গাড়ারণ গ্রামের ময়না ডেইরি খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুবায়ের আহম্মেদ বলেন, ‘বছর দেড়ের আগে আমাদের খামার থেকে একদল ডাকাত ট্রাক ভর্তি করে ১৫টি বড় আকারের গরু লুটে নিয়ে যায়। যার বাজার মূল্য ২০ লাখ টাকার বেশি।’

শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা সমন্বয় সভায় একাধিকবার গরু চুরির বিষয়ে কথা বলেছি। ওসির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবেও সহায়তা চেয়ে কথা বলেছি। কিন্তু চুরি তো থামছে না।’

শ্রীপুর মডেল থানার ওসি আবুল ফজল মোহাম্মদ নাসিম গরু চুরির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘অনেকে পুলিশকে জানালেও বেশির ভাগ কৃষক চুরির খবর চেপে রাখে। খামারিদের সতর্ক থাকতে হবে। রাত জেগে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে।’ ওসি আরও বলেন, ‘পুলিশ কৃষককে গাল দেয় না। পুলিশি টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারেও কাজ করছে পুলিশ।’