বিশ্বকাপের সেরা ১০

অতিমানব ম্যাক্সওয়েল

কদিন আগেই বিশ্বকাপের দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান হন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু চমকের বাকি ছিল আরও। আসরের ৩৯তম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ২৯২ রানের লক্ষ্য দেয় আফগানিস্তান। ওই লক্ষ্য তাড়ায় নেমে ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখতে থাকে অস্ট্রেলিয়া। তখন ম্যাক্সওয়েল বনে যান অতিমানব। চিত্রনাট্যে রসদ জোগানোর জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে যোগ হয় ক্র্যাম্প। এতসব সয়েও প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে করেন অসাধারণ ডাবল। ২১ চার ও ১০ ছক্কায় ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রানের অবিস্মরণীয় ইনিংসের সুবাদে ৩ উইকেটের জয় নিয়ে সেমি নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়া। ২০২ রানের অটুট জুটি গড়া সঙ্গী অজি দলপতি প্যাট কামিন্সের কাছ থেকে পান ‘ইতিহাসের সেরা ওয়ানডে ইনিংস’-এর তকমা।

টাইমড আউট বিতর্ক

এবারের বিশ্বকাপে পৃথিবী সাক্ষী হয় অবাক এক কীর্তির। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ১৪৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইমড আউট হওয়ার ঘটনা ঘটে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নেওয়ার জটিল সমীকরণ সামনে রেখে দিল্লিতে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের শুরু থেকেই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সঙ্গে খেলা এগোতে থাকে। ২৫তম ওভারে সাদিরা সামারাবিক্রমা আউট হলে কিছুটা সময় নিয়েই মাঠে আসেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। গার্ড নেওয়ার আগমুহূর্তে ছিঁড়ে যায় তার হেলমেটের স্ট্র্যাপ। তাতে দেরি হয় আরও। সাকিব আল হাসান আম্পায়ারের কাছে আবেদন করলে আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টাইমড আউট হন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। বিশ্বজুড়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলাপে তোলপাড় তোলে এ ঘটনাটি।

ভারতে তাসমান উত্তেজনা

তাসমান সাগরপাড়ের প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড মুখোমুখি হয় বিশ্বকাপের ২৭তম ম্যাচে। ফিরে আসে ২০১৫ বিশ্বকাপ ফাইনালের আমেজ। বিশ্ববাসী সাক্ষী হয় বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি রান হওয়া ম্যাচের। দুই দল মিলে এদিন করেন ৭৭১ রান। বিশ্বকাপ ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। ভেঙে যায় আসরের শুরুতে প্রোটিয়া-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে করা ৭৫৪ রানের রেকর্ড। এই ম্যাচে আগে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়া ট্রাভিস হেডের সেঞ্চুরিতে জড়ো করে ৩৮৮ রান। জবাব দিতে নেমে রাচিন রবীন্দ্রর সেঞ্চুরিতে ৯ উইকেটে ৩৮৩ রানে থামে কিউইদের ইনিংস। শেষ ওভারের নাটকীয় উত্থান-পতনের ম্যাচে মাত্র ৫ রানে হার মেনে নিতে হয় নিউজিল্যান্ডের। দুদল মিলে এদিন ৯৭টি চারের সঙ্গে ছক্কা হাঁকান ৩১টি।

শিখর থেকে খাদে

২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে আসর থেকে বিদায় নেওয়ার পর আধুনিক ক্রিকেটটাকেই বদলে দিয়েছিল ইংল্যান্ড। শুধু গত আসরের চ্যাম্পিয়নই নয়, গত বছর অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপাও নিয়ে এসেছিলেন জস বাটলাররা। ক্রিকেট বিশ্বকে বাজবলের সঙ্গে পরিচয় করানো, ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৯৮ রান করা দলটার নামও ইংল্যান্ড। এত পরিশ্রমে চড়া জনপ্রিয়তার শিখর থেকে খাদে নামতে ইংল্যান্ডের সময় লাগে মাত্র এক মাস। প্রথম সাত ম্যাচের ছয়টিতেই হেরে নিশ্চিত হয়ে যায় সেরা চারে থাকার সম্ভাবনা। শেষ দুই ম্যাচে জয় তাই প্রলেপ লাগাতে ব্যর্থ হয় হারে বিদগ্ধ ক্ষতে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ শেষ হয় টেবিলের সাতে থেকে।

আফগান ডাচদের অঘটন

ঠিকঠাক মতোই এগোচ্ছিল বিশ্বকাপ আসর। বাকি ছিল শুধু একটি অঘটনের। আসরের ত্রয়োদশ ম্যাচে এসে সেই চাহিদাও পূরণ হয়ে যায় ক্রিকেটপ্রেমীদের। সেরা স্পিন আক্রমণ নিয়ে বিশ্বকাপে এসে চাহিদামাফিক ঝলক দেখাতে পারছিল না আফগানিস্তান। রশিদ-মুজিব-নবিরা সেই ঘাটতিই পূরণ করেন এই ম্যাচে। আফগানদের ২৮৫ রানের মামুলি সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড মুখ থুবড়ে পড়ে। স্পিনত্রয়ীর ৮ উইকেট শিকারে অলআউট হয় তারা মাত্র ২১৫ রানে। আফগানদের হাতে নাস্তানাবুদ হয় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও। তার একদিন পরেই উড়তে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে মাটিতে নামিয়ে আনে নেদারল্যান্ডস। ডাচ মিডিয়ার দেওয়া খেতাব ‘দ্য মিরাকল অব ধর্মশালা’র ম্যাচে প্রোটিয়াদের ৩৮ রানে হারিয়ে দেয় নেদারল্যান্ডস।

শ্রীলঙ্কার আত্মসমর্পণ

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দিন পনের আগে ঘরের মাঠে এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের কাছে মাত্র ৫০ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার লজ্জা পায় শ্রীলঙ্কা। বিশ্বকাপ আসরে এবার সুযোগ ছিল ভারতের মাটিতে সেই অপমান ঘোচানোর। উল্টো লেগে থাকা কালিমায় আরও একপ্রস্থ প্রলেপ লাগিয়ে নেন লঙ্কানরা। ভারতের দেওয়া ৩৫৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সেই ম্যাচে মাত্র ৫৫ রানেই গুটিয়ে যায় শ্রীলঙ্কার ইনিংস। বাংলাদেশ মুক্তি পায় বিশ্বকাপে ৫৮ রানের সবচেয়ে ছোট ইনিংসের লজ্জাকর রেকর্ড থেকে। মোহাম্মদ শামি একাই নেন ৫টি উইকেট। সিরাজের ভাগে যায় ৩টি। বাকি দুটি পান বুমরাহ ও জাদেজা। ভারত ম্যাচ জেতে ৩০২ রানের বিশাল ব্যবধানে। প্রলম্বিত হয় লঙ্কানদের ভারত-জুজু।

শচিনের পাশে কোহলি

৫ নভেম্বর কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাঠে নামে ভারত। ভারতের ক্রিকেটভক্তদের জন্য দিনটি বিশেষ। কেননা এদিন জন্ম নিয়েছেন বিরাট কোহলি। বেঙ্গলের ক্রিকেট প্রশাসনও ঘটা করে আয়োজন করে দিনটি উদযাপনের। সব আয়োজন ছাপিয়ে নিজের ৩৫তম জন্মদিনে বিশ্ববাসীকে অনবদ্য এক সেঞ্চুরি উপহার দেন বিরাট কোহলি। ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের পর কোহলি কাঁধে করে নিয়ে ঘুরেছিলেন ছোটবেলার আদর্শ  শচিন টেন্ডুলকারকে। ৪৯তম সেঞ্চুরি করে এদিন শচিনের সঙ্গে এক কাতারে আসেন কোহলি। ২৭৭ ইনিংসে ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়ার দিনে বিরাটকে প্রশংসায় ভাসান ক্রিকেটভক্ত থেকে শুরু করে সব বরেণ্য ব্যক্তিরা।

রেকর্ড রান তাড়া

প্রোটিয়াদের সঙ্গে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৩২৬ রান করেও ১০২ রানের ব্যবধানে হারতে হয় লঙ্কানদের। পরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৪৪ রান করে তাই স্বভাবতই খুশিতে উদ্বেল হওয়ার কথা। তবে শ্রীলঙ্কার মুখের হাসি কেড়ে নেয় প্রতিপক্ষ। ৩৪৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় সফল হয়ে পাকিস্তানও গড়ে অনন্য রেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই স্থান পায় সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ড হিসেবে। ২০১১ আসরে ইংল্যান্ডের ৩২৮ রান তাড়া করে রেকর্ডটি দখলে ছিল আয়ারল্যান্ডের। শ্রীলঙ্কার কুশল মেন্ডিস ও সাদিরা সামরাবিক্রমার সেঞ্চুরির জবাবে পাকিস্তানের আবদুল্লাহ শফিক ও মোহাম্মদ রিজওয়ানও করেন সেঞ্চুরি। তাদের ১৭৬ রানের জুটিতে চড়ে হারতে বসা ম্যাচটা নিজেদের পক্ষে এনে এ রেকর্ড করে পাকিস্তান।

বিধ্বংসী ফখর

বিশ্বকাপের এই আসরে আবহাওয়ার চোখ রাঙানি একেবারে ছিল না বললেই চলে। শুধু একটি ম্যাচ ছাড়া। আসরের ৩৫তম সেই ম্যাচের আগে বেঙ্গালুরুর আবহাওয়া ছিল একদম গোমড়ামুখী। পূর্বাভাসেও বলা হয়েছিল শেষার্ধে নামতে পারে বরিষধারা। টস জিতে কিউইদের শুরুতে ব্যাটিংয়ে পাঠায় পাকিস্তান। তবে রাচিন রবীন্দ্রর সেঞ্চুরিতে ৪০১ রানের বিশাল পুঁজি দাঁড় করায় নিউজিল্যান্ড। বেঞ্চ গরম করা ফখর জামান এদিন একাদশে সুযোগ পেয়েই রুদ্ররূপ ধারণ করেন। ৬৩ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। ২৫.৩ ওভারে দ্বিতীয়বার বৃষ্টি হানা দেওয়ার আগে তার বিধ্বংসী ১২৬ রানের কল্যাণে ২০০ রান তোলে পাকিস্তান। ডার্কওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতির হিসাবে ২১ রানে এগিয়ে ছিল তারা। আর খেলা না হওয়ায় ফখরের একক বীরত্বে ম্যাচ জেতে পাকিস্তান।

প্রোটিয়াদের রান পাহাড়

বিশ্বকাপ আসর সবেমাত্র শুরু হয়েছে। দর্শকরা তখনো আড়মোড়া ভাঙা শেষ করেননি। তার আগেই ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দেন এইডেন মার্করাম। দিল্লিতে চতুর্থ ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকান এই প্রোটিয়া মাত্র ৪৯ বলে। একযুগ আগে গড়া কেভিন ও’ব্রায়েনের ৫০ বলে বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটি করে নেন নিজের। মার্করামের এই কীর্তির দিনে তার আগেই সেঞ্চুরি করেন কুইন্টন ডি কক ও রাসি ফন ডার ডুসেন। তাতে দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড ৫ উইকেটে ৪২৮ রান। ম্যাচটিও জিতে নেয় প্রোটিয়ারা ১০২ রানের বড় ব্যবধানে। ১৪টি বাউন্ডারি ও ৩টি ছক্কায় সাজানো মার্করামের ইনিংসটা ৫৪ বলে ১০৬ রানের।