ফিলিস্তিন-ইসরায়েল

‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের চ্যালেঞ্জ

সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয় তাকে চলতি শতকের মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় চমক বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চিরাচরিত যুদ্ধ-মনোভাবের ইতি ঘটতে যাচ্ছে বলে ভাবা হচ্ছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে ‘বাস্তবতা’ হিসেবে মেনে নিচ্ছিল। ফলে ভাবা হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতায় হয়তো ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমির লড়াই দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝিমিয়ে পড়বে। কিন্তু ৭ অক্টোবর হামাসের যোদ্ধারা গত শতাব্দীর পুরনো অস্ত্র ও কৌশল দিয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে যেভাবে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে, তার ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিনের দাবি পুনরায় জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। 

বর্তমানে অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। আরব দেশগুলো দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছে এবং সেই সঙ্গে ’দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যও মৃদুস্বরে ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের কথা বললেও বর্তমান যুদ্ধকালে তারা ইসরায়েলের প্রতি একচেটিয়া অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামা দৃঢ়ভাবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। এবারের যুদ্ধ চলাকালে আরব বিশ্বের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশ ইতালি ও গ্রিস ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ-ফ্রান্সিসও একই কথা বলেছেন। কট্টর মার্কিনবিরোধী নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিও সংকটের ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানে বিশ্বাস করতেন।

অ্যাকাডেমিক জগতেও ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের আইডিয়া বেশ জনপ্রিয়। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় একটি স্বাধীন ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে ইসরায়েলও সহজে মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি পাবে যার জন্য ইহুদিরা বহুদিন ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আদতে ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের বাস্তবতা কতটুকু? আদলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা কি সম্ভব?  সরল রেখায় এখনো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের আবেদন রয়েছে এবং দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। তবে এই প্রক্রিয়ার চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েলের চলমান দখলদারিত্ব। যে ১৯৬৭ সালের মানচিত্র মতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে সেখানে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েল ইতিমধ্যে সাড়ে ৮ লাখ অবৈধ বসতি স্থাপন করেছে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমকে বলা যেতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগার। একজন ফিলিস্তিনিকে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে কোথাও যেতে হলে কয়েকবার ইসরায়েলি চেকপোস্টের সামনে পড়তে হয়। ফলে যেখানে ফিলিস্তিনিদের বাকি ভূমিও ইসরায়েল দখল করে রেখেছে সেখানে কীভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সম্ভব? তবে একসময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজাকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফিলিস্তিনিদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ইসরায়েল। ফলে যথাযথ আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখলমুক্ত করা যায়।

দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের আলোচনায় অসলো চুক্তির অভিজ্ঞতাকে আমলে নেওয়া জরুরি। এই যাবৎকালের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সমাধান ছিল অসলো চুক্তি। ১৯৯৩ সালে ওয়াশিংটনে এবং ১৯৯৫ সালে মিসরে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তির উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল প্যালেস্টাইন জাতীয় কর্তৃপক্ষের (পিএলও) সৃষ্টি, যাকে পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকার কিছু অংশে সীমিত ফিলিস্তিনি স্ব-শাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনের নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের হাতে রাখা হয়। অসলো চুক্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা বলা হলেও কীভাবে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে এবং এর আন্তর্জাতিক সীমানা সম্পর্কিত আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে স্বভাবতই ফিলিস্তিনি জনগণ অসলো চুক্তিকে ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠী এই চুক্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই গ্রুপগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিদের ফিলিস্তিনের ভূমিতে আসার আগের ফিলিস্তিনকে ফেরত চায়। অন্যদিকে অতি ডানপন্থি ইসরায়েলিরাও অসলো চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনকে ডানপন্থি ইসরায়েলি চরমপন্থির হাতে নিহত হতে হয়। কারণ ডানপন্থি ইহুদিরা পুরো ফিলিস্তিন ভূখ-কে দখল করতে চায় যেখানে কোনো মুসলমান থাকবে না এবং বৃহত্তর ইসরায়েল গড়তে চায়।

বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও শোষণের প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়ায় বেশ কিছু ইরান সমর্থিত বিপ্লবী সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। অন্যদিকে এবারের যুদ্ধে এটা প্রমাণ হয়েছে যে ইসরায়েল একটি রাষ্ট্র নয় যা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত, বরং ইসরায়েল একটি সিন্ডিকেট যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর পলিসি তারা প্রভাবিত করে। চলমান যুদ্ধে অনেক ইহুদি ইউরোপ-আমেরিকার বিলাসী জীবন ছেড়ে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইসরায়েলে এসেছে। ফলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের বাইরেও বিস্তৃত। অনেকগুলো প্রক্সি গ্রুপ এখানে যুক্ত। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ‘ইসরায়েলিদের অধিকার’ বেশ আবেগতাড়িত এজেন্ডা যা ভোটের সমীকরণ ও নির্বাচনী ফান্ডকে প্রভাবিত করে। এছাড়া ইউরোপিয়ানদের ইহুদিদের প্রতি অন্ধ সহানুভূতি রয়েছে। চলমান যুদ্ধে তা আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে। যে ফ্রান্স নিজেকে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দেশ বলে গর্ব করে সেই দেশটি সম্প্রতি ইসরায়েলের সমালোচনা করলে ২ বছরের জেল ও ৭৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান জারি করেছে।

কিছু কিছু অ্যাকাডেমিশিয়ান ইসরায়েল ফিলিস্তিন মিলে ‘বহু জাতি, বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতি’র একটি ফেডারেশন গড়ার কথা তুলছেন। তীব্র অবিশ্বাস ও ইসরায়েলের দখলদারিত্বের ইতিহাসের কারণে তা একেবারেই অসম্ভব। বরং এটি বাকি ফিলিস্তিন ভূখ-কে ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার কৌশল ছাড়া কিছু নয়।  ‘দ্বি-রাষ্ট্রিক’ সমাধানের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি। বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ‘নৈরাজ্যপূর্ণ’। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো কর্তৃপক্ষ নেই যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে বা সামাল দেবে। যদিওবা ১৮১৫ সালের ‘ভিয়েনা কংগ্রেসের’ পর ইউরোপে ছোট দেশগুলো সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি দিতে ‘শক্তিশালী দেশ’গুলো এগিয়ে এসেছিল। ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ এবং আরবদের আন্তর্জাতিক গ্যারান্টার হতে হবে। 

সবচেয়ে বড় কাজ হলো বিশ্বশান্তির পক্ষে গণজোয়ার ও জনসচেতনতা তৈরি করা। এই সচেতনতা আসতে হবে সাধারণ ফিলিস্তিনি, ইহুদি, আরবদের মধ্যে ও সারা বিশ্বে। ইউরোপে ১৬১৮-১৬৪৮ সাল পর্যন্ত ত্রিশ বছরের ধর্মযুদ্ধের পর ১৬৪৮ সালে যে ‘ওয়েস্টফেলিয়া শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরিত হওয়া, এমনকি ১৮১৫ সালে ইউরোপে ‘কংগ্রেস অব ভিয়েনা’ প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রভাবক ছিল যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বিপক্ষে অবস্থান ও শান্তির পক্ষে জনসমর্থন। গত ৭৫ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ৭৫ বছর ধরে ইসরায়েলের যে অবৈধ দখলদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে চলছে তার শেষ হওয়ার দরকার। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ, এরপর ইরাকের কুয়েত আক্রমণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ, সৌদি আরবের ইয়েমেনে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণহানি, সম্পদহানি আর সংঘাত ছাড়া কিছুই দেয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নেতৃত্ব ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়তে চায়। সৌদি-কাতার সমঝোতা, সৌদি-ইরান সমঝোতা তারই পদক্ষেপ। কিন্তু স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া, ফিলিস্তিনিদের ওপর জুলুম বন্ধ করা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত শান্তি আসবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য কার্যকর ও সার্বভৌম স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার। নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এখনো সে প্রক্রিয়া কার্যকর করার বাস্তবতা ফুরিয়ে যায়নি।

লেখক : কলামিস্ট

shahadatju44@gmail.com