শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইমড আউট করে বিশ্বকাপে জয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। যদিও ক্রিকেট বিশ্বে সাকিবের সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে হচ্ছে অনেক আলোচনা। বিশ্বের অনেক সাবেক ক্রিকেটার এই সিদ্ধান্তকে খেলার সৌন্দর্যের পরিপন্থী দাবি করে সাকিবের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এই তালিকায় আছেন ওয়াকার ইউনুস, মার্ক ওয়াহ, উসমান খাজার মতো তারকা। আবার মাইকেল ভন, সায়মন ডৌলের মতো সাবেক তারকারা পক্ষে বলেছেন সাকিবের। টানা ছয় ম্যাচ হারা একটি দলের অধিনায়কের কাছে স্পিরিট অব দ্য গেমের চেয়ে দলের জয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সাকিব যাকে একটি যুদ্ধ জয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আইসিসির আইনের সুযোগটাই তিনি নিতে চেয়েছেন। সাকিবের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ভেতরে সেভাবে সমালোচনা হয়নি। তবে দলের পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড ম্যাচের পর একটি নিউজ পোর্টালকে সাকিবের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। বিষয়টা ভালো চোখে দেখেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। অচিরেই এই দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক তারকার কাছে বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাইবে বিসিবি। ওদিকে বাঁ হাতের তর্জনীতে চোট পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া সাকিবের দলের সঙ্গে না থেকে দেশে ফিরে যাওয়া নিয়েও শুরু হয়েছে সমালোচনা। প্লেয়িং ইলেভেনে না থেকেও তিনি থাকতে পারতেন দলের সঙ্গে। ১১ নভেম্বর পুনেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলকে চাঙ্গা করে রাখার দায়িত্ব অধিনায়কের। এই ম্যাচের ওপর ২০২৫ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলা অনেকটা নির্ভর করছে।
বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচ হারার পর টানা ছয় জয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। মঙ্গলবার মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ২০১ রানের অতি মানবীয় ইনিংস খেলে নিশ্চিত হেরে যাওয়া ম্যাচটি তিন উইকেটে জিতিয়েছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে যে ইনিংসটি ইতিমধ্যে সেরার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ম্যাক্সওয়েলের সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ১১ নভেম্বর বাংলাদেশকে দিতে হবে পরীক্ষা। যেখানে অবধারিতভাবেই অধিনায়ক সাকিবকে মিস করবে দল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দিল্লিতে ব্যাটে-বলে ছন্দ ফিরে পাওয়া সাকিবের জন্য মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামটি অপয়াই হয়ে রইল। গত ১৯ অক্টোবর এই মাঠে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটিও মিস করেছিলেন চোটের কারণে। এবার আঙুলের চোটে শেষ হয়ে গেল বিশ্বকাপ। ২০১৯ বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ব্যাট হাতে ৬০৬ রান এবং বল হাতে ১১ উইকেট নিয়ে আসরের সেরাদের তালিকায় ওপর দিকেই ছিলেন সাকিব। এবার অবশ্য সেই রূপে দেখা যায়নি বাংলাদেশ অধিনায়ককে। ব্যাট করতে দলের অন্যদের মতোই ভুগতে দেখা গেছে বেশিরভাগ ম্যাচে। দুঃসময়টা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কাটিয়ে উঠলেও আঙুলের চোট তাকে বাধ্য করেছে দেশে ফিরে যেতে। ৬ নভেম্বর দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে জন্ম নেওয়া অদ্ভুত টাইমড আউট নামক আউটের ঘটনায় সমালোচকদের মিছিলে ডোনাল্ডের যোগ দেওয়া দলের ভেতরে তৈরি করেছে অসন্তোষ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস এ ব্যাপারে বলেন, ‘ডোনাল্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত সংবাদটি বিসিবির দৃষ্টিতে এসেছে এবং এটাকে বিসিবি খুব গুরুত্বসহকারে নিচ্ছে। বোর্ডরে পক্ষ হয়েই বলছি, এখন না হলেও পরে সুনির্দিষ্ট জবাব দেব।’
জালাল ইউনেসের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, চোটের পর সাকিব কেন তড়িঘড়ি দেশে ফিরে গেলেন? আঙুলের চোট পাওয়ার পরে প্রায় ছয় মাস পুনর্বাসন শেষে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ার পরও নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনকে কেবল বিশ্বকাপ দলেই রাখা হয়নি, হাতে ব্যান্ডেজ নিয়েই দলের সঙ্গে ভারতে আসেন উইলিয়ামসন। প্রথম দুই ম্যাচ মিস করার পরে বাংলাদেশের সঙ্গে তৃতীয় ম্যাচে নেতৃত্ব দেন। উইলিয়ামসনের এ বিষয়টি নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় প্রশংসার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সাকিব না খেলেও দলের সঙ্গে থেকে পারতেন দলকে উদ্বুদ্ধ করতে। এর আগে বিশ্বকাপের মধ্যে ফর্ম ফিরে পেতে দল রেখে ঢাকায় যাওয়া নিয়েও হয়েছিল সমালোচনা। এবার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ঢাকায় ফেরা নিয়েও সেটা হচ্ছে। জালাল ইউনুস অবশ্য বলছেন বদলি হিসেবে এনামুল হক বিজয়কে আনার ফলে ৩০ জনের স্কোয়াডে সাকিবকে রাখার সুযোগ ছিল না, ‘সাকিব থাকতে পারত, তবে ৩০ জনের মধ্যে থাকতে পারত না। ওরা (আইসিসি) রাখত না। সাকিবের জায়গায় যেহেতু বিজয় আসছে, আমাদের তো ৩০ জনের কোটা পূরণ হয়ে যায়। থাকলেও ও ম্যাচের দিন মাঠে থাকতে পারত না। তবে থাকলে হোটেলে সবার সঙ্গে থাকতে পারত, প্র্যাকটিসেও থাকতে পারত, আসলে অস্থির হয়ে যায় আসার জন্য।’
চোটের কারণে বিশ^কাপ শেষ হয়ে গেলেও বিতর্ক ছাড়ছে না সাকিবকে। টাইমড আউটকাণ্ডে দেশের ক্রিকেটে তাকে নিয়ে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তার পক্ষে থাকা মানুষের যেমন অভাব নেই, আবার ডোনাল্ডের মতো সমালোচনার লোকও মিলে যাচ্ছে অনেক। টিম ম্যানেজমেন্টের অংশ হয়ে ডোনাল্ড সাকিবের সমালোচনা করে একপ্রকার স্ববিরোধী কাজই করেছেন। হয়তো এটা পেস বোলিং কোচ হিসেবে বাংলাদেশের অধ্যায়টাই শেষ করে দেবে প্রোটিয়া কিংবদন্তির। এর আগেই অবশ্য ডোনাল্ডের ব্যাপারে বিসিবির একটা মনোভাব বোঝা গেছে। বিশ্বকাপের পরপরই তার সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে যাবে বিসিবির। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে সেভাবে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি ক্রিকেট নিয়ন্তা সংস্থার পক্ষ থেকে। বাংলাদেশে যে আর কাজ করা হচ্ছে না, এটা বুঝতে পেরেই হয়তো এমন একটা উক্তি করেছেন।
ডোনাল্ডের সমালোচনার প্রশ্নে সাকিব বোর্ডকে পাশে পেলেও দল রেখে দেশে ফিরে যাওয়াটা খুব যে ভালোভাবে নিচ্ছে না বিসিবি, তা তো জালাল ইউনুসের কথাতেই পরিষ্কার। বিশ্বকাপ যাত্রার আগের দিন একটি বেসরকারি টিভিতে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বোর্ডের এবং এর শীর্ষ কর্তার সমালোচনা করে অনেক কথাই বলেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে পারিনি লড়াকু ক্রিকেট খেলতে। সুপার লিগে তৃতীয় স্থানে থেকে বিশ্বকাপে আসা বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা ছিল সেমিফাইনালের। তবে ১০ দলের আসরে সেমিফাইনালের লড়াই থেকে প্রথম দল হিসেবে বাদ পড়া বাংলাদেশের ব্যর্থতার দায় অধিনায়ক হিসেবে সাকিবের ঘাড়েও বর্তায়।
১১ নভেম্বর বিশ্বকাপের অভিযান শেষে, দলের সামগ্রিক ব্যর্থতার কারণ বের করতে সুষ্ঠু ময়নাতদন্ত চাইছেন বোর্ডের বেশিরভাগ পরিচালক। ওয়ানডে ফরম্যাটে একটা সমীহ জাগানিয়া দল কী করে এতটা খারাপ পারফরম্যান্স করল, এর পেছনে সত্যিকারের কারণটাই বা কী, সেসব জেনে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গঠনের প্রত্যাশা সবার। নতুন সেই প্রক্রিয়া শুরুর আগে অধিনায়ক হিসেবে সাকিবকেও দাঁড়াতে হবে কাঠগড়ায়।