জাতীয় দলে পাচ্ছিলেন ডাক, কিন্তু মিলছিল না খেলার সুযোগ। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কয়েকবার হৃদয় ভেঙেছিল উইল ইয়ংয়ের। ‘ভেঙে পড়লে চলবে না, চালিয়ে যেতে হবে লড়াই, স্বপ্ন যে পূরণ করতেই হবে’, এমন মন্ত্রে নিজেকে সামলে নিয়েছেন তিনি। হাল না ছেড়ে করে গেছেন কঠোর পরিশ্রম। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে পেয়েছেন সাফল্যের দেখা। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারা যেকোনো ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের প্রথম সফলতা বললে ভুল হবে না নিশ্চিতই। আর ইয়ং তো এখন নিউজিল্যান্ড দলের নিয়মিত একজন হয়ে উঠছেন। বিশ্বকাপে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও এই ওপেনার।
ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলা পছন্দ ইয়ংয়ের। লক্ষ্য ছিল একটাই, হতে হবে পেশাদার ক্রিকেটার। নিজেকে সেভাবেই গড়ে তোলেন তিনি। প্রতিভা ও সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে জায়গা করে নেন নিউজিল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০১২ যুব বিশ্বকাপে ছিলেন কিউইদের অধিনায়ক। ওই বছরই প্রথমবার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিকস দলে পান সুযোগ। ছাত্র হিসেবেও ভালো ছিলেন ইয়ং, পড়তেন প্রকৌশলে। পেশাদার ক্রিকেটে খেলার সুযোগ আসার পর বুঝতে পারেন, প্রকৌশল ডিগ্রি শেষ করার সময় পাবেন না। তাই বিষয় পরিবর্তন করে বেছে নেন সাধারণ বিজ্ঞান। তিন বছরের ডিগ্রি শেষ করেন পাঁচ বছরে।
২০ বছর বয়সে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিকসের সঙ্গে চুক্তি করে পেশাদার ক্রিকেটের আঙিনায় পা রাখেন ইয়ং। ২০১৬ সালে ইয়ংয়ের নেতৃত্বে ফোর্ড ট্রফি জেতে সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিকস এবং ২০১৮ সালে প্লাঙ্কেট শিল্ডে থাকে অপরাজিত। এর মাঝেই নিউজিল্যান্ডের ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং দল ও ‘এ’ দলের হয়ে খেলেন তিনি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কা সিরিজের টেস্ট দলে জায়গা হলেও খেলার সুযোগ পাননি। পরের বছরের মার্চে বাংলাদেশ সিরিজের দলেও রাখা হয় তাকে। এবার ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের দ্বারপ্রান্তে। কেন উইলিয়ামসন চোটে পড়ায় ক্রাইস্টচার্চে টেস্টে তার খেলা ছিল নিশ্চিত। কিন্তু ম্যাচের আগের দিন ক্রাইস্টচার্চের একটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় অর্ধশতের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর ম্যাচটি বাতিল করে দেওয়া হয়। সেবারও আর হয়ে ওঠেনি ইয়ংয়ের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামা।
২০১৯ বিশ্বকাপ দলে ডাক পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল তার। কিন্তু এর আগে কাঁধে চোট পেয়ে নিভে যায় আশার সেই আলো। সেরে ওঠার পর ২০২০ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন তিনি। পরের বছর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতেও অভিষেক হয়ে যায়। ওয়ানডেতে নিজের প্রথম পাঁচ ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি করেন। এরপর আর সেঞ্চুরি না পেলেও পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন নিয়মিতই। তাই তো এবারের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড দলের মূল্যবান সদস্য তিনি। অভিষেক বিশ্বকাপটা গোল্ডেন ডাকের তেতো স্বাদ পেয়ে শুরু হয় ইয়ংয়ের। পরের দুই ম্যাচে ফিফটি করে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়ে ফের খোলসে ঢুকে গেছেন তিনি। আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে মহা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার ব্যাটে বড় রানের প্রত্যাশায় থাকবে কিউইরা। এশিয়ার দলটির সঙ্গে ওয়ানডেতে ডানহাতি ব্যাটসম্যানের পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। ৫ ম্যাচে ৪৮ গড়ে করেছেন ২৪০ রান, ফিফটি আছে দুটি। আর লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে তো বেশ সমৃদ্ধ তার ক্যারিয়ার। ১০৫ ম্যাচে ১০ সেঞ্চুরি ও ২২ ফিফটিতে করেছেন ৩৮৮২ রান, ব্যাটিং গড় ৪১.১৯।
কিউইদের বিপক্ষে ম্যাচটি পাকিস্তানের জন্য ‘বাঁচা-মরার’ বলা যেতেই পারে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলতে তাদের যে জয় ছাড়া বিকল্প নেই। শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে জ্বলে উঠতে হবে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের। যেখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপে ফর্মে থাকা আবদুল্লাহ শফিক। বৈশি^ক আসরে অভিষেকটা রাঙান তিনি দারুণ এক সেঞ্চুরি দিয়ে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রেকর্ড রান তাড়া করে জয়ের ম্যাচে ১১৩ রান করেন এই ওপেনার। এরপর পাকিস্তান টানা চার ম্যাচ হারলেও নিজের কাজটা ঠিকঠাক পালন করেন শফিক। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৬৪ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলেন ৫৮ রানের ইনিংস। বাংলাদেশকে হারিয়ে সেমিফাইনালে খেলার আশা বাঁচিয়ে রাখার ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসে ৬৮ রান। আসরে এখন পর্যন্ত ৬ ম্যাচ খেলে শফিকের রান ৩৩২, পাকিস্তানের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ক্রিকেটের সঙ্গে শফিকের সম্পর্কটা পারিবারিক। তার বাবা শফিক আহমেদ ছিলেন পেশাদার ক্রিকেটার, পরে ক্রিকেট কোচ হন তিনি। শফিকের চাচা আরশাদ আলি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে খেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। পরিবার থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁকটা এসেছে শফিকের। সেই পথে হেঁটে আজ তিনি জাতীয় দলে। হয়ে উঠেছেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পেশাদার ক্রিকেটে তার পথচলা শুরু ২০১৯ সালে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট দিয়ে। সেন্ট্রাল পাঞ্জাবের হয়ে ওই ম্যাচে খেলেন ১৩৩ রানের ইনিংস। পরের বছর টি-টোয়েন্টি অভিষেকে করেন অপরাজিত ১০২। প্রথম শ্রেণি ও টি-টোয়েন্টি অভিষেকে সেঞ্চুরি করা পাকিস্তানের প্রথম ব্যাটসম্যান তিনি। টি-টোয়েন্টি দিয়েই ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন শফিক।
ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাট হাতে আলো ছড়িয়ে পরের বছর টেস্টেও সুযোগ পেয়ে যান। চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে দুই ইনিংসেই করেন ফিফটি। ২৬ টেস্টের ছোট্ট ক্যারিয়ারে সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন চারটি, যেখানে আবার আছে একটি ডাবল সেঞ্চুরিও। গত বছর পাকিস্তানের জার্সি গায়ে ওয়ানডে অভিষেক হয়ে যায় তার। এই সংস্করণে মাত্র তিন ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপ দলেও পেয়ে যান সুযোগ। কিন্তু তাকে খেলানো হবে কি না, এটা নিয়ে সংশয় ছিলই। কারণ পাকিস্তান দলে আছেন অভিজ্ঞ দুই ওপেনার ফখর জামান ও ইমাম-উল-হক।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দলের প্রথম ম্যাচে প্রত্যাশিতভাবে একাদশে জায়গাও হয়নি শফিকের। পরে ফখর অসুস্থ হয়ে পড়ায় লঙ্কানদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেয়েই বাজিমাত করেন ২৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। এরপর তো কেবল ছুটছেন তিনি। তাকে ছাড়া একাদশ সাজানো অন্তত চলতি বিশ্বকাপে কল্পনা করবে না পাকিস্তান। বেঙ্গালুরুতে কিউইদের বিপক্ষে নিজেকে আরও একবার মেলে ধরতে পারেন কি না শফিক, এর উত্তর দেবে সময়।