বিদায়বেলায় জোটে না প্রাপ্য সম্মান

অনেক ঢাকঢোল পিটিয়েই একজন কোচকে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সংবাদ সম্মেলনে সেই কোচ শোনান অযুত আশার বাণী। কিন্তু সেই কোচ যখন বিদায় নেন, তখন প্রাপ্য সম্মানটা জোটে না বেশিরভাগ সময়। এভাবে চললে আগামীতে ভালো কোনো কোচ বাংলাদেশে চাকরি করতে আসার আগে কয়েকবার ভাববেন, এমনটাই মনে করেন কোচিং পেশার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকা নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

আজ পুনেতে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হচ্ছে বাংলাদেশের ২০২৩ বিশ্বকাপ অধ্যায়। যে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে বাংলাদেশ পেয়েছিল অভাবিত সাফল্য, যে বিশ্বকাপকে ঘিরে বুনন হয়েছিল অনেক স্বপ্নের; সেই বিশ্বকাপ পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নযাত্রায়। ৮ ম্যাচের ৬টিতেই হার, এর ভেতর টানা ৬টি, যার মধ্যে নেদারল্যান্ডসের কাছে হারের লজ্জাও আছে। সবশেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে হারানো গেছে বটে, কিন্তু তাতে লেগে আছে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজকে ‘টাইমড আউট’ করার কালিমা, যার সমালোচনা করছেন বিশ্ব ক্রিকেটের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বরা। বাংলাদেশের এই বিশ্বকাপ অভিযানে প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য। এই শূন্য খাতা ফেলে রেখেই বিদায় নিচ্ছেন দলের সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন, যাদের বিদায়ী অভিজ্ঞতাটা বরাবরের মতোই সুখের হলো না।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম হাই-প্রোফাইল কোচ বলা যায় মহিন্দর অমরনাথকে। ১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফির জন্য ভারতের ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপজয়ী এই সাবেক ক্রিকেটারকে কোচ করে নিয়ে আসা। তখন উনি যেসব করেছিলেন, তার সঙ্গে এই সময়ের চন্ডিকা হাথুরুসিংহের দারুণ মিল! দলের ভেতর বিভাজন সৃষ্টি, সেই সময়কার অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু কোচের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আনেন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে, যার জের ধরে তার নেতৃত্ব যায়। আইসিসি ট্রফিতে কেনিয়ার কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ, তাতে করে জায়গা হয় না ১৯৯৬-এর বিশ্বকাপে। কেনিয়া থেকে সরাসরি ভারতে, অর্থাৎ দেশে ফিরে গিয়েছিলেন মহিন্দর, বাংলাদেশে আসার সৌজন্যটাও দেখাননি। চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অনেকে তাকে ফোন করেছেন, অন্যপাশ থেকে ঝরেছে বিরক্তি। বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশ অধ্যায়টা মনে করতেই চান না তিনি।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন গর্ডন গ্রিনিজ। বাংলাদেশ প্রথমবার বিশ্বকাপে সুযোগ পায় তার কোচিংয়েই, তাকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্বও দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলেছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচ। খেলার দিন দুপুরে, বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে চাকরি হারাতে হয়েছিল ক্যারিবিয় কিংবদন্তিকে। ২৪ বছর পর দৃশ্যপট খুব একটা পাল্টায়নি। যার হাত ধরে বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণটা ধারালো হয়েছিল, সেই অ্যালান ডোনাল্ড থাকছেন না বিশ্বকাপ শেষে। তার মেয়াদ বিশ্বকাপ পর্যন্তই ছিল। সাকিবের অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজকে ‘টাইমড আউট’ করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন ডোনাল্ড, এ জন্য তাকে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিবি। এসবের সঙ্গে অতীতের অনেক কিছু মিলিয়ে না থাকার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন ডোনাল্ড, বিসিবি চুক্তি বাড়াতে চাইলেও রাজি হননি সাবেক এই প্রোটিয়া পেসার। যাওয়ার আগে ডোনাল্ড যা বলেছেন, তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য মোটেও শুভ কিছু নয়, ‘এখানে আমাকে এমন কিছু নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে যা নিয়ে আমি বেশ লজ্জিত ছিলাম, যা খেলার সততাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। টিম মিটিংয়ে বেশ কয়েকজন ছিল যারা কিনা বলেছে, আমি শেষ হয়ে গেছি। হয়তো এটা বিশ্বকাপের পর হওয়ার কথা ছিল। কেউ একজন বলেছে, আমার শেষ করা দরকার, আমি জানি সেটা কে। আচ্ছা ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি, আমার পরিবারের কাছে।’

ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্স দায়িত্বে থাকার সময়েই ব্যাটিং উপদেষ্টা হিসেবে জেমি সিডনসকে ফিরিয়ে আনায় দায়িত্বে থাকতে চাননি প্রিন্স। তেমনি রাসেল ডমিঙ্গোকে কোচ হিসেবে চাকরিতে রেখেই তাকে বসিয়ে ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এস শ্রীরামকে ‘টেকনিক্যাল উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে এই বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও রাসেল ডমিঙ্গো বিদায় নেন ডিসেম্বরের শেষেই, চুক্তির মেয়াদ পূর্তির আগেই। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করায় তিন মাসের পূর্ণ বেতন দিতে হয় এই দক্ষিণ আফ্রিকানকে।

বিশ্বকাপ দিয়ে মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে স্পিন বোলিং কোচ রঙ্গনা হেরাথ, ফিল্ডিং কোচ শেন ম্যাকডারমটেরও। ভিডিও অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরনের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি দিনভিত্তিক, তিনিও বিশ্বকাপের পর আর কাজ করবেন না বাংলাদেশ দলের সঙ্গে। স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ নিক লিরও চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে বিশ্বকাপ দিয়ে। নিয়োগের সময় চুক্তি ছিল ৩ বছরের, ২০২০ সালের মার্চে নিয়োগ পেয়েছিলেন এই ইংরেজ। শুধুই বিশ্বকাপের জন্য ফের বাংলাদেশ দলে টেকনিক্যাল উপদেষ্টা হয়ে এসেছিলেন শ্রীরাম, বিশ্বকাপ শেষ মানে তার সঙ্গেও আপাতত ইতি।

প্রধান ও সহকারী (ব্যাটিং) কোচ বাদে সবগুলো পদেই শেষ হচ্ছে মেয়াদ। আসবে বদল। কিন্তু বিসিবির এমন আচরণে বাংলাদেশে কি ভালো কোচ আসবেন? বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ নারী দলকে এশিয়া কাপ জেতানো কোচ ফাহিম মনে করেন, বিসিবি ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারছে না, ‘যেসব দেশের কোচিং সংস্কৃতি উন্নত বা যাদের সাফল্য আছে, সেসব দেশ থেকে সামাজিক সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণেই অনেক কোচ বাংলাদেশে আসতে চাইবে না। তার ওপর এমন সব উদাহরণ সৃষ্টি করা হচ্ছে যা ভালো কোচদের নিরুৎসাহিত করবে। অ্যালান ডোনাল্ড যেসব কথা বলে গেল, সেসব তো নিশ্চয়ই অন্যদের কানেও যাবে। বিসিবিতে ভালো কর্মসংস্কৃতি ও পরিবেশ নেই, এই বিজ্ঞাপনটা তো ভবিষ্যতে যারা এখানে চাকরি করতে আসবে, তাদের প্রতি খুব ভালো কোনো বার্তা দেয় না। যেকোনো পেশাদারই যখন কোথাও কাজ করতে যায়, তার আগে সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। বিসিবি খুব ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারছে না।’

শুধু বিদেশের কোচরাই নন, বাংলাদেশের কোচরাও বিসিবির চাকরিতে আগ্রহী নন। নিক পোথাসকে নিয়োগ দেওয়ার আগে যে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল বিসিবি, তাতে সাড়া দেননি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্যতম সেরা কোচ সালাউদ্দিনের সঙ্গে জাতীয় দলের অনেকেই কাজ করেছেন, সফলও হয়েছেন। জাতীয় দলে সহকারী কোচের পদে আবেদন না করার ব্যপারে সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমার এখন যে বয়স, নিজে থেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা আমারও আছে কি না, জানি না।’

ডোনাল্ডের আগে পেস বোলিং কোচ পদে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ওটিস গিবসন। তিনি চেয়েছিলেন থাকতে, মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে পেসারদের সাফল্যে বাংলাদেশ জিতলেও বিসিবি তার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়নি। এবারে চলে যাচ্ছেন ডোনাল্ডও। সামনে আবার কাউকে আনা হবে, তিনিও স্বপ্ন দেখাবেন এবং একসময় বিদায় নেবেন। ফাহিম বললেন, ‘এই বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য একটা শিক্ষা। বিশ্বকাপের ছয়-সাত মাস আগে কোচ বদলে, অধিনায়ক বদলে যে কোনো লাভ হয় না, এটা সেই শিক্ষা। এই শিক্ষার জন্য চড়া মূল্য দিতে হলো।’

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে বিসিবিকেও এখন কোচ খুঁজে পেতে দিতে হবে চড়া মূল্য। মেয়াদের আগে চুক্তি বাতিল করলে জরিমানা, উচ্চ বেতন, অযাচিত সুযোগ-সুবিধা অনেক কিছু দিয়েই বিদেশি কোচদের আনতে হচ্ছে বিসিবিকে। যার অন্যতম প্রধান কারণ বিরূপ কর্মসংস্কৃতি।