বোস্টনের পর এবার মনস্তাত্ত্বিক কান্নায় ভিজল মেক্সিকোর মন্তেরেইও। জার্মানি ও প্যারাগুয়ের সেই মহানাটকীয় ১-১ স্কোরলাইনের পর টাইব্রেকার ট্র্যাজেডির রেশ কাটতে না কাটতেই, এস্তাদিও বিবিভিএ-তে মঞ্চস্থ হলো আরও এক মহাকাব্য। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর, পেনাল্টি শুটআউটের স্নায়ুযুদ্ধে ৩-২ ব্যবধানে নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করে শেষ ষোলোর টিকিট কাটল গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ষষ্ঠ ও সপ্তম দলের এই হাইভোল্টেজ দ্বৈরথের ভাগ্য নির্ধারণে মরক্কোর হয়ে শেষ পেনাল্টিতে জাল কাঁপান গ্রুপ পর্বের নায়ক ইসমায়েল সাইবারি। যিনি তার পুরো পেশাদার ফুটবল কাটিয়ে চলেছেন নেদারল্যান্ডসে।
৩-২ ব্যবধানের এই অদ্ভুত আর ভুলত্রুটিতে ভরা টাইব্রেকারের শুরুটা ছিল চরম নাটকীয়। মরক্কোর নিল এল আইনাউই এবং ডাচ বদলি খেলোয়াড় জাস্টিন ক্লুইভার্ট শুরুতেই নিজেদের শট মিস করেন। এরপর মরক্কোর সুফিয়ান রাহিমির শট ডাচ কিপার বার্ট ভারব্রুগেন ঠেকিয়ে দিলেও বলটি তাঁর শরীরের নিচে দিয়ে গড়িয়ে লাইন পার হয়ে যায়। নেদারল্যান্ডসের কোয়েন্টন টিম্বার চতুর্থ শটটি পোস্টের বাইরে মারেন। এরপর মরক্কোর আশরাফ হাকিমি ম্যাচ জেতার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও শট মারেন পোস্টে! তবে শেষ রোমাঞ্চে ক্রিসেনসিও সামারভিলের নেওয়া ডাচদের শেষ শটটি বুক চিতিয়ে রুখে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু। আর সাডেন ডেথে জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে ফুটবলার হওয়া সাইবারি কোনো ভুল না করে বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে মরক্কো।
অথচ ম্যাচের শুরু থেকে মেক্সিকোর স্থানীয় গ্যালারি ছিল ডাচদের বিপক্ষে। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই বিতর্কিত পেনাল্টির প্রতিশোধ নিতে স্থানীয়রা প্রতিটি ডাচ টাচেই ভুয়ো দিচ্ছিল। ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এই ম্যাচে প্রথমার্ধে আধিপত্য ছিল মরক্কোরই। তবে ডাচ গোলরক্ষক ভারব্রুগেন প্রথমার্ধে আইনাউই ও আইয়ুব বুয়াদ্দির নিশ্চিত দুটি গোল রুখে দেন। হাকিমির একটি জোরালো শট বারে লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে প্রথমার্ধের শেষের দিকে মিকি ফ্যান ডি ভেনের দূরপাল্লার শট দারুণভাবে প্রতিহত করেন মরক্কোর কিপার।
ম্যাচের ৭২ মিনিটে এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয় ফুটবলবিশ্ব। ডাচ কোচ রোনাল্ড কোম্যান মাঠে নামান স্ট্রাইকার ডাউট ভেগহোর্স্টকে। তার হেড থেকেই বল পান সামারভিল, আর তার পাস থেকেই চমৎকার ফিনিশিংয়ে গোল করে ডাচদের এগিয়ে দেন কোডি গাকপো। গোলটি করেই আকাশ পানে চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই ফরোয়ার্ড। অতি সম্প্রতি গাকপো ও তাঁর সঙ্গী নোয়া ভ্যান ডের বিজ তাঁদের অনাগত সন্তানকে হারিয়েছেন; সেই গভীর শোক বুকে চেপেই আজ বিশ্বমঞ্চে জ্বলে উঠেছিলেন তিনি। পুরো ডাচ বেঞ্চ মাঠে এসে এই অশ্রুসিক্ত নায়ককে জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন হয়তো অন্য কিছু ছিল। ডাচদের যখন জয়ের ক্ষণগণনা চলছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে ৯১ মিনিটে মরক্কোকে সমতায় ফেরান ইসা দিওপ। বদলি খেলোয়াড় চেমসেডিন তালবির এক চমৎকার নিখুঁত ক্রস থেকে ডাচ অধিনায়ক ফন ডাইককে ফাঁকি দিয়ে বাতাসে ভেসে হেডে গোল করেন দিওপ। এরপর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে রাহিমির এক নিশ্চিত শট ভারব্রুগেন হাত ও হাঁটুর যৌথ ছোঁয়ায় বাঁচিয়ে দিলে ম্যাচ গড়ায় সেই পেনাল্টি শুটআউটে। যেখানে ডাচদের বিদায় করে আগামী শনিবারে সহ-আয়োজক কানাডার বিপক্ষে শেষ ১৬-র লড়াই নিশ্চিত করল মরক্কো।