ভারত ও বাংলাদেশের নির্বাচনী উত্তাপ

ভারত ও বাংলাদেশ উপমহাদেশের সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্বের দুটি দেশ। উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক কারোরই তেমন ভালো নয়। বিশেষ করে বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতের। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য যে নেতৃত্ব ভারতের কাছ থেকে আশা করা গিয়েছিল তা ভারত পেড়েছে কিনা সে প্রশ্ন সবার।

নতুন বছরের আগমনী সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ এই দুটি দেশের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে দেশে উত্তেজনা চরম আকারে পৌঁছেছে। হাজার হাজার বিরোধী দলের নেতাকর্মী কারাগারে বন্দি। দলটির প্রধান নেতৃত্বের প্রায় সবাই কারাগারে। তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা হচ্ছে সন্ত্রাসের, সন্ত্রাসে উসকানি ও ইন্ধনের অভিযোগ। ২০১৩-১৪ সালে ওই একই ধরনের অভিযোগই উত্থাপিত হয়েছিল এবং এক ধরনের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশ শাসিত হচ্ছে।

তবে এটা ঠিক যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৃশ্যমান এবং নানান তথ্য তা প্রমাণও করে। কিন্তু সামাজিক অবস্থান খুবই সংকটময়। রাজনৈতিক আন্দোলনের নামের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে একসময় ক্রসফায়ারের সাংস্কৃতি চালু হয়েছিল তা আপাতত বন্ধ মনে হচ্ছে। সেটাও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতায় যে মানুষ নিহত হচ্ছে, হত্যার শিকার হচ্ছে, তা বন্ধ করার উপায় কী? আগামী বছর কী আবার এক ধরনের একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছে কিনা সেটিও আমাদের কাছে এখন অনেক বড় প্রশ্ন।

এর পাশাপাশি ভারতের পাঁচটি রাজ্যে এই মাসেই বিধানসভার নির্বাচন। রাজ্যগুলো হলো রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম। জাতিসত্তার সংকটের ফলে মিজোরাম আসন থেকে একটি ছোট্ট রাজ্যের রূপান্তরিত হয়েছে, যার জনসংখ্যা ১১ অথবা ১২ লাখ। এই পাঁচটি রাজ্যের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট রাজ্য মিজোরামের জনসংখ্যা মাত্র ১১ লাখ।

পাঁচটি রাজ্যের বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপির নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এর দুটি রাজ্য সরাসরি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে অপর দুটি আঞ্চলিক দল নিয়ন্ত্রিত। বৃহত্তর রাজ্য মধ্যপ্রদেশে সরকারের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে খানিকটা সেই কেনাবেচার রাজনীতির মাধ্যমে। কংগ্রেসের সদস্যদের একাংশ বিজেপির পক্ষ অবলম্বন করেছে। এই রাজ্যগুলোর মোট লোকসভার আসন সংখ্যা ৮৩, যা ভারতের লোকসভার ৫৪৩টির মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশের কিছু বেশি। ভারতে বর্তমানে মোট ২৮টি রাজ্য ও আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।

এই পাঁচটি রাজ্যের জনসংখ্যা আর লোকসভার আসন সংখ্যা কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আগামী নির্বাচনের পরেই বোঝা যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশ, যেখানে লোকসভার আসন সংখ্যা ৮৫, যা যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে বিজেপি শাসন করছে। ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলো কেন্দ্রের রাজনীতি থেকে একেবারেই আলাদা। সেখানে শাসকদল বিজেপি আর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তেমন কোনো অবস্থানে নেই। আঞ্চলিক দলগুলোই সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে বহুকাল যাবৎ।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইন্ডিয়া নামক যে বিরোধীদলীয় প্ল্যাটফরমটি তৈরি হয়েছে কংগ্রেসসহ অপরাপর আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে। তারা সবাই নিজ নিজ রাজ্যে পরস্পরবিরোধী। সাম্প্রতিককালে সিপিএমের একটি সংবাদ সম্মেলনে তাদের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম আর দলটির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্য পরস্পরবিরোধী ছিল। শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ অর্থনৈতিক দুর্নীতির স্বজনপ্রীতির বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধী দল পার্লামেন্টে প্রায়ই সোচ্চার হন। রাফায়েল বিমান ক্রয় করাকে নিয়ে এর আগে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছানোর পরে সরকারি দল বিজেপি একটা ক্লিন চিট পায় সুপ্রিম কোর্ট সেখানে কোনো দুর্নীতি খুঁজে পায়নি। আমাদের দেশের মতোই আদালতের নির্দেশে দুর্নীতির অভিযোগ তার কার্যকারিতা হারায়। যেমনটি আমাদের দেশেও বেশ কয়েকবার ঘটেছে।

ভারত ও বাংলাদেশ দুটি দেশের আসন্ন নির্বাচনে কি পরিবর্তন আসবে? বর্তমান সরকার শাসনে থাকবেন কী নতুন সরকার আসবে সেই লক্ষ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের নির্বাচন নিয়ে গত তিন দশক যাবৎ উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখতে পাই। কিন্তু ভারতের পরিস্থিতি তেমন উত্তপ্ত না, যদিও বিরোধীদের সরকারবিরোধী প্রবল কর্মসূচি রয়েছে, আবার সরকার কর্তৃক বিরোধীদের দমনের তৎপরতাও তীব্র। ভারতের নির্বাচনী রাজনীতি সামাজিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। তবে কোনো কোনো রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবাংলা ও বিহার এগিয়ে আছে।

ভারতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাস্তার আন্দোলনের শঙ্কা নেই বললেই চলে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু আগেই তাদের অনেক বিতর্কিত বিষয়ের নিষ্পত্তি তারা করেতে পেরেছে। নির্বাচন কমিশন দেশটিতে মোটামুটি একটি স্বাধীনসত্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ভারতের নির্বাচন কমিশনার তিনজনকে তাদের কাজ স্বাধীনভাবে করতে দেওয়ার জন্য যাবতীয় আইন তাদের পক্ষে আছে। ফলে নির্বাচন কমিশন নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক ভারতের কোনো রাজ্যে নেই কিংবা কেন্দ্রেও এ নিয়ে বিতর্ক নেই।

তবে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা যে একেবারেই পশ্চিমা বিশ্বের মতো মোটামুটি দুর্নীতিমুক্ত তা বলা যাবে না। একদিকে যেমন ভোটকেন্দ্র দখলের রাজনীতির বিষয়টি প্রায়ই আমরা দেখতে পাই, অন্যদিকে বেনামি লোকদের ভারতের রাজনৈতিক দলকে আর্থিক সহায়তা করতে পারার বিষয়টিও অনিয়মকে উৎসাহিত করে। দেশটিতে রাজনৈতিক দলকে আর্থিক সহায়তা দানকারীদের নিজস্ব আয়কর দাখিলনামা না থাকলেও চলে। দেশটির রাজনৈতিক দলের হিসাব-নিকাশ নির্বাচন কমিশনের কাছে দাখিল করতে হলেও সেই আয়ের উৎসে অর্থাৎ যে ব্যক্তিদের নাম থাকে তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য সন্ধান করা হয় না। ভারত-বাংলাদেশে উভয়ের দেশেই একই ব্যবস্থা। আর আমাদের দেশের তো কথাই নেই, দলগুলো আয়-ব্যয়ের কথিত হিসাব দিলেও দাতাদের আয়ের উৎস কতটা পরিষ্কার তা বোধগম্য নয়।

ভারত ও বাংলাদেশ, উভয় দেশের বর্তমান সরকারই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যবস্থাকেই জনগণের সমর্থনের প্রধান বিষয়ে রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু দেশ দুটির সামাজিক বিভাজনের তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের ধর্মীয় বিভাজনের মাত্রা এমনভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দেশটি নানানভাবেই বিভক্ত হয়ে পড়ছে। দেশটিতে সম্প্রদায়গত বিরোধ, সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছে। ভারত নিজেকে অর্থনৈতিক উন্নতি সূচকে চীনের সমকক্ষ হিসেবেই দাবি করছে ইদানীং। কিন্তু বাস্তবতা অনেক দূর। চীনের সমাজে গণতন্ত্র না থাকার কথা পশ্চিমা বিশ্ব বললেও চীনের জনগণের মধ্যে স্বাভাবিক সৌহার্দ টিকে থাকায় সামাজিক বিভাজন নেই বললেই চলে। বাংলাদেশেরও প্রায় একই অবস্থা। সে কারণে এই দুটি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় কেবল সমাজ উন্নয়নে কোনো সহায়তা করবে না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট