মিঠে-কড়া

তখন বয়স ছিল ৩১ বছর। এত অল্প বয়সে ‘ভীমরুল’ ছদ্মনামে দৈনিক ইত্তেফাকে কলাম লিখে প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

তার লেখনী শক্তিতে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খানের ভিত নড়ে ওঠে। কিন্তু ২০ মে, ১৯৬৫ সালে ৩২ বছর বয়সে কায়রোতে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটানোর উদ্দেশ্যে ছাপা হচ্ছে ভীমরুলের সেই উপসম্পাদকীয়

সমাজ জীবনে এমন কিছু দুর্লভ বুদ্ধিমানেরও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় যাঁহারা ঘটনা হইতে যথার্থ শিক্ষা গ্রহণ না করিয়া জীবনভর কেবল ভুল শিক্ষাই গ্রহণ করিয়া থাকেন। উপকথার সেই বিচক্ষণ ব্যক্তিটি ছুটিয়া আসিয়া রুদ্ধশ্বাসে বলিয়াছিলেন, তিনি এমন এক আশ্চর্য জীব দেখিয়া আসিয়াছেন, যে লেজ দিয়া কলাগাছ উপড়াইয়া খায়। উপকথার যুগ অতিক্রম করিয়া আমরা বহুদূর আগাইয়া আসিয়াছি। কিন্তু সেই সব বিচক্ষণ ব্যক্তিদের হাত হইতে আজও আমরা অব্যাহতি পাই নাই।

 ক্ষমতাসীন কনভেনশন লীগের নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম এবং প্রাদেশিক গভর্নর পদে সমাসীন জনাব আবদুল মোনেম খান গত পরশু বেতার-বক্তৃতায় অতিশয় বিচক্ষণ কথাবার্তা বলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, “নির্বাচনে জনসাধারণের বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ইহাই প্রমাণ করে যে, জনগণ আইয়ুব-উদ্ভাবিত নির্বাচনী পদ্ধতি মানিয়া লইয়াছে।” জনাব মোনেমের মতো আরো যেসব বিচক্ষণ ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলে রহিয়াছেন, তাঁহারাও ইতিমধ্যে একই মর্মে বাণী-বিবৃতি প্রচার করিয়াছেন। ইহাদের এসব বাণী-বিবৃতি উপকথার সেই বিচক্ষণ ব্যক্তিটির কথাই আমাদের মনে করাইয়া দিতেছে।

দেশের গণতান্ত্রিক জীবনকে ধ্বংস করিয়া জনাব আইয়ুব যে নির্বাচনী পদ্ধতি চালু করেন, তৎ-সম্পর্কে দেশবাসীর মনোভাব বহু পূর্বেই প্রকাশিত হইয়াছে। জনসাধারণের প্রতি আস্থার ভিত্তিতে কিংবা রাষ্ট্র শাসনে জনমতের যথার্থ প্রতিফলনের প্রেক্ষিতে উক্ত নির্বাচন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয় নাই; বরং ব্যক্তি-বিশেষের শাসনকে চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যেই উক্ত আজব ব্যবস্থা চালু করা হইয়াছিল, ইহা বুঝিতে কাহারো একদিনও বিলম্ব হয় নাই। ফলে গোড়া হইতেই জনসাধারণ এই পদ্ধতির বিরোধিতা করিয়া আসিয়াছে। ক্ষমতান্ধ মহল জনগণের প্রতিবাদে কর্ণপাত না করিলেও জনসাধারণের মতামত সম্পর্কে তাঁহারা বিশেষভাবেই সজ্ঞান ছিলেন। শাসনতন্ত্র কিংবা নির্বাচন-পদ্ধতির ব্যাপারে জনমতকে মর্যাদা দিতে হইলে অবস্থা কিরূপ দাঁড়াইবে, সে-কথাও ক্ষমতান্ধদের ভালোভাবেই জানা ছিল। তাই আইয়ুব শাসনতন্ত্র রচিত হওয়ার আগে একটি শাসনতন্ত্র কমিশন গঠন করা হইলেও সেই কমিশনের সুপারিশ পর্যন্ত গ্রাহ্য করা হয় নাই।

দেশে চুয়াল্লিশ মাস কাল সামরিক শাসন বিদ্যমান থাকাকালে জনসাধারণকে কিরূপ সন্ত্রাসমূলক পরিস্থিতিতে বসবাস করিতে হইতেছিল তাহা সকলেরই জানা আছে। জনসাধারণের মাথার উপর ঝুলিয়া ছিল ফাঁসি, যাবজ্জীবন কারাদ-, বেত্রাঘাত, জেল-জরিমানা ইত্যাদিও খড়গ। কিন্তু সেই অবস্থাতেও জনসাধারণ আইয়ুব-সরকারের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদ জানাইয়াছে। এবং সেই প্রতিবাদ জানাইতে গিয়া তাহারা বেত্রাঘাত ও জেল-জুলুমকে বরণ করিয়া লইয়াছে।

সামরিক শাসন প্রত্যাহত ও আইয়ুব শাসনতন্ত্র প্রবর্তিত হইবার পর আইয়ুব উদ্ভাবিত অগণতান্ত্রিক রীতি-পদ্ধতির বিরুদ্ধে দেশময় গণ-আন্দোলনের কি জোয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল, জনাব মোনেমের স্মৃতিতে তাহা মøান হইয়া গেলেও আপামর দেশবাসীর স্মৃতিতে তাহা ভাস্বর রহিয়াছে। ক্ষমতাসীন মহল জেল-জুলুম ও অন্যান্য নানাবিধ পন্থার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সেই গণজাগরণকে স্তব্ধ করিয়া দিবার প্রাণপণ প্রয়াস পাইলেও তাঁহারা তাহা পারেন নাই। সেই গণজাগরণের ক্রমবিকশিত ধারার চূড়ান্ত পর্যায়েই আজ আমরা দেশময় জনগণের অপ্রতিহত জয়যাত্রা প্রত্যক্ষ করিতেছি।

এই গণজাগরণের বাণী অতিশয় পরিষ্কার। ডিক্টেটরশিপ বনাম গণতন্ত্র, এই সুস্পষ্ট ও বারংবার বিঘোষিত ইস্যুর উপরই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতেছে। এই ইস্যু সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতা, কোনো দ্ব্যর্থতা নাই। সার্বজনীন ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, ইহাই ছিল দেশবাসীর দাবি। কিন্তু দেশে একনায়ক শাসন কায়েম করিয়াছেন এবং সেই শাসনকে যাহারা চিরস্থায়ী করিতে চান, তাহারা জনগণের সেই ন্যায়সংগত দাবি নিয়া নেন নাই। ফলে জনগণকে শেষ পর্যন্ত ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ পদ্ধতির মাধ্যমেই সংগ্রামে অবতীর্ণ হইতে হয়।

জনগণ জানে যে, এই পদ্ধতিতে তাহাদের অসুবিধা প্রচুর। কেননা, পদ্ধতিটিই এমন করিয়া তৈরি করা হইয়াছে যে, ইহাতে জনমতের যথার্থ প্রতিফলনের সুযোগ নাই। তবু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণ এই পদ্ধতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়াছে এজন্যেই যে, জনগণ জানে, জনতার ঐক্যের নিকট কোনো সীমাবদ্ধতাই টিকিতে পারে না। বস্তুত, বাস্তব পরিস্থিতিতে তাহাই প্রমাণিত হইতেছে অভ্রান্তভাবে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কনভেনশন দলের ভরাডুবি ঘটিতেছে দেশের সর্বত্র। সরকারি প্রশাসনযন্ত্র, সরকারি কর্মচারী প্রভৃতির যথেচ্ছ ব্যবহার, নানা কৌশলে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা এবং গৌরী সেনের ভা-ার উজাড় করিয়া দেওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল নিজেদের সর্বনাশ ঠেকাইতে পারেন নাই। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় বিভিন্ন স্থানে পরম উপভোগ্য ঘটনা সংঘটিত করিতেছে। কনভেনশন দলের প্রতাপশালী মন্ত্রিবর্গের ভাই-ভাগনে, বাগাড়ম্বরপ্রিয় পরিষদ সদস্য, জাঁদরেল জাঁদরেল চেয়ারম্যান ইত্যাদি প্রায় কচুকাটা হইয়া যাইতেছেন। কোথাও দুধ বিক্রেতার নিকট, কোথাও দোকান কর্মচারীর নিকট, কোথাও মৎস্যজীবীর নিকট, কোথাও কুলি সর্দারের নিকট, কোথাও আবার পান বিক্রেতার নিকট তাঁহাদের নিদারুণ পরাজয় ঘটিতেছে। এমনকি ইতিমধ্যে একজন ঠিকা-ঝি ও কাঠকুড়ানির নিকট পর্যন্ত কনভেনশনপন্থি জনৈক প্রতাপশালী চেয়ারম্যানের পরাজয় ঘটিয়াছে।

কনভেনশনি নেতারা যাহাদিগকে গরু-বাছুরের শামিল বলিয়া গণ্য করেন এবং যাাহাদিগকে তাঁহারা ‘ভাড়া করা খচ্চর’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছিলেন, তাঁহারা এরূপ ঐতিহাসিক জয়ে জয়ী হইতেছেন ‘আইয়ুব উদ্ভাবিত নির্বাচন-পদ্ধতিকে মানিয়া লইবার জন্য ইহাই যদি জনাব মোনেম বুঝিয়া থাকেন, তবে তাঁহার বিচক্ষণতায় বাহবা না দিয়া সত্যই উপায় নাই। একটি গল্প মনে পড়িতেছে। যথাযথভাবে গল্পটি বলিতে পারিব না; কারণ উহার আভাসটিই শুধু মনে আছে ঠিক-ঠিক গল্পটি মনে নাই। তবে গল্পটি এতই সুপরিচিত যে, আভাসেই উহা অনেকের মনে পড়িবে।

একদা এক প্রতাপশালী ব্যক্তি ঘোষণা করিলেন, যিনি তলোয়ারের এক কোপে তাঁহাকে মাথা হইতে পা পর্যন্ত কাটিয়া ফেলিতে পারিবেন, তাঁহাকে তিনি তাঁহার সমস্ত বিত্ত- সম্পত্তি দান করিয়া দিবেন। আর যদি কাটিতে না পারা যায় তবে সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা হইবে। এই ঘোষণার পর একজন একজন করিয়া অনেকেই আসিলেন। শাণিত তলোয়ারের কোপে সেই কিংবদন্তির প্রতাপশালী ব্যক্তিকে কাটিয়া ফেলার চেষ্টা হইল। কিন্তু একে একে তাঁহারা ব্যর্থ হইলেন। তাঁহাদিগকে প্রাণ দিতে হইল।

কিংবদন্তির প্রতাপশালী ব্যক্তিটি আপাদমস্তক এমন এক বর্ম তৈরি করিয়াছিলেন যে, আঘাতমাত্র তলোয়ার ভাঙ্গিয়া দ্বিখ-িত হইয়া যাইত। অবশেষে একজন নাতিপুষ্ট লোকের আবির্ভাব ঘটিল। তাঁহাকে দেখিয়া কিংবদন্তির প্রতাপশালী ব্যক্তি তো হাসিয়াই খুন। অতসব পালোয়ান পালোয়ান লোক আসিল আর ব্যর্থ হইয়া প্রাণ দিল শেষে কিনা এমন একটি শীর্ণ লোকের আবির্ভাব। তাও আবার তাঁহার হাতের তলোয়ারখানা রসুনের চিলতার মতো সরু। যাই হোক, কিংবদন্তির প্রতাপশালী ব্যক্তি প্রস্তুত হইয়া দাঁড়াইলেন; তাঁহার ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি। আপাদমস্তক বর্মের প্রতি তাঁহার অগাধ বিশ্বাস; তিনি জানিতেন, সেই বর্ম দুেদ্য। শীর্ণ ব্যক্তিটি সম্মুখে দাঁড়াইলেন এবং একমুহূর্ত তাকাইয়া প্রতাপশালী ব্যক্তির মাথায় সজোরে আঘাত করিলেন। আঘাতের পর সেই কিংবদন্তির বর্মধারী পূর্বের মতোই দাঁড়াইয়া রহিলেন; মুখে পূর্ববৎ সেই মিটিমিটি হাসি। চোখ নাচাইয়া প্রতাপশালী ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘কি হে, কি হইল ?’ শীর্ণ ব্যক্তিটি বলিলেন : ‘নড়িয়া দেখুন।’ নড়িতেই দেখা গেল, প্রতাপশালী ব্যক্তির দেহ দ্বিখ- হইয়া দুইদিকে গড়াইয়া পড়িয়াছে। বর্মসহ তিনি এমনভাবেই কর্তিত হইয়া গিয়াছিলেন যে, তিনি যে দ্বিখন্ডিত হইয়া গিয়াছেন তাহা ঠাহর করিতেও পারেন নাই । ক্ষমতাসীন কনভেনশন লীগাররা পর্যুদস্ত হইয়াও আজ না হারিবার ভান করিতেছেন। কিন্তু আর কতদিন?

লেখকঃ আহমেদুর রহমান

দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ নভেম্বর ১৯৬৪