এই সংসার নিয়ে আমি কই যাব। ঢাকা শহরের রাস্তা চিনি না, এই শহরে কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। নেই কোনো জমানো টাকা। অভাবের সংসারে অষ্টম শ্রেণির পর একমাত্র ছেলের লেখাপড়া বন্ধ করে কাজে লাগিয়েছি, মেয়েটাকে কোনোমতে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। এখন আমি কী করব? কোথায় যাব? ধরা গলায় কথাগুলো বলছিলেন গত শনিবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত যুবদলকর্মী শামীম মিয়ার স্ত্রী লাইলি বেগম। আর মাঝেমধ্যেই আঁচলে চোখ মুছছিলেন তিনি। কীভাবে তার সামনের দিনগুলো চলবে সেটা না জানলেও স্বামীর লাশ দাফন শেষে যে তাকে নতুন এক লড়াইয়ে নামতে হবে তা বুঝে গেছেন তিনি। রাজধানীর মুগদা থানার মানিকনগর এলাকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সালাউদ্দিনের গলিতে নিহত শামীম মিয়ার বাসা। এই বাসাতেই স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতেন তিনি। রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার বাসায় গিয়ে কথা হয় শামীম মিয়ার স্ত্রী লাইলীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষটা ডাক্তার লেলিন স্যারের গাড়ি চালাইত, যে টাকা পেত তাই দিয়েই সংসার খরচ চলত। মানুষটা এখন নাই, কাল থেকে কীভাবে সংসার খরচ চলবে। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকে এই বাসায় ভাড়া থাকছি। প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ১৫০০ টাকা, গ্যাস-পানি বিল সঙ্গে সংসার খরচ, মেয়ের স্কুলের ফি আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ। এসব কীভাবে জোগাব?
তিনি বলেন, ‘মেয়েটারে পড়াশোনা করাইয়া চাকরি করাবে আর ছেলেটারে বিদেশ দেবে তারপর নাকি আমাদের অভাবের দিন শেষ হবেÑ এমন স্বপ্নের কথা বলে মানুষটা চলে গেল আমারে একা রেখে।’
লাইলী বলেন, ‘একমাত্র ছেলে অনিককে গাড়ির মেকানিকের কাজ শিখাইতে পাঠাইছি। সে মাসে ৪ হাজার টাকা পায়। এর বাইরে একটি টাকাও হাতে নেই। গ্রামে ফিরে যাব সেই উপায়ও নেই। বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য পাব সে আশাও নেই। কারণ তাদেরই অভাবের সংসার।’
লাইলী বেগম জানান, শনিবার পুলিশ ফোন দিয়ে তার স্বামীর আহত হওয়ার খবর জানায়। এরপর ছেলে অনিককে নিয়ে বিকেল ৪টার দিকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে যান তিনি। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার। তিনি বলেন, ফোন পেয়ে প্রথমে যাই পল্টন থানায়। সেখান থেকে জানানো হয় আমার স্বামী পুলিশ হাসপাতালে। এরপর হাসপাতালে গিয়ে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় বসেছিলাম। কিন্তু অনিকের বাবাকে দেখতে দেয়নি বা কোনো খবর জানায়নি। এই বলে আহত হইছে আবার কয় মারা গেছে। দুশ্চিন্তায় আমি কান্না করাও ভুলে গিয়েছিলাম। সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। সন্ধ্যা ৭টার পর বড় অফিসার এসে লাশ দেখান অনিকের বাবার। শুধু মুখ দেখেই চিনতে পারি।
লাইলী জানান ২০০৩ সালে বিয়ে হয় তাদের। শামীম নিয়মিতই বিএনপির প্রোগ্রামে যেতেন। গতকালও সকালে বাসায় পরোটা খেয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন। স্বামী কীভাবে মারা গেলেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাক্তাররা জানিয়েছেন হার্টঅ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু কোনো প্রতিবেদন আমাদের দেননি।
তবে নিহত শামীমের অসুস্থ বাবা ইউসুফ মিয়া বলেন, আমি ছেলের সঙ্গে থাকি না, গ্রামে থাকি। আমি জানতাম না শামীম যে রাজনীতি করে, জানতাম গাড়ি চালায়। এখন বউ আর প্রতিবেশীর কাছ থেকে শুনি সে বিএনপি করত।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ছেলের লাশ মাথায় নিয়ে যাওয়া কী কষ্টের তা তোমরা বুঝবা না। আমি এখন দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মানুষ। আমি কাকে দোষ দেব নিজের কপাল ছাড়া। ছেলেটারে এভাবে মেরে ফেলল!
তিনি বলেন, পুলিশ নিয়ে কিছু বললে, পুলিশ ধরবে, বিএনপি নিয়ে বললে বিএনপি বলবে এসব কেন বললেন। আবার সরকার নিয়ে বললে সরকার নিয়ে বিচার করবে। আমার বলার কোনো জায়গা নেই।
শামীমের ছেলে অনিকের ছোট্ট কাঁধে এখন বড় দায়িত্ব। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বোঝা গেল বাস্তব জগৎ সম্পর্কে খুব বেশি জানা নেই ১৭ বছরের অনিকের। অনিক বলেন, আব্বা সবসময় বলতেন, তুই বেশি করে খাওয়া-দাওয়া কর বাবা, তোকে আমি বিদেশ পাঠাব এই বছরটা গেলে। আমার আর বিদেশ যাওয়া হলো না।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নবী হুসেন বলেন, ৩০ বছর ধরে একসঙ্গে থাকি। ওর বিয়ে থেকে শুরু করে সব কাজে একসঙ্গে ছিলাম। সুখে-দুঃখে যে শামীম পাশে থাকত আজ তাকে কবরে ঘুম পাড়িয়ে আসলাম। শামীম নেই ভাবতেই বুকটা ফেটে যায়।