বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর ২৯ শতাংশ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রোগীর ১৮ শতাংশ নন প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি ও ১১ শতাংশ প্রলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে আক্রান্ত।
চিকিৎসকরা জানান, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হলো রেটিনা, অর্থাৎ চোখের ভেতরের পর্দাসদৃশ অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এই ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি অন্ধত্বের প্রধান কারণ। তবে এটি প্রতিরোধযোগ্য।
গতকাল রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ডায়াবেটিস অ্যান্ড রেটিনা : বিজ্রিং দ্য গ্যাপ’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত সেমিনার যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি ও বাংলাদেশ ভেট্রিও-রেটিনা সোসাইটি।
সেমিনারের প্রধান অতিথি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ও চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পৃথিবীতে মানুষের অন্ধত্বের অন্যতম কারণ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। ডায়াবেটিসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে হার্ট, চোখ ও কিডনির। চোখের অন্যান্য অংশের চেয়ে রেটিনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।’
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরামর্শ দিয়ে বলেন, চক্ষু চিকিৎসকরা অবশ্যই রোগীদের প্রথমেই ফান্ডাস ফটোগ্রাফি পরীক্ষা করবেন। এর মাধ্যমেই রোগীর ডায়াবেটিসজনিত রোগ, বিশেষ করে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ম্যাকুলার অবক্ষয়, গ্লুকোমা এবং অকোলের রেটিনোপ্যাথি সম্পর্কে জানা যাবে।
সেমিনারে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বিশ^বিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম ও বাংলাদেশ ভিট্রিও-রেটিনা সোসাইটির কার্যকরী সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী একটি করে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সেমিনারে বলা হয়, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি রেটিনায় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে করে। ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে এই রক্তনালিগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তনালির ‘পেরিসাইট’ ভেঙে যায় এবং রক্তনালি থেকে রক্ত ও রক্তরস বের হয়। এই রক্তরস বের হয়ে রেটিনায় রক্তক্ষরণ তৈরি করে। প্রথম পর্যায়ে এই রক্তক্ষরণ রেটিনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরে এই রক্তক্ষরণ রেটিনার বাইরে চলে আসে। একসময় রেটিনার সামনের ভাগের জেলি-ভিট্রিয়াস অংশে প্রবাহিত হয় এবং তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এই ধাপ চলমান থাকলে একসময় রক্ত, রক্তনালি, ভঙ্গুর রেটিনা ও জেলি একত্র হয়ে ট্র্যাকশন ফোর্স তৈরি করে, যা ভঙ্গুর রেটিনাকে সম্পূর্ণ ছিঁড়ে ফেলে।
চিকিৎসকরা জানান, ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত প্রতি বছর রেটিনা পরীক্ষা প্রয়োজন। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, রক্তের চর্বির পরিমাণ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, ওষুধ সেবন, দুশ্চিন্তা ও বিষন্নতা থেকে দূরে থাকা, ধূমপান ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি মেনে চলা উচিত।
সেমিনারে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বাড়ছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ১০৩ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১৬১ মিলিয়নে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ৭৭ শতাংশ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আক্রান্ত হয় টাইপ-১ ডায়াবেটিসে এবং ২৫ শতাংশ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আক্রান্ত হয় টাইপ-২ ডায়াবেটিসে। ২৫-৩০ শতাংশ দৃষ্টিহীন হয় ডায়াবেটিক ম্যাকুলার এডেমায়।