বিদেশিদের সঙ্গে গাজা ত্যাগ আহত ফিলিস্তিনিদের

গাজা উপত্যকা লক্ষ্য করে গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের আক্রমণ শুরুর পর গতকাল বুধবার প্রথমবারের মতো রাফাহ ক্রসিং হয়ে কিছু আহত ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫০০-এর মতো বিদেশি নাগরিক অঞ্চলটি ছেড়ে গেছেন।  অবরুদ্ধ গাজার সঙ্গে মিসরের সংযুক্ত একমাত্র স্থলপথ রাফাহ প্রথমবারের মতো সীমান্ত খুলে দিয়ে আহতদের চিকিৎসার সুযোগ দিয়েছে কায়রো। আহতদের নিতে গতকাল রাফাহ সীমান্তের মিসর প্রান্তে সারিবদ্ধ অ্যাম্বুলেন্স দেখা যায়। এদিকে গাজায় গতকাল মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হওয়ার পর তা আবারও চালু হয়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, কাতারের মধ্যস্থতায় গাজা থেকে বিদেশিদের প্রস্থানের এই সমঝোতা হয়। এর আওতায় গতকাল ৮৮ জন আহত ফিলিস্তিনির সঙ্গে ৫০০ বিদেশি রাফাহ অতিক্রম করেন। এসব বিদেশির অনেকেই দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনি।

মঙ্গলবার থেকেই গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের স্থল অভিযান ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। হামাসের প্রতিরোধ যুদ্ধের কারণে ২৪ ঘণ্টায় ১১ জন সেনা হারানোর তথ্য নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি কর্র্তৃপক্ষ; অর্থাৎ চলতি মাসে সংঘাত শুরুর পর থেকে নিহত ইসরায়েলি সেনার সংখ্যা দাঁড়াল ৩২৮ জনে। অবশ্য পরে গতকাল আরও দুই সেনার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হামাসের ১ হাজার ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা সাড়ে আট হাজার অতিক্রম করেছে।

এ অবস্থায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে এক দিনে ১১ জন সেনা নিহতের খবর দেওয়ার পর টিভি ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা একটি কঠিন যুদ্ধে রয়েছি। এটি দীর্ঘ যুদ্ধ হবে। আমাদের এতে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন রয়েছে। কিন্তু বেদনাদায়ক ক্ষতিও রয়েছে। আমরা জানি, প্রতিটি সেনাই আমাদের কাছে একেকটি পৃথিবী।’

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করল বলিভিয়া, রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করল চিলি ও কলম্বিয়া : গাজায় অব্যাহত সহিংসতার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে দেশটির সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিল লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া। তাদের সঙ্গে তেলআবিব থেকে এরই মধ্যে দূতকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চিলি ও কলম্বিয়া।

গত মঙ্গলবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে বলিভিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রেডি মামানি বলেন, তার দেশ গাজা উপত্যকায় আগ্রাসী ও অযৌক্তিক সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

একই সংবাদ সম্মেলনে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্সি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মারিয়া নেলাও একই ঘোষণা দেন। তিনি গাজায় আক্রমণ বন্ধ করার দাবি জানান।

তবে গতকাল ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে অভিযোগ করে, বলিভিয়া সন্ত্রাসের কাছে আত্মসমর্পণ এবং ইরানের আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির শাসনব্যবস্থার কাছে নতি স্বীকার করেছে।

রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক অভিযোগ করেন, ইসরায়েল যেভাবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে, তা অগ্রহণযোগ্য এবং তারা নির্দিষ্ট কারও অপরাধের জন্য পুরো জনগোষ্ঠীকে ‘সমন্বিত শাস্তির’ আওতায় ফেলছে। 

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো ইসরায়েলি হামলাকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর আরোপিত গণহত্যা’ আখ্যা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে তিনি রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনি হত্যার প্রতিবাদে জাতিসংঘ কর্মকর্তার পদত্যাগ : জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমবিষয়ক হাইকমিশনারের নিউ ইয়র্ক দপ্তরের পরিচালক ক্রেইগ মোখিবার পদত্যাগ করেছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটির হাইকমিশনার ভলকার টার্কের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের কারণে সৃষ্ট ‘ফিলিস্তিনি গণহত্যা’ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘ। তিনি এই ‘ভয়ংকর অপরাধের’ পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অনেক ইউরোপীয় দেশের দায় থাকার কথা উল্লেখ করেন।

ক্রেইগ আরও বলেন, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার তুতসি, রুয়ান্ডা, বসনিয়ার মুসলিম, ইরাকি কুর্দিস্তানের ইয়াজিদি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাউকেই গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

গাজার ‘গণহত্যার’ দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখ বন্ধ রেখে এবং সংগঠনকে ক্ষমতাহীন করে আরও একবার আমরা গণহত্যা থামাতে ব্যর্থ হলাম। ’

তিনি আরও বলেন, ‘নৃগোষ্ঠীগত জাতিবাদী (এথনো-ন্যাশনালিস্ট) ধ্যানধারণার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দখলদারি মানসিকতার উপনিবেশবাদী ভাবাদর্শই বর্তমানে গণহারে ফিলিস্তিনিদের হত্যা-নিপীড়ন চালাচ্ছে। শুধু আরব পরিচয়ের কারণে দশকের পর দশক ধরে তাদের ওপর পদ্ধতিগত নিষ্পেষণ চলছে, যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’