প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক বিপর্যয় আর রাজনৈতিক বিপর্যয় শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। কভিড নামক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের শিক্ষাকে বহু বছর পেছনে নিয়ে গেছে। প্রায় দুই বছর ঘরবন্দি আমরা ভেবেছিলাম পৃথিবী থেকে বোধহয় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সবই বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ করোনা মহামারীর জীবাণু যা চোখে দেখা যায় না অথচ তার ভয়ে পুরো বিশ^সভ্যতা স্থির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু না, মানুষ প্রকৃতির সেই ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নেয়নি। কভিড বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। তারপর আবার ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সেই চিরচেনা চেহারা। আর আমাদের দেশেও রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষার খেলা।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে এখন ভীষণ উদ্বিগ্ন। রাজনৈতিক দলগুলোর হরতাল-অবরোধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর। অবরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও শিক্ষার্থী সেভাবে আসেনি। রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে চান না। এটিই স্বাভাবিক। জীবনের চেয়ে বড় তো শিক্ষা নয়। বাসের এক হেলপার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পথিমধ্যে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই।
হরতালের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। রাজধানীতে কোনো বিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। অনেক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিংবা পুনরাবৃত্তি হলে শিক্ষাসূচিতে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। ইংরেজি মাধ্যমের কোনো কোনো বিদ্যালয় সশরীরে ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। এ তো দুধের স্বাদ ঘোল দিয়ে মেটানোর চেষ্টামাত্র! কভিডকালীন অনলাইন ক্লাসের কথা আমরা ভুলে যাইনি। অবশ্য এ নিয়ে রাজনীতিবিদ কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ তাদের সন্তানদের এ দেশে পড়াশোনা করতে হয় না। তাদের এসব পড়াশোনার দরকারই বা কী? টাকা বানাতে হবে, বড় বড় ইমারত বানাতে হবে দেশে ও বিদেশে! এ দেশে যারা পড়াশোনা করে তো ছাপোষা কেরানি হবে! আর ওনারা সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ।
শিক্ষাবর্ষের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে শিক্ষাপঞ্জী। কিন্তু পরীক্ষা পদ্ধতির দোলাচল এখনো ঠিক হয়নি। বার্ষিক মূল্যায়ন হবে কীভাবে সেটি স্কুল, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। প্রতি বছর সব কিছু জানা থাকে, জানা বিষয়ও অনেক প্ল্যান-পরিকল্পনা করতে হয়। অথচ এবার বিশেষ করে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে চালু হওয়া নতুন কারিকুলামের মূল্যায়ন শিক্ষক বোঝেন না, স্কুল বোঝে না, অভিভাবকরা বোঝেন না আর শিক্ষার্থীরা তো নয়ই। শেষ বেলা একটু একটু করে নির্দেশনা আসে মাউশি থেকে যা জটিলতায় ভরা। বহু বছরের প্র্যাকটিস করা বিষয় নিয়েই থাকে বহু ধরনের অস্পষ্টতা, আর পরীক্ষার আগে আগে কিছু জটিল নিয়মকানুন পাঠিয়ে বিষয়টিকে আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। আর এ বিষয়ে এখন চিন্তা করার কথা যাদের, তারা এখন ব্যস্ত হরতাল-অবরোধে ধরপাকড় নিয়ে।
বলা হচ্ছে সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে। কিন্তু সেটি কী ও কীভাবে কেউই স্পষ্ট বুঝতে পারছে না। যাদের বোঝানোর কথা সম্ভবত তারাও স্পষ্ট নয়, কারণ ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কোনো বিদ্যালয় লিখিত পরীক্ষা নিতে পারেনি। কিছু কিছু বিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা নেওয়া শুরু করলেও মাউশির কড়া হুঁশিয়ারি পেয়ে তা বন্ধ করে দিয়েছে। ২ নভেম্বর থেকে সামষ্টিক মূল্যায়ন হওয়ার কথা, সেটি রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে এখন ৯ নভেম্বর হওয়ার কথা দেখলাম পত্রিকায়। সেটিও হবে কিনা নিশ্চিত নয়। সামষ্টিক মূল্যায়ন বলতে কি এ পর্যন্ত যতগুলো এবং যেভাবে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হয়েছে, সেগুলো গড় ও ফাইনাল সিদ্ধান্ত? সেটি যদি হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ সামষ্টিক মূল্যায়ন দ্বারা কী বোঝাচ্ছেন সেটি স্পষ্ট করতে হবে সংশ্লিষ্টদের কাছে। সবশেষে দেখলাম সাতটি পারদর্শিতার সূচক দিয়ে শিক্ষার্থীদের রিপোর্ট কার্ড বানাতে হবে। সেটি বছরের এই আখেরি সময়ে কেন? কে কার জবাব দেবে?
সাধারণত অন্যান্য বছর বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা হতো ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক পরীক্ষা ও মূল্যায়ন নভেম্বর মাসেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা বিভাগ। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যক্রম ৫ নভেম্বর শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। আবার ৮ নভেম্বর পর্যন্ত মাধ্যমিকে ‘মাস্টার ট্রেইনার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলবে। তাই ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন শুরু হবে ৯ নভেম্বর থেকে। অষ্টম ও নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাও হবে নভেম্বর মাসে। বার্ষিক পরীক্ষাগুলো বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হয়ে থাকে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নাকি সবকিছু শেষ করতে হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক সবার মনেই তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, আতঙ্ক আর হতাশা।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ক্ষতির প্রভাব এখনো আছে। এখন রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সেই ক্ষতির প্রভাবে নতুন মাত্রা আসতে পারে। আমরা আসলে কাদের জন্য রাজনীতি করছি? উত্তর হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য। দেশের সেই ভবিষ্যৎ অর্থাৎ আজকে যারা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী তারা কী দেখছে? রাজনীতির নামে লাঠি হাতে মানুষকে মারা যায়, গন্ডগোল করা যায়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আমরা যদি আদর্শ কিছু দেখাতে না পারি, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কী? তারা যা দেখবে তাই তো শিখবে। তাদের আমরা কী দেখাচ্ছি আর কী শেখাচ্ছি? তাদের সামনে আমরা কী উদাহরণ রেখে যাচ্ছি? এই প্রশ্নগুলো নিজেদের করা উচিত।
সাধারণ মানুষ সেই কবে থেকে রাজনীতি ও রাজনৈতিকদের হাতে বন্দি। এরশাদ আমলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, সেখানে পুলিশ হল ঘেরাও করত। পুলিশের অত্যাচারে ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্রষ্টার কাছে প্রার্থন করত কবে তারা সেই বিভীষিকা থেকে মুক্তি পাবে। দেশ কি আবারও সেই পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে? রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভিকটিম হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সর্বত্রই একই অবস্থা। কে দেখবে এসব? সাধারণ মানুষের যেহেতু কিছু করার নেই, তাই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু লিখে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে অবস্থা তাতে আগামী ছয় মাস বন্ধ থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। ক্যাম্পাসে গেলে মনে হয়, কর্তৃপক্ষের কারোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। স্বাধীনতার প্রশ্নে না-ই গেলাম। আমাদের ক্যাম্পাসে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য থাকে পড়াশোনা করা, গবেষণা করা এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চর্চা করা। সেখানে আমরা নির্দিষ্ট দলের পক্ষে তাৎক্ষণিক সাড়া না দিলে ক্যাম্পাসে থাকার সুযোগ নেই। অমুক ভাইয়ের জন্মদিনের মিছিলে না গেলে মাইর খেতে হয়। তমুক ভাই আসছে, রাজপথ কাঁপছে না বললেও ক্যাম্পাসে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ দেশের উদীয়মান তরুণদের দেখলে মনে হয় জীবনে খাওয়া-দাওয়া ঘুম আর রাজনীতি ছাড়া কোনো কাজ নেই। নেই কোনো স্বপ্ন, কীভাবে নিজেকে নিয়ে ভাবা যায়, পরিবার নিয়ে ভাবা যায় এসব তাদের চিন্তায় নেই।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘এক দল ক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছে, আরেক দল ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছে। কিন্তু জনগণ কী চাচ্ছে তা কেউ ভাবছে না।’ অনেকে এর চেয়েও অনেক কঠিন ও হতাশার কথা লিখেছেন। আসলে সবই কিন্তু দেশের সাধারণ নাগরিকদের মনের কথার প্রতিফলন। কিন্তু তাদের মনের কথার মূল্য দেওয়ার মতো রাজনীতি তো এ দেশে নেই! রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনীতিতে যেমন ধস নামে ঠিক তেমনি বিঘ্নিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
masumbillah65@gmail.com