মহুয়া মৈত্রকে নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে তার নিষ্পত্তি কবে হবে, আদৌ হবে কি না বলা মুশকিল। কৃষ্ণনগরের তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া বোধহয় তার সাংসদ পদটি খোয়াতে চলেছেন। মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। তিনি নাকি পয়সার বিনিময়ে ব্যবসায়ী দর্শন হিরানান্দানির যাতে ব্যবসায়িক সুবিধে হয়, তাই পার্লামেন্টে একাধিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। মহুয়ার প্রাক্তন বন্ধু, জয় অনন্ত দেহাদ্রাই অভিযোগ করেছেন, মহুয়া সংসদে ৬১টি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মধ্যে ৫০টিই পয়সার বিনিময়ে এবং হিরানান্দানির স্বার্থে। এমনকি মহুয়া এই প্রশ্ন তুলতে হিরানান্দানি গোষ্ঠীকে নিজের আইডি পাসওয়ার্ড দিয়ে দিয়েছিলেন। যা সংসদের নীতিবহির্ভূত ও রাষ্ট্রবিরোধী। এই পর্যন্ত পড়লে যে কেউই নিশ্চিন্ত হবেন যে যাবতীয় দোষ তাহলে অবশ্যই মহুয়া মৈত্রের। ফলে সংসদের এথিক্স কমিটি যা শাস্তি দেবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প রাস্তা নেই। মুশকিল হচ্ছে গোটা বিষয়টিকে এমন সরলীকরণ করা সম্ভব নয়। মহুয়া মৈত্রের উল্টোদিকের যে মুরব্বিরা নীতিশাস্ত্র আওড়াতে আওড়াতে মহুয়াকে সবক শেখাতে চাচ্ছেন, তাদের প্রত্যেকের অভিসন্ধি নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে প্রশ্ন উঠে গেছে।
আসলে বিজেপি যত লোকসভা ভোট এগিয়ে আসছে ততই নানাভাবে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর বন্ধ করতে চাচ্ছে এটা একটু আধটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়। ছুঁতোনাতায় যেভাবে বিরোধীদের ওপর কেন্দ্রীয় এজেন্সি, ইডি, সিবিআই, এনআইএ লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা যথেষ্ট দৃষ্টিকটু। আপনি বলতেই পারেন যে, অপরাধ যেই করুক, আইন আইনের পথে চলছে, এতো গণতন্ত্রের পক্ষে উদাহরণস্বরূপ। এর থেকে প্রমাণ হয় পৃথিবীর সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক দেশের নাম ইন্ডিয়া, থুড়ি, ভারত। এসব তো ঠিক আছে। মুশকিল হচ্ছে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সবক্ষেত্রে কেবলমাত্র বিরোধী দল বা সংঘ পরিবার নিয়ে সোচ্চার বুদ্ধিজীবীদের ওপর একতরফা আক্রমণ নামিয়ে আনা দেখে, সন্দেহ হয় গোটা বিষয়টি একতরফা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে। বিজেপি সাংসদ পার্লামেন্টে, খোলাখুলিভাবে সবার সামনে বিরোধী, সংখ্যালঘু এমপিকে অত্যন্ত কুৎসিত ভাষায় তার ধর্ম নিয়ে আক্রমণ করেও পার পেয়ে যান। কুস্তি ফেডারেশনের নেতার বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগিররা দলবেঁধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনলেও, তিনি বহাল তবিয়তে এমপি থেকে যান, বিজেপি সদস্য বলে। উল্টোদিকে বিচার পাওয়া দূরে থাক, আমাদের সোনা জেতা কুস্তিগিরদের ওপর নৃশংস পুলিশি অত্যাচার নেমে আসে প্রকাশ্যে রাস্তায়। আক্রমণ কি শুধু আইনি পথে নেমে আসছে! সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি ভিন্ন মত পোস্ট করলেই সংঘ পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির সদস্যদের চোখা চোখা বাক্যবন্ধ আপনার মৃত মা-বাবাকেও রেহাই দিচ্ছে না। চুনোপুঁটি ভক্ত, সেও যদি কেউ প্যালেস্টাইন নিয়ে পোস্ট দেয় তাকেও ধমকাচ্ছে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার কেস দিয়ে জেলে পুরে দেবে বলে। সারা দেশে একধরনের ভয়, আতঙ্ক সৃষ্টি করে, আর যাই হোক গণতন্ত্রের বুলি কপচানো গেলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। বিরোধী স্বর যাবতীয় দুর্নীতির আধার, আর শাসকদের সবাই ধোয়া তুলসী পাতা এরকম অদ্ভুত গণতন্ত্রের উদাহরণ পৃথিবীর কোথাও নেই।
বিজেপি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করলেই তাকে হেনস্তা করা এখন এদেশের দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। জহরলাল নেহরুর বিরুদ্ধে খোদ জামাই ফিরোজ গান্ধী সমালোচনা করতেন। রাম মনোহর লোহিয়া বা মিনু মাসানি কিংবা কমিউনিস্ট নেতা হীরেন মুখার্জী প্রায় সময়ই নেহরু সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, কখনো তাদের বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়নি। পরেও লালবাহাদুর শাস্ত্রী, এমনকি অটলবিহারি বাজপেয়ি পর্যন্ত বিরোধী স্বর ধৈর্য ধরে শুনতেন। জরুরি অবস্থার সময়কে বাদ দিলে, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধেও কখনো অসহিষ্ণুতার অভিযোগ ওঠেনি। একটা ঘটনা এই প্রসঙ্গে না বলে পারছি না। শ্রীমতী গান্ধী তখন দোর্দণ্ড প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তার ঘনিষ্ঠ, চিত্তরঞ্জন দাশের নাতি সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। কোনো একটি বিষয়ে তিনি আলোচনার জন্য তৎকালীন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সম্ভবত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ত্রিগুনা সেনকে নিজের দপ্তরে ডেকে পাঠান, খবরটা কীভাবে জানতে পেরে শ্রীমতী গান্ধী সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধার্থ রায়কে বলেন, এটা ঠিক নয়। একজন শিক্ষাবিদকে ডেকে না পাঠিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাই হয়েছিল। সিদ্ধার্থ রায় উপাচার্যের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। রাজনীতিতে এই সৌজন্য ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এদেশের পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। সে সব রাজ্য বিজেপির পরিস্থিতি ভালো নয়। অথচ তা সত্ত্বেও সেখানে বিজেপির অভ্যন্তরীণ লাঠালাঠি দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ব্র্যান্ড নরেন্দ্র মোদির ক্যারিশম্যাটিক জেল্লাও যে দিনকে দিন মলিন হচ্ছে তা তো কর্নাটকের ভোটে বিজেপির লেজেগোবরে অবস্থা দেখেই স্পষ্ট। বাইরে থেকে বাঘ মনে হলেও বিজেপি যে কিছুটা হলেও ইতিমধ্যেই কাগুজে তা পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী হালহকিকত নিয়ে খোঁজখবর করলেই বোঝা যাচ্ছে। আসলে, নরেন্দ্র মোদির সরকার স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণ ও বহুবিধ গিমিক দিয়ে ভারতের বহুত্ববাদী কাঠামোকে শেষ করতে সক্রিয়। এদেশে ধনী আরও ধনী, গরিব আরও গরিব হচ্ছে। গরিব, মধ্যবিত্তের ওপরে নানান ট্যাক্স চাপিয়ে তাদের সংকট বাড়িয়ে তুলে, ধনী শিল্পপতিদের কোটি কোটি টাকা ঋণ মওকুফ করা, নিশ্চিত কোনো জনমোহিনী কাজ নয়। নীরব মোদি, মহুল চোক্সিদের মতো ফাটকা পুঁজির কারবারিরা বিপুল অর্থ নয়ছয় করে দিব্যি বিদেশে রয়ে গেলেন। তাদের স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই এই সরকারের। অথবা ইচ্ছে করেই তাদের রক্ষা করে চলেছে সরকার।
শুধু রাজনীতি, অর্থনীতি নয়, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কাঠামো ধ্বংস করার প্রবণতাও অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে লজ্জাজনক। মোগল যুগ থেকে নেহরু জমানার যাবতীয় চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। ইতিহাস বদলে রূপক, পুরাণ, লোকবিশ্বাসকে ইতিহাস বলে জনমনে চারিয়ে দিতে সক্রিয় হিন্দু হৃদয় সম্রাট ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। আগামী নির্বাচনের আগেই ঘটা করে রামমন্দির জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পায়ে হেঁটে মন্দিরের মধ্যে রামচন্দ্রের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় আবেগে গতি আনবেন। নতুন করে হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্থানের আওয়াজ উঠবে বাবা সাহেব আম্বেদকরের ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে। আওয়াজ উঠবে উগ্র জাতীয়তাবাদের। পরমতসহিষ্ণু ভারত ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে মনুবাদী রাষ্ট্রের দিকে। এই পরিস্থিতিতে কখনো রাহুল গান্ধীর সাংসদ পদ তুচ্ছ কারণে খারিজ করা হবে। কখনো মহুয়া মৈত্রের মতো ফায়ার ব্র্যান্ড সাংসদকে চরিত্র হনন করে তার কণ্ঠস্বর বন্ধ করার চেষ্টা হবে। ফলে মহুয়াকে নিয়ে যা হচ্ছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। মহুয়ার সম্ভবত সবচেয়ে বড় অপরাধ শিল্পপতি আদানি সাম্রাজ্য নিয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন তুলে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অস্বস্তিতে ফেলা। কখনো কোনো সময় যে দল নীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়, যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে অসাধু উপায়ে, স্রেফ ক্ষমতা দখলের জন্য অপর দলের নির্বাচিত এমএলএ, এমপি কেনাবেচা করে, তারা যখন এথিক্স নিয়ে গুরুগম্ভীর বাণী দেন, তখন সন্দেহ হবেই যে পেছনে নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে। তড়িঘড়ি যেভাবে সংসদের, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এথিক্স কমিটিকে সক্রিয় করা হলো মহুয়া মৈত্রের ‘অপরাধের’ বিচার করতে তা নিছক দেশের স্বার্থে তা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কেউই বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। মহুয়া মৈত্র পুরোপুরি নির্দোষ নাও হতে পারেন। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে একই ধরনের অপরাধে বিজেপি সাংসদদের হয়রানি করা হতো না। যা মহুয়ার ক্ষেত্রে হচ্ছে।
লঘু পাপে গুরু দণ্ড যে মহুয়ার বেলায় হতে চলেছে, তার জন্য কোনো গণৎকার বা জ্যোতিষীর দরকার নেই। সাদা চোখে, একটা বাচ্চাও এটা বুঝতে পারছে। মহুয়ার সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’ তিনি পরম শক্তিধর আদানির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। করপোরেট, রাজনৈতিক মাফিয়া, তথাকথিত স্বাধীন মিডিয়া এই অসীম শক্তিশালী ত্রিশক্তির বিপক্ষে কথা বলা এখন এদেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করার চেয়েও কঠিন। সেই কাজটি করতে গেছেন এক বঙ্গ তনয়া। ফলে জল ঘোলা তো হবেই। মহুয়া একে মেয়ে, তারপর আবার সুন্দরী। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সাজানো বিচারের পাশাপাশি চরিত্র নিয়ে গালমন্দ তো স্বাভাবিক ঘটনা। এথিক্স কমিটির প্রথম মিটিংয়ে মহুয়া অভিযোগ করেছেন, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন সব প্রশ্ন তোলা হয়েছে যা স্রেফ রুচি বিরুদ্ধ নয়, যথেষ্ট অশোভন। মহুয়া বলেছেন, মনে হচ্ছিল যেন মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পর্ব নতুনভাবে আমাকে নিয়ে করা হচ্ছিল। সব থেকে বিচিত্র, এত বড় ঘটনায় মহুয়ার দল তৃণমূল কংগ্রেস সেভাবে তার পাশে নেই। দু-একজন, কখনো ববি হাকিম বা শশী পাঁজা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মুখ খুললেও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো অবধি মোটের ওপর চুপচাপ। হতে পারে নির্বাচনের কোষাগার বা অন্য কোনো কারণে আদানিকে চটাতে তৃণমূল দল নারাজ। মহুয়া যদি বহিষ্কৃত হন পার্লামেন্ট থেকে, তখন তৃণমূল কী ভূমিকা নেয়, সেটাও দেখার।
লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও কলামিস্ট
sdastidar27@gmail.com