গাজায় হামাস-ইসরায়েল ব্যাপক গোলাগুলি

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:১৬ এএম

গাজা উপত্যকায় হামাসের সঙ্গে ব্যাপক গোলাগুলিতে লিপ্ত ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তরফ থেকে এ কথা জানানো হয়। এর পাশাপাশি উপত্যকায় রাতভর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাপন্থি সশস্ত্র সংগঠন হামাস জানিয়েছে, গাজার উত্তর-পশ্চিমে অগ্রসরমাণ ট্যাংকের ওপর তারা আক্রমণ চালিয়েছে। হামাস এক ইসরায়েলি সেনাকে হত্যার দাবিও করেছে।

এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, হামাসের ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও মেশিনগানের আক্রমণের মুখে পড়েছে তারা। রাতভর গাজা জুড়ে তিন শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। গাজার উত্তরাঞ্চলকে লক্ষ্য ধরে কেন্দ্রে রেখে ইসরায়েলের অভিযান চলছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, গাজার সব প্রান্তই ইসরায়েলি হামলার আওতায় রয়েছে।

বিবৃতিতে আইডিএফ আরও জানায়, হামাসের ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রসহ মাটির নিচের সুড়ঙ্গের ভেতরের স্থাপনা ও সামরিক ক্ষেত্রের মোট তিন শতাধিক লক্ষ্যে আঘাত করা হয়েছে।

গত ৭ অক্টোবর থেকে চলা এ হামলায় গতকাল পর্যন্ত ৮ হাজার ৫২৫ জনের মতো ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে সত্যিকার অর্থে কোনো অগ্রগতি হয়নি। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির জোগানের অনিশ্চয়তাসহ গাজার মানবিক সংকট আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, এটি যুদ্ধেরই সময়। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির আহ্বানের অর্থ হচ্ছে হামাসের কাছে ইসরায়েলের আত্মসমর্পণ, সন্ত্রাসবাদের কাছে মাথানত করা এবং বর্বরতার কাছে নতিস্বীকার করা। কিন্তু এমনটি ঘটবে না।’

আইডিএফ আগেই জানায়, তাদের স্থল অভিযানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, হামাসের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ যোগাযোগের ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া। সেই লক্ষ্য অনুযায়ী জল, স্থল ও সমুদ্র থেকে একযোগে আক্রমণ চালাচ্ছে ইসরায়েল।

হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই হয়েছে। স্থানীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত ‘আল-ইয়াসিন’ নামের ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের চারটি সামরিক যানে আক্রমণ চালিয়েছে। উত্তর-পশ্চিম গাজায় দুটি ট্যাংকসহ ইসরায়েলি বুলডোজারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। হামাস আরও দাবি করেছে, তাদের হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা প্রাণ হারিয়েছে। উপত্যকার বেইত হানুম অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা হামাস যোদ্ধার হামলায় প্রাণ হারান ওই সেনা।

হাসপাতালের রোগীদের জীবনশঙ্কা : ইসরায়েলি বাহিনী যুদ্ধের শুরু থেকে গাজার হাসপাতালগুলোকে হামলার আওতার বাইরে রাখছে না। গাজার উত্তরাঞ্চলে ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের পাশে সোমবার রাতে বিমান হামলার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এতে হাসপাতালের ২৫০ জনের মতো রোগী জীবন সংকটাপন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওই হাসপাতালের চিকিৎসক মোয়াইন আল-মাসরি বলেন, জ্বালানি শেষ হওয়ার অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎহীন হওয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রোগী এবং অস্ত্রোপচার বিভাগের রোগীদের জীবন সংকটাপন্ন হবে।

গাজা শহরে তুরস্কের সহযোগিতায় পরচালিত হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, গোলার আঘাতে তাদের হাসপাতালের তৃতীয়তলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্যানসার রোগীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অব্যাহত হামলার মধ্যে দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির সংস্থান সোমবার বন্ধ করে দিয়েছে তেল আবিব। জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম তদারককারী দপ্তর (ওসিএইচএ) জানায়, কোনো কারণ ছাড়াই ইসরায়েল পানির সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইসরায়েল লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে হুথি বিদ্রোহীদের হামলাও বাড়ছে : ইয়েমেনের শিয়া মতাবলম্বী সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা ‘গাজা যুদ্ধের বদলা’ হিসেবে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। ইরানের মদদপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীরা জানায়, তারা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এইলাতে হামলা চালিয়েছে। তবে এ হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। হুথি সরকারের প্রধানমন্ত্রী আবদেলআজিজ বিন হাবতোর বলেন, তারা দক্ষিণ ইসরায়েলে ড্রোন ছুড়েছেন।

এ বিষয়ে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা গতকাল সকালে লোহিত সাগরের ওপর আকাশে একটি অজানা লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে। এর আগে গত শুক্রবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মিসর সীমান্তে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইসরায়েলি এলাকার কাছে বিস্ফোরণ হয়েছিল। তেল আবিব বলেছিল, ইসরায়েলের ক্ষতি করতে হুথি বিদ্রোহীরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

হুথি বিদ্রোহীদের এ হামলা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে নিয়মিতই সংঘর্ষ হচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনীর। এবার ইয়েমন থেকে শিয়াপন্থি সংগঠনের হামলাও ক্রমে ক্রমে বাড়ছে। ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, গাজায় ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করলে এ সংঘাত আঞ্চলিক রূপ পেতে পারে। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে অনেকেই সংঘাতে জড়াবে।

শরণার্থী শিবিরে হামলায় নিহত ৫০ : গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার চালানো এই হামলায় শিবিরটিতে অন্তত ৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১৫০ জন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলেও জানানো হয়। বার্তা সংস্থা এএফপির ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এই শরণার্থী শিবিরে বেশ কয়েকটি বাড়ি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অন্তত ৪৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকেই সে সময় হতাহতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত