দেশে চলমান সহিংসতায় পুলিশকেই টার্গেট করা হচ্ছে। হামলা চালিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে গুরুতর আহত করা হচ্ছে। গত এক মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলায় পুলিশের এক সদস্য নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন অন্তত তিন শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের সদস্য। তাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পুলিশ বলছে, এসব হামলার সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী সরাসরি জড়িত। তবে বিএনপি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা পুলিশের ওপর হামলা করছে না। অন্য লোকজন হামলা চালিয়ে বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে। সমাবেশ বা অন্য রাজনৈতিক কর্মসূচির সরেজমিন চিত্রে দেখা গেছে, পুলিশই আন্দোলনকারীদের হামলার শিকার হচ্ছে। গত শনিবার ফকিরাপুল কালভার্ট রোডে বিএনপির মহাসমাবেশে আসা লোকজন প্রকাশ্য পিটিয়ে মেরে ফেলেছে পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল পারভেজকে। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিও একই কথা বলেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ চলাকালেও হামলা হয়েছে পুলিশের ওপর। মাতুয়াইলে ককটেল হামলায় আহত হয়েছেন তিন পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জখম করা হয়েছে তিনজনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চিন্তিত। এ নিয়ে বিশেষ বৈঠকও করেছেন তারা। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারা দেশে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানদের কাছে গতকাল চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো সমাবেশ বা আন্দোলনের সময় পোশাক পরে পুলিশের সদস্যদের একা চলাফেরা করতে নিষেধ করা হয়েছে। হামলার শিকার হলে অন্য পুলিশ সদস্যদের এগিয়ে যেতেই হবে। টহলের সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একা টহলে যাওয়া যাবে না। সহিংসতা প্রতিরোধ করার সময় কিছুতেই দলছুট হওয়া যাবে না। কোনো অভিযান ও মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার আগে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে হবে। পুরনো সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নেওয়া যাবে না। তবে সবাইকে একটি বিষয়ে মাথায় রাখতে হবে। হুটহাট আক্রমণে যাওয়ার মতো কোনো কিছুই করা যাবে না। নিরপরাধ কেউ যেন পরিস্থিতির শিকার না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারবিরোধীদের আন্দোলনের সময় পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে আসছে। দেশপ্রেমিক পুলিশকে তারা টার্গেট করে হামলা করছে।’ গত শনিবার বিএনপির মহাসমাবেশের সময় পুলিশ সদস্যের নিহত হওয়ার ঘটনাটি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের ওপর হামলাকারীদের কিছুতেই ক্ষমা করা হবে না। তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ওপর যেভাবে হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে তাতে আমরা চিন্তিত। সরকারবিরোধীরাই বেশি পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে দেশে আরও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এজন্য পুলিশকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সতর্কভাবে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, শনিবার ফকিরাপুল কালভার্ট রোডে যখন বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালায় তখন দলছুট হয়ে পড়েন কনস্টেবল আমিরুল। হামলার শিকার হওয়ার পর সহকর্মীরা অন্যদিকে চলে গেলে আমিরুল একা হয়ে পড়েন। আর এ সুযোগে সমাবেশের লোকজন তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে।
পুলিশের ওই কর্মকর্তার দাবি, ওইদিন ১২০ জনের মতো পুলিশ সদস্যকে আহত করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এখনো কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি আরও বলেন, পুলিশের নিজস্ব যানবাহনে পুলিশ লেখা রাখতে পারবে না। মোটরসাইকেলের সামনে কোনো কিছু লেখা যাবে না। সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে নিজেদের নিরাপত্তা, থানার নিরাপত্তা, সেই সঙ্গে থানার যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। পুলিশের কোনো সদস্যকে একা, একটি মোটরসাইকেল বা একটি গাড়ি নিয়ে টহলে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অফিসের কোনো কাজ বা অভিযানে গেলে একাধিক যানবাহন বা সদস্যকে নিয়ে যেতে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অভিযান বা আন্দোলনের সময় কোনো সহকর্মী সমস্যায় পড়লে যেভাবেই হোক তাকে রক্ষা করতে হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা অবরোধের প্রথম দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার চানখাঁরপুলে ইটপাটকেল ও লাঠির আঘাতে চকবাজার থানার ওসি আবদুল হালিম, পরিদর্শক (অপারেশনস) জাকির হোসেন ও উপপরিদর্শক (এসআই) শুভঙ্কর রায় গুরুতর আহত হয়েছেন। বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় পুলিশ বক্সে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে পুলিশের কোনো সদস্য আহত না হলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিশোরগঞ্জের কুলিয়াররচরে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
কুলিয়ারচর থানার ওসি মো. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, বিএনপির সমর্থকরা মারমুখী ছিল। তারা প্রথমে পুলিশের ওপর হামলা করেছে।
গাজীপুরের শফিপুর এলাকার ট্রাফিক পুলিশ বক্সে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের পর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে আন্দোলনরত শ্রমিকরা। গতকাল চন্দ্রা এলাকায় আরেকটি পুলিশ বক্সও ভাঙচুর করে তারা। তারা পুলিশের ওপর হামলা চালানোরও চেষ্টা চালায়। গাজীপুরের বাসন থানার ওসি আবু সিদ্দিক বলেন, ‘সবাই যদি পুলিশকে টার্গেট করে তাহলে কীভাবে হবে। আমরা তো কারোর প্রতিপক্ষ না। আমরা দেশের জন্য কাজ করছি।’ তিনি পুলিশকে সহযোগিতার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একটি সূত্র জানায়, শনিবারের সহিংসতার সময় টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের সমস্যা হতে দেখা গেছে। এই প্রতিবেদকের সামনেও এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। বিজয়নগরসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের ওপর মহাসমাবেশে আসা লোকজনের হামলা ঠেকাতে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু সেগুলো কাজ করেনি। এ নিয়ে পুলিশের কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছেন। মাঠে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, পুরনো হয়ে যাওয়ায় সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলগুলো কাজে আসছিল না। প্রায় ১২ বছর আগে যুক্তরাজ্য থেকে গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড কেনা হয়েছিল। বছরখানেক আগে নতুন করে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল আনা হয়েছে।
ডিএমপির ওই সূত্র আরও জানায়, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গতকাল একটি নির্দেশনা এসেছে। ওই নির্দেশনাটি ডিএমপিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটকে জানানো হয়েছে। মিছিল-সমাবেশ বা অভিযানের সময় আগ্নেয়াস্ত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে বলা হয়েছে। পুরনো কোনো সরঞ্জাম নিয়ে অভিযান ও মিছিল-সমাবেশে নেওয়া যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।