অসময়ে পায়রার পেটে ঘরদোর জমিজিরাত

‘উই যে দূরে কন্টিনিয়ার দেহা যায়, ওইহানে মোগো ঘর আছিলো। সব গেছে পায়রায়। একবার দুইবার নয়, চার চারবার গাঙ্গে ভাই¯সা গেছে সবকিছু। শীতকালে গাঙ একটু শীতল থাকলেও বর্ষাকালে পায়রার চোখ গরম হইয়া ওঠে। গত দুই দশকে দুই কানি জমি গেছে গাঙে। হেরপরও এই গাঙের পারেই আবার বসতি করছি, কহন জানি তাও ভাইঙ্গা লইয়া যায়।’

এভাবে নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন পায়রা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের ছোট বালিয়াতলী গ্রামের নুরু মিয়া বয়াতি।

শুধু নুরু মিয়া বয়াতিই নন। বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা পায়রা নদীর ভাঙনে জমিজমা-ঘরদোর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে শতাধিক পরিবার। কয়েক বছর ধরে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা সব সময়ই পায়রার ভাঙনের শিকার হচ্ছে এই ইউনিয়নের রাখাইনপাড়া, বড় বালিয়াতলী, ছোট বালিয়াতলী ও পালের বালিয়াতলী এলাকা। প্রতিনিয়ত ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে দুর্বিষহ হয়ে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানী ঢাকায়।

বরগুনার ছয় উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকা ও প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের ভয়াবহ চিত্র। ছয়টি উপজেলা থেকে গত দুই দশকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যার অধিকাংশই পাড়ি জমিয়েছে শহরে।

ভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি-জমিজিরাত হারিয়ে বীরেন হাওলাদার বাস করেন বরগুনা পৌর শহরের উপকণ্ঠে লাকুরতলা এলাকায়। দিনমজুরি করে চলে তার সংসার।

ভাঙনকবলিতরা জানান, ২০০৭ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই এলাকার বেড়িবাঁধ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সম্প্রতি নতুন করে দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটছে এলাকাবাসীর। কয়েক দফায় বসতভিটা পরিবর্তন করেও নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না তারা। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে মাছের ঘের ও ফসলি জমি। নষ্ট হচ্ছে কৃষকদের উৎপাদিত বিভিন্ন সবজি। এ অবস্থায় নদীভাঙনের কারণে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে সংশ্লিষ্ট তিনটি গ্রামের কয়েকশ পরিবার।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ছয় উপজেলার ২২টি পোল্ডারে রয়েছে ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। যার মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধের ওই অংশগুলো এখন রয়েছে নদীতে বিলীনের ঝুঁকিতে। এ ছাড়া উচ্চ জলোচ্ছ্বাস হলে বরগুনার অধিকাংশ বেড়িবাঁধই উপচে প্লাবিত হয়ে ভাঙনের শঙ্কায় আছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. নুরুল আমিন বলেন, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয় দখলের ফলে জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে কারণেই নদীভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, বরগুনার নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তার জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলমান। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে কিছুটা হলেও জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।