কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রূপকুমার বর্মণ বৃহত্তর বঙ্গদেশের 'ট্রান্স-বর্ডার' নদী নিয়ে গবেষণা করেছেন, যেগুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ও বাংলাদেশে উত্তরবঙ্গে প্রবহমান।
তাঁর গ্রন্থ (Rup Kumar Barman, River, Society and Culture: Environmental Perspectives on The Rivers of Assam and Bengal. Delhi: Primus Books, 2023) নদীকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চায় অনন্য রচনাশৈলীর পরিচয় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে। নদী কীভাবে জনমানসের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উদ্দীপিত করতে পারে এবং সেই সঙ্গে মানুষের জীবনধারণের অর্থনৈতিক কাণ্ডারী হয়ে উঠতে পারে তা লেখক তাঁর সুদক্ষ লেখনীর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন।
অধ্যাপক বর্মণের লেখায় নদী হয়ে উঠেছে নদী-অববাহিকা অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর গোষ্ঠীগত এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রতীক। আবহমানকাল ধরে নদী মানুষের অভিবাসনের ফলে উদ্ভূত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সাক্ষী থেকেছে এবং দ্বন্দ্ব প্রসূত অভিবাসনের ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট আদি-অধিবাসী ও আগন্তুক সম্প্রদায়ের লোকেদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের দলিল এই উপন্যাস কেন্দ্রিক ইতিহাস-বিশ্লেষণ।
নদী ও মানুষ নিয়ে এমন আরও গবেষণা ও সাহিত্য বাংলা ভাষাতেই রয়েছে। রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অভিন্ন নদী নিয়ে সংঘাতের বিশ্লেষণ। 'ওয়াটার পলিটিকস' নামে একটি বিশেষ গবেষণাক্ষেত্রও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বিশ্বব্যাপী।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উত্তরের নদীগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, আন্তঃরাষ্ট্রগত সীমানা ছুঁয়ে অধিকাংশ নদীই উত্তর জনপদ দিয়ে এদেশে প্রবেশ করেছে। যদিও সাধারণভাবে পদ্মা, যমুনা, করতোয়া, তিস্তা, ধরলা, মহানন্দা নদী অধিক পরিচিত, তথাপি সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে আরও অনেক নদী।
চমৎকার সেসব নদীর নাম: বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতী, সুতিখালি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, ছৈাট যমুনা, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রত্নাই, পূনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলা।
কিন্তু এসব নান্দনিক নামের অনিন্দিত নদীগুলোর অস্তিত্ব উত্তর জনপদে চরম হুমকির মুখে। নানামুখী অব্যবস্থা, দখল, দূষণের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। রাজশাহীর বড়াল নদ অস্তিত্ব সংকটে উত্তরের ৪০ নদী। ফলে এ অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার জলপথ আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া যাবে না।
বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের উত্তরের ৪০ নদীর এখন অস্তিত্ব সংকট চলছে। পানির প্রবাহ না থাকা, দুইপাড় দখল আর দূষণে এসব নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। অপর দিকে সরকারের গৃহীত অপরিকল্পিত পদক্ষেপই কিছু নদ-নদীর মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
রাজশাহীর বড়াল নদ হলো নদীমৃত্যুর অন্যতম উদাহরণ। এমন কি, এক সময়ের খড়স্রোতা বড়াল ছাড়াও নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, সুতিখালি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, ছৈাট যমুনা, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রত্নাই, পূনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ তিন শতাধিক প্রধান নদী, শাখা ও প্রশাখানদী শুকিয়ে গেছে। এতে ভূউপরিস্থ পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার জলপথ আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া যাবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশেই অপমৃত্যুর শিকার হয়ে নদী হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশেষত উত্তরের জনপদ হলো খরা ও মঙ্গা কবলিত। সেখানকার মাটিতে আর্সেনিকের ভয়াবহ প্রকোপ বিদ্যমান। জলবাহী নদী থাকলে এসব সমস্যা দমিয়ে রাখা সম্ভব হলো। নদীগুলোর জলের তোড়ে অনেক প্রাকৃতিক সমস্যা ভেসে যেতে পারতো।
পানির অভাবে ও দখলের ফলে নদী হারিয়ে গেলে প্রকৃতি ও মানুষ বিপন্ন হতে বাধ্য। শ্যামলী উত্তর বাংলাও রূপরস হারিয়ে বিবর্ণ ও পাণ্ডুর হবে দিনে দিনে। নদীর অভাবে সৃষ্টি হবে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক বিপর্যয়, যা মোটেও সুখকর ও কাম্য নয়।
এখনও যদি সতর্ক না হওয়া যায় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের সবার চোখের সামনে দিয়ে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে উত্তরের নদীগুলো। এর ফলে আমাদের বর্তমান ও ভবিষৎ ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন হবে। নদী ও পরিবেশের চরম ক্ষতি করে আমরা যদি অনাগত চরম বিপদকে আলিঙ্গন করি, তাহলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না আমাদের।
লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।