৬ নভেম্বর দিল্লির অরুন জেটলি ম্যাচটা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। যে ম্যাচটা বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা নিয়েছে ছন্দে ফেরার মঞ্চ হিসেবে, সেই ম্যাচকেই চোখ রাঙাচ্ছে ভারত রাজধানীর দিল্লির মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, দিল্লির বায়ুর গড় গুণমান সূচক (একিউআই) গতকাল ৪৬৮ ছিল, যা মানবদেহে সরাসরি প্রভাব ফেলে, সমস্যা হয় স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে। এমনিতে দলের ভেতরটাই ভীষণ দূষিত হয়ে গেছে টানা ছয় হারে। তার ওপর এখন দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়েই ভাবতে হচ্ছে। বাধ্য হয়েই গতকাল তারা ট্রেনিং সেশন বাতিল করেছে।
হরিয়ানা অঞ্চলে কয়লাখনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া উড়ে এসে ভারী করে তুলছে দিল্লির বাতাস। বায়ুদূষণের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর এটি। দিনের বেলায় শহরের আকাশ মনে হয় কালো মেঘে ছেয়ে আছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামার আশঙ্কা জাগবে অনেকের। শীতকাল যতই এগিয়ে আসছে, দূষণের পরিমাণও বাড়ছে। এ কারণেই বাড়তি সতর্কতা বাংলাদেশ দলের, গতকাল জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় ক্রিকেটারদের মুখ ঢাকা ছিল মাস্কে। সেটা যেমন দিল্লির বায়ুদূষণের কারণে, আবার একের পর এক ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার লজ্জায়ও। ২০১৯ সালে দিল্লিতে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্ট সিরিজের প্রথমটি হয়েছিল এই অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে। সে সময় দলের ওপেনার লিটন দাসকে দেখা গিয়েছিল মাস্ক পরে নেট প্র্যাকটিস করতে। দিল্লির এই বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত শ্রীলঙ্কাও। ২০১৭ সালে টেস্ট ম্যাচে তাদের বেশ কজন ক্রিকেটার শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগেছেন।
এ ম্যাচটি দুই দলের জন্যই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা সাত ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে আছে সাতে, গাণিতিক হিসাবে সেমিফাইনালের সম্ভাবনা এখনো টিকে আছে। তাছাড়া ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলা নিশ্চিত করতে তাদের জয়ের বিকল্প নেই। ২ পয়েন্ট নিয়ে নয়ে থাকা বাংলাদেশের অবস্থা আরও নাজুক। ৬ নভেম্বর হেরে গেলে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির টিকিটও হাতছাড়া হবে। এরকম পরিস্থিতিতে যদি বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ম্যাচটা পরিত্যক্ত হয়, তবে দুই দল ১ পয়েন্ট করে পাবে। তাতে ক্ষতিটা হবে বাংলাদেশেরই।
মেরিডিয়ান হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের খালেদ মাহমুদ কাল আবহাওয়া নিয়ে সতর্ক থাকার কথাই বললেন, ‘আজকে (গতকাল) আমাদের ট্রেনিং সেশন ছিল। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি কালকের (পরশু) থেকে আজকে বেশি খারাপ হওয়ায় আমরা ঝুঁকি নিইনি, যেহেতু আরও দুটি দিন আছে। দলের অনেকেই বের হওয়ার পর কফিং টাইপের সমস্যা হচ্ছে। তাই একটা ঝুঁকি থাকে শরীর খারাপ হওয়ার। জানি না কালকে পরিস্থিতি ভালো হবে কি না। যদি উন্নীত হয় তো খুব ভালো। যদি না হয় আমাদের তো এই আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতেই হবে। ট্রেনিংও করতে হবে। দুটি দিন থাকবে প্র্যাকটিস করার, তাই চাইছি ছেলেরা সবাই ফিট থাকুক। কারণ এ ম্যাচটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
বাংলাদেশকে এখন শুধু আবহাওয়া নিয়ে ভাবলে চলছে না। দলের ভেতরেও যে দূষণ শুরু হয়ে গেছে। এই বিশ্বকাপে পারফরম্যান্সের হিসাবে সবচেয়ে বাজে অবস্থানে বাংলাদেশ। তারাই সবার আগে সেমিফাইনালের লড়াই থেকে বিদায় নিয়েছে। পয়েন্ট টেবিলে তাদের নিচে ইংল্যান্ড থাকলেও, বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা যেকোনো সময় বাংলাদেশকে ঠেলে দিতে পারে তলানিতে। এরকম অবস্থায় ভেঙে পড়া একটা দলকে জোড়া লাগানোর বড় চ্যালেঞ্জটাই নিতে হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। আর সেই কাজটা যে ভীষণ কঠিন, সেটা জানিয়ে খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘সত্যি বললে দলের অবস্থা ভালো তো নাই, এরকম রেজাল্ট কারও কাম্য ছিল না। আমরা ভালো খেলছি না। আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দিল্লির ম্যাচটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য। আসলে এখন তো পাওয়ার একটা জিনিসই আছে। তাই আমরা জিততে চাই, ভালো খেলতে চাই। প্রতিটি ম্যাচই আমরা জিততে চেয়েছি। কিন্তু দল কেন ভালো খেলছে না, তার সঠিক উত্তরটা কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। আমরাও বুঝছি না, কেন এত খারাপ হচ্ছে। যে দলটা এত ভালো খেলছিল, হঠাৎ করে কেন এত খারাপ করছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে? তারপরও যেহেতু একটু সময় পাওয়া গেছে, ছেলেরাও ক্রিকেট থেকে একটু দূরে আছে দুই-তিন দিন। ফিরে যাতে আমরা সেরা ক্রিকেটটা খেলতে পারি, সেই চেষ্টাই করতে হবে।। আমি মনে করি যে, ২৫-৩০ শতাংশ ক্রিকেটও আমরা খেলতে পারিনি। সত্যি বললে একটা দল হিসেবে খেলতে পারিনি। সংঘবদ্ধ চেষ্টা করতে পারিনি। হয়তো বিক্ষিপ্ত কিছু পারফরম্যান্স ছিল। তবে সেগুলো আমাদের কাজে আসেনি। আমরা সবাই একটু স্তব্ধ আসলে। বাংলাদেশের এরকম পারফরম্যান্স কবে আমি শেষ দেখেছি, নিজেরই মনে নেই।’
ক্রিকেটারদের মনের অবস্থা ভালো নয়, এটা সবার জানা। এ বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে কীভাবে সামনের দুই ম্যাচের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন সাকিবরা। খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘তারাও খুব একটা ভালো মুডে নেই। তারপরও তাদের স্বাভাবিকভাবে চলতে হবে। ওরা ভালো খেলতে পারছে না, আমার তো মনে হয় আমাদের সবার চেয়ে ওদেরই বেশি কষ্ট হচ্ছে। ওরা ভালো খেলছিল বলেই আমাদের প্রত্যাশা বেশি ছিল। সেটা যখন হয়নি তখন ওরাও বুঝতে পারছে দল হিসেবে ভালো খেলতে পারছে না। ওরা খুব ব্যথিত ভালো খেলতে না পারায়। দলের বডি লেঙ্গুয়েজের কথা বললে, ড্রেসিংরুমটা অনেক নীরব হয়ে গেছে।’
টিম ডিরেক্টর হিসেবে আগেও বাংলাদেশ দলের সঙ্গে অনেক টুর্নামেন্টে ছিলেন সাবেক এ অধিনায়ক। তবে তখন দল নির্বাচন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ব্যাপারগুলোতেও তার অংশীদারত্ব ছিল। এবার বোর্ড তাকে সেই দায়িত্ব দেয়নি। তিনি এসেছেন শুধুই দলের নেতা হয়ে। যেটা মেনেই নিতে পারছেন না খালেদ মাহমুদ, ‘এরকমভাবে দলের সঙ্গে থাকতে হবে জানলে আমি আসতামই না। তবে এখন ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে বড় না করাই ভালো।’
কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেসহ কোচিং প্যানেলের দায়িত্ব নিয়েও সরাসরি কোনো মতামত দেননি। শুধু চেয়েছেন বিশ্বকাপের পর যাতে বোর্ড ব্যর্থতার একটা সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়।