জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে অপরিকল্পনা ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে স্থপতি শেখ আহসান উল্লাহ্ মজুমদারের বিরুদ্ধে।
গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউটে দেওয়া চিঠিতে এসব অভিযোগ তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি ছাত্র সংগঠন। পৃথকভাবে বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কাছে ওই চিঠি পাঠানো হয়।
এতে নতুন করে আরেকটি রেজিস্ট্রার ভবন নির্মাণকে অপ্রয়োজনীয়, বন উজাড় করে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভবন, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি ভবন, দেড়শতাধিক বাসা খালি থাকার পরেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন ৬টি আবাসিক ভবন নির্মাণসহ চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের একাধিক অসঙ্গতির বিষয়ে উল্লেখ করেন।
নির্মিতব্য ৬টি হলের মধ্যে চালু হওয়া দুটির নকশাগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, চলতি বছরে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে দুটি হল চালু হওয়ার পর থেকে একের পর এক সমস্যা লেগেই আছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ভেসে যায় দুটি হলেরই অনেক কক্ষ। পয়ঃনিষ্কাষণ পাইপ ফেটে হলের নিচতলা ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বারংবার হাইওয়ের পাশে হল নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করলেও তা মানা হয়নি। এখন শব্দদূষণের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মেয়েদের হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অত্যাধুনিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকল্পের প্রধান স্থপতি শেখ আহসান উল্লাহ্ মজুমদার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে অসংখ্যবার আমরা শুনেছি। অথচ এখন এই অপপরিকল্পনার দায় নিতে রাজি নন কেউই।
এতে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কোনো দায় নিতে রাজি নন নাসির উদ্দীন। সম্প্রতি তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে মন্তব্য করেছেন, ‘ভবনের নকশায় (ডিজাইন) ত্রুটির কারণে কক্ষে পানি ঢুকে থাকে। যারা এই ভবনের নকশা করেছেন, তারাই এটি ভালো বলতে পারবেন।’ তার এই বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এটি প্রমাণ হয় যে, নকশায় ত্রুটি ছিল। বিশেষজ্ঞ সংস্থার দল প্রধান শেখ আহসান উল্লাহ্ মজুমদার, যার নেতৃতাধীন দল নকশা প্রণয়নের জন্য নির্ধারিত ফির ০.২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬২ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছেন।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি ইমতিয়াজ অর্ণব, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি শরণ এহসান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী জাবি শাখার সংগঠক সোমা ডুমরী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জাবি শাখার সংগঠক সজীব আহমেদ, গণকৃষ্টির সংগঠক সাইফুল শামীম ও চলচ্চিত্র আন্দোলনের সংগঠক তাহসীন ইমতিয়াজ তৌসিফ।
এই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পানি প্রবাহ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেট, ডিশ ইত্যাদি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, রাস্তা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, চিত্তবিনোদন ও খেলাধূলার স্থান ব্যবস্থাপনা প্ল্যান, প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্ল্যান ইত্যাদি বিষয়সমূহ নতুনভাবে করা ‘রিভাইজড’ মহাপরিকল্পনায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হওয়া বাঞ্ছনীয় হলেও সেগুলো উপস্থাপিত হয়নি।
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, মাজহারুল ইসলামের মাস্টারপ্ল্যানটি ‘রিভাইজ’ করতে গিয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের টার্ম অব রেফারেন্সে (টিওআর) এবং মাস্টারপ্ল্যানের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ইওআই টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মতামত ব্যতীত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান বুঝে নেওয়ার জন্য টেকনিক্যাল মনিটরিং অ্যান্ড এভালুয়েশন কমিটি গঠন করা হয়নি। যথাযথ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণীত হয়নি। যেমন, জীববৈচিত্র্য, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, পরিবেশ সমীক্ষা, ভূ-উপরিভাগ ও ভূগর্ভস্থ পানি, বন্যা ইত্যাদি। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে কোনো থিমেটিক ম্যাপ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে লুকোছাপা করা হয়েছে এবং তাদের মতামতের তোয়াক্কা করা হয়নি।
এ ছাড়া স্থপতি শেখ আহসান উল্লাহ্ মজুমদার বাংলাদেশ স্থপতি ইনিস্টিটিউটের কোড অব এথিক্স অ্যান্ড প্রফেশনাল কন্ডাক্ট ২০১৮-এর প্রিন্সিপাল ৮.৩ লঙ্ঘন করেছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম, দুর্নীতি, গাছ কাটাসহ অন্যান্য অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে আইএবি’র কাছে চিঠির জবাব ও পরামর্শ চাওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক নবী নেওয়াজ খান বলেন, ‘আমরা চিঠিটি পেয়েছি, তবে আমাদের একটি প্রোগ্রাম এবং এজিএম থাকার কারণে বিষয়টিকে এখনো অ্যাড্রেস করতে পারিনি। আমরা এক্সিকিউটিভ কমিটি বিষয়টি নিয়ে বসবো, বসে এ বিষয়ে কি করণীয় সেই সিদ্ধান্ত নেব।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে শেখ আহসান উল্লাহ মজুমদার বলেন, ‘অভিযোগে আমার নাম কে দিয়েছে সেটার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তারা তো জানেই না যে কাজটা কে করেছে। ভালো খারাপ তো পরের কথা, কনসালট্যান্ট তো হচ্ছে বুয়েট। যদি কিছু বলতেই হয় তাহলে বুয়েটের সাথে কথা বলতে পারে। কতগুলো নিয়ম আছে এখানে। তারা বুয়েটকে বলবে, বুয়েট যদি মনে করে যে আমার সাথে কথা বলবে তাহলে বলতে পারে। এটা তো ইনভেস্টিগেট করার ব্যাপার আছে, আদৌ পরিবেশ নষ্ট হয়েছে কি না নাকি এমনিতে করেছে। এটা তো রিলেটিভ ব্যাপার, একজন বলে দিল আর হয়ে গেলো ব্যাপারটা তো এরকম না। আমি বুয়েটকে রিপ্রেজেন্ট করি, যদি বুয়েট বলে তাহলে আমি কথা বলতে পারি।’
তিনি আরো বলেন, এটাতো রিভাইজড মাস্টারপ্ল্যান। একটা তো মাস্টারপ্ল্যান ছিল, মাস্টারপ্ল্যান ঠিকমতো এক্সিকিউট হয়নি। এখন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির কিছু ডিমান্ড তৈরি হয়েছে, ডিমান্ডগুলো ফুলফিল করার জন্য কোথায় এগুলো করা যায় এটার জন্য আমাদের কাছে বলেছে। তখন আমরা বলেছি যে, আগের মাস্টারপ্ল্যানে যে জায়গাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে সেটাতো আমরা রিভাইভ করতে পারব না। এখন যে কন্ডিশনে আছে, ওই কন্ডিশনের রেস্পেক্টে কোন কোন জায়গা খালি আছে, সুইটেবল লোকেশনগুলো আইডেন্টিফাই করা এবং সেখানে কনস্ট্রাক্ট করা। ওটা আমরা দিয়েছি, এটা একটা প্রেসক্রিপশনের মতো। এখন কেউ যদি এটা না করে তাহলে কনসাল্টেন্সি ফার্মের তো কিছু বলার নাই।’