নগদ লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক। তার নেতৃত্বে মোবাইলে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো নতুনত্বের সূচনা করেছে নগদ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য নগদসহ আরও একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে। নতুন এই ব্যাংকের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল ব্যাংক কী? প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে এর তফাত কী?
তানভীর এ মিশুক : এক কথায় ডিজিটাল ব্যাংক সরকার ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা অনুমোদিত আরেকটি ব্যাংক। প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে এই ব্যাংকের পার্থক্য হলো প্রচলিত ব্যাংকে যেমন স্থান ও সময়কেন্দ্রিক কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, ডিজিটাল ব্যাংকে স্থান ও সময়কে পরাজিত করা হয়েছে। এখানে একজন গ্রাহক ঘরে বা অফিসে বসে সপ্তাহে সাতদিন, ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে সব সেবা উপভোগ করতে পারবেন। এর জন্য একজন গ্রাহককে ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। শুধু গ্রাহকের কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি হলেই চলবে। যেহেতু অ্যাপের মাধ্যমেই সব সেবা দেওয়া হবে ফলে গ্রাহকের কাছে অ্যাপই হবে ব্যাংক।
আর সেবার দিক দিয়ে চিন্তা করলে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, এখানে গ্রাহক জামানত বা কোনো ধরনের জটিল শর্ত ছাড়া খুব সহজে ঋণ পাবেন। এই প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকের ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর নির্ভর করে গ্রাহককে খুব সহজ শর্তে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেওয়া সম্ভব। সেই ঋণও হবে জামানতবিহীন। প্রথাগত ব্যাংকিংয়ে গ্রাহককে অনেক ধরনের শর্তের বেড়াজালে ফেলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাতার পর পাতা ফরম পূরণ করা, গ্যারান্টর খুঁজে বের করাসহ নানা ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয়, যে বিষয়গুলো ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে একদমই অনুপস্থিত। এখানে গ্রাহক চাইলে ভালো সুবিধাসহ ডিপিএসও রাখতে পারেন।
প্রথম দিকে আমরা এসব পার্থক্য নিয়েই যাত্রা করতে যাচ্ছি। তবে সেবা চালু হওয়ার পর দেখা যাবে আরও বহু পার্থক্য এমনিতেই হয়ে যাবে। তাছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকের কেবল প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গেই নয় বিদ্যমান মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) যেটাকে সবাই মোবাইল ব্যাংকিং নামে চেনে সেখানেও বড় পার্থক্য হবে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের পরের প্রশ্ন কিন্তু এটাই ছিল। বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইলে অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর পার্থক্য কী হবে?
তানভীর এ মিশুক : আমার বিবেচনায় মোবাইল আর্থিক সেবা যেটিকে জনগণ মোবাইল ব্যাংকিং নামে ডাকে সেটা কোনোভাবে ব্যাংকিং তো নয়ই, আদতে এটা হাত-পা কাটা একটি ডিজিটাল আর্থিক সেবা। একজন গ্রাহকের যত ধরনের আর্থিক সেবার প্রয়োজন হয় তার সামান্যই এখানে করা যায়। নগদ চালু করার অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করি এবং তখন থেকেই ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করি।
সেবার পরিসর ছোট্ট এবং সীমাবদ্ধ বলেই মোবাইল আর্থিক সেবা চালু হওয়ার ১২ বছরের মধ্যেও লেনদেনের অঙ্ক ততটা বড় হয়নি। তাছাড়া দেশের অর্ধেক মানুষকেও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা যায়নি। এই বাধা আমরা এবার ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে দূর করব।
মোবাইল আর্থিক সেবা পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা যেসব বাধার মুখে পড়েছি সেগুলোই আসলে প্রচলিত এমএফএস-এর সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকের পার্থক্য তৈরি করবে। যেমন এমএফএস-এ ঋণ দেওয়া যায় না। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকে এটা অনেক বড় ব্যাপ্তি নিয়ে থাকবে। এমএফএস-এ খরচ অনেক বেশি। নগদ খরচ কমানোর অনেক চেষ্টা করেছে, কমিয়েছেও। কিন্তু তারপরেও অনেক বটলনেক রয়ে গেছে। তাছাড়া সব পেমেন্ট, সরকারের সেবা সংক্রান্ত কার্যক্রমকে এর মধ্যে আনা যায়নি। ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র সঞ্চয় হবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি বেসিক ধাপ। এমএফএস খাতে এটি প্রায় অনুপস্থিত। সব মিলে যেটা হয়েছে মানুষের মানসিকতাই হয়ে গেছে এমএফএস দিয়ে কেবল ছোটখাটো লেনদেনই করা যায়। ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে লেনদেন হবে গ্রাহকের একটি ইচ্ছে স্বাধীন বিষয়।
দেশ রূপান্তর : দেশে ৬১টি ব্যাংক রয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই অনলাইন সেবা আছে। এরপরও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজন কী?
তানভীর এ মিশুক : সুন্দর একটি প্রশ্ন করেছেন। প্রথম কথা হলো অনলাইন ব্যাংকিং আর ডিজিটাল ব্যাংকিং এক নয়। তারপরেও সবগুলো ব্যাংকের কমবেশি অনলাইন সেবা আছে, সেটা কত মানুষ ব্যবহার করছেন? ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংকগুলো শিক্ষিত মানুষের বাইরে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে আমাদের নগদ-এ নিবন্ধিত গ্রাহক সাড়ে ৮ কোটির বেশি। এত সংখ্যক গ্রাহক কোনো ব্যাংক বা এমএফএস-এর নেই। আমরা কীভাবে করলাম জিনিসটা? মানুষ যাতে ঝামেলা না পোহায়, সহজে সেকেন্ডের মধ্যে যেন নগদ অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, সেই ব্যবস্থা করলাম। এরপর বাস্তবতা তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন।
ব্যাংক মানেই মানুষ মনে করে যে, এটা বড়লোকদের ব্যাপার। যে কারণে সাধারণ মানুষ টাকা ব্যাংকে না রেখে ঘরে রাখে। লুঙ্গি পরে কাউকে ব্যাংকে যেতে দেখেছেন? পাশাপাশি ব্যাংকের যে পদ্ধতি, তা অনেক জটিল। তাই মানুষ আকৃষ্ট হয় না। ডিজিটাল ব্যাংক হবে একজন মানুষের মোবাইল। ধরুন কারও মনে হলো তার এই মুহূর্তে ১৫ হাজার টাকার প্রয়োজন, তিনি তার স্মার্টফোনের ডিজিটাল ব্যাংকে লগ ইন করবেন, এরপর অ্যাপ্লাই করবেন, মুহূর্তেই টাকা পেয়ে যাবেন গ্রাহক। এই সুবিধা কি কোনো ব্যাংক দিতে পেরেছে বা পারবে? এখানেই মূলত ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা।
দেশ রূপান্তর : নগদ মুদ্রা বা টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে ডিজিটাল ব্যাংক কী ভূমিকা রাখবে?
তানভীর এ মিশুক : বাংলাদেশ সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করতে যায়। তার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। লেনদেনকে ক্যাশলেস করতে এমএফএস কিছু কাজ করেছে। তবে সামগ্রিকতার বিচারে সেটা কিছুই না। ডিজিটাল ব্যাংক হলে সেই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি বদলে যাবে। তখন মানুষ চাইলে তার ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেন করতে পারবে। যদিও এটা বললাম আর হয়ে গেল, এমন নয়। এর জন্য গ্রাহককে প্রস্তুত করার বিষয় আছে। তাছাড়া প্রযুক্তির সমন্বয়েরও ব্যাপার আছে। তবে খুব শিগগির যে আমরা আরও বেশি ক্যাশলেস লেনদেন করতে পারব, তা বলাই যায়। আর এই উদ্যোগই হবে উন্নত বা স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সোপান।
দেশ রূপান্তর : দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক অবস্থার কথা আমরা জানি। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংক কি এই ধারার বাইরে থাকতে পারবে?
তানভীর এ মিশুক : ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকে সেই অনেকগুলো কারণ নেই। তার মূল কারণ হলো, এখানে শত শত বা হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি থাকবে না। তাছাড়া ঋণ যা দেওয়া হবে তার পুরোটাই হবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। আমি তো বলব ডিজিটাল ব্যাংক বরং ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার প্রতিষ্ঠা করবে। এখানে একজন গ্রাহকের ক্রেডিট রেটিং দেখে ঋণ প্রদান করা হবে। ক্রেডিট রেটিংয়েই বেরিয়ে আসবে গ্রাহক কতটা ঋণ পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংক হবে গণমানুষের ব্যাংকিং সেবা, যেখানে খুব সহজে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ নিতে পারবে গ্রাহক।
দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের একটি মাত্র প্রচলিত অফিস থাকবে। তাহলে কীভাবে গ্রাহক সেবা ও ব্যাংকিং কার্যক্রম চলবে?
তানভীর এ মিশুক : একটি অফিসের বিষয়টি ডিজিটাল ব্যাংকের নিবন্ধন শর্তে দেওয়া। এখানে সবকিছু হবে ডিজিটালি। ব্যাংকের নাম ডিজিটাল, কার্যক্রম অ্যানালগ হলে তো হবে না। যে কারণে প্রধান কার্যলয় থেকে সব ধরনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে যার সবটাই হবে ডিজিটালি। কাগজপত্রের কোনো বলাই থাকবে না। বাকি যেসব কাজ, সেসব তো গ্রাহক তার ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে ঘরে বসে করতে পারবেনই। তবে সারা দেশে আমাদের প্রতিনিধি থাকবেন। নগদ মোবাইল আর্থিক সেবার এখন দুই লাখ ৬০ হাজার উদ্যোক্তা প্রতিনিধি (এজেন্ট) আছেন। এই সংখ্যা ডিজিটাল ব্যাংকে আরও বাড়বে।
দেশ রূপান্তর : এতদিন ব্যাংক বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের ডেটা দিয়েই চলত। জানা যাচ্ছে যে ডিজিটাল ব্যাংকিং এক্ষেত্রে বিগ ডেটা সুবিধা নেবে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে বিগ ডেটা ব্যবহারের দক্ষতা কি তৈরি হয়েছে? গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?
তানভীর এ মিশুক : গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষার জন্য আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া এই সেবায় ভালো করা খুবই দুরূহ। কারণ আমাদের সামগ্রিক কার্যক্রম প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। গ্রাহকের ডেটা নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সবার আগে, তাই আমরা দেশ-বিদেশের অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের প্রযুক্তিগত সমাধান করছি। আর আপনি দেখেছেন যে, ডেটা সুরক্ষা দিতে আমরা সক্ষম। ইতিমধ্যে ৮ কোটি ৫০ লাখের বেশি গ্রাহক ভিত্তি আমরা তৈরি করেছি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার কারণেই। একটা কথা বলতে পারি গ্রাহক নিজে যদি তার তথ্য কাউকে দিয়ে না দেন তাহলে আমাদের সিস্টেমকে কোনো অবস্থায় ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়।
দেশ রূপান্তর : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং ৮ থেকে ১০ বছরেও সফল বা লাভজনক হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এতদিন ধরে সেবা দিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা ও ধৈর্য কি আছে মনে করেন?
তানভীর এ মিশুক : আমি তো ডিজিটাল ব্যাংকের সাফল্যের উদাহরণই বেশি দেখি। তাছাড়া সফল হওয়ার তো তিনটা পক্ষ আছে। সরকার বা দেশ, জনগণ বা গ্রাহক এবং বিনিয়োগকারী। প্রথম দুই পক্ষের সাফল্য সব জায়গাতে সব সময় নিশ্চিত হয়েছে। আর বিনিয়োগকারীদের সাফল্যের বিষয়টি নির্ভর করছে তারা ব্যবসাটাকে কীভাবে পরিচালনা করছে তার ওপর। এটি সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পাশের দেশের কথাই ধরুন না। সেখানে ডিজিটাল ব্যাংক ছাড়া আপনি অনেক সেবা পাবেনই না। একটু দূরের প্রতিবেশী চীন। সেখানে ভিক্ষাটাও দেওয়া হয় অ্যাপে। আবার দেশে ৬১টি ব্যাংক থাকলেও এখনো অর্ধেক মানুষ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে। ডিজিটাল ব্যাংকে বরং সবার যথেষ্ট সুযোগ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্তেই দুটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পাশাপাশি তারা দেশ ও গ্রাহকের সাফল্যও নিশ্চিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তানভীর এ মিশুক : আপনাকেও ধন্যবাদ।