শিল্পীর নিষ্ঠা ও দায়

কবিতা ও কবিজীবনটা কখনোই অনুকরণযোগ্য নয়। কবিতা মূলত আত্মার মোহর; জীবনবীক্ষণ, অনুভবের প্রাণপ্রাচুর্য। সংগোপনে-ধ্যানে-রক্তকণিকায় সৎ কবি কবিতাকে যাপন করেন এ যাপন দেখার নয়। নিজেকে নিজের মধ্যে রেখে মগ্ন নির্মাণের শান্তিকে, আত্মযাপনকে লিখতে পারার ক্ষমতাই কবিত্ব। এ-ও এক আত্মদীক্ষা; নিজেকে দেখার এ-ও এক শৈল্পিক সংযম। লালন ফকির বলেছেন, ‘আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে/ দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে।’ সময়কে স্পর্শ করার স্থিরতা থেকে জন্ম হয় ‘আত্মতত্ত্ব’। আত্মতত্ত্বের অনুভব থাকলেই মানুষ ‘দিব্যজ্ঞানী’ হয়। ‘দিব্যজ্ঞান’ ছাড়া কেউ কবিতা যাপন করতে পারে না। রুমি, হাফিজ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্্দীন এরা সবাই ‘দিব্যজ্ঞানী’। ‘আত্মজ্ঞান’ পর্বের উপলব্ধিগুলোকেই প্রাতঃস্মরণীয় কবিরা কবিতার ‘দিব্যজ্ঞানে’ ছড়িয়ে দিয়েছেন।

ভাষা, ভূগোল, প্রকৃতি আলাদা হলেও মানবীয় স্বর, স্বভাব, গুণ ও বৈশিষ্ট্যে ‘মানুষ’ ও ‘মানবসমাজ’ ইউনিকরূপেই সামষ্টিক পৃথিবীতে বিচরণ করে। আত্মযাপনিক দীক্ষাতেই কবিদের বলার কথা, বলার ভাষা তৈরি হয়। সামাজিক শামিয়ানার তলা থেকে উঠে এলেও এই ভাষা গড়পড়তা নয়। কবিদের অন্তরতম রুচি ও অভিজ্ঞতাজাত এই ভাষা চিরমানবিক সংস্কৃতিরই প্রতিধ্বনি। কবির দেখার দৃষ্টি ও পথকে অনুধাবন করতে হলে পাঠককেও খুব সন্তর্পণে কবি মানসতার সৌন্দর্যমন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। দেখার দৃষ্টিতে, বলার পারঙ্গমতায় অভিন্ন মানবসত্তাও ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়। অসহায় ও প্রশ্নাতুর পৃথিবীতে শান্তির পরশ ও বিবেচনার চিহ্ন রাখে কবিতা। ভয়, অভিমান, অবমূল্যায়ন, ভুল বোঝাবুঝির তোয়াক্কা না করে ভবিষ্যতের তটে কবি আঁকতে থাকেন নিজের যাপিতনির্মাণ।

কবির একটা স্কুলিং থাকতে পারে, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অভিপ্রায়-অভিনিবেশ-মুগ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু কবিত্বের কোনো স্কুলিং হয় না। কারণ কবিত্বটা জন-মনোরঞ্জনের নয় কবিত্বটা সাধক ও সাধিতের অর্জন। একজন কবি অগ্রজ কিংবা সমসময়ের অনেকের দ্বারা প্রভাবিত ও প্রাণিত হতে পারেন। কিন্তু কতটুকু! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিদাসের কবিতার ভূগোল, জগৎ ও প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন কিন্তু নিজের কবিত্বের আঙিনায় তিনি অনন্য; নিখুঁত রাবীন্দ্রিক। ‘চৈতালি’ কাব্যের কথায় ধরুন যেখানে রবীন্দ্রনাথের মনোজগতে কালিদাসের প্রভাব সুস্পষ্ট। এই গ্রন্থের বেশ কিছু কবিতার শিরোনাম ও ভাবনাতেও কবি কালিদাসই উপস্থিত আছেন। বর্তমানের মনুষ্যত্বনাশী নাগরিক সভ্যতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে কবি কালিদাস নির্মিত প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও জীবনদীপ্তিতে প্রবেশ করতে চেয়েছেন। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’, ‘মেঘদূত’, ‘ঋতুসংহার’, ‘শকুন্তলা’, রবীন্দ্রনাথের কল্পনা ও ভাবাবেগকে নিশ্চিত প্রভাবিত করেছে। কাব্যের শিরোনাম, বিষয় ও প্রকৃতিকে গ্রহণ করার পরও রবীন্দ্রনাথ এখানে কালিদাসের কবিতায় তলিয়ে যাননি। সময়ের প্রাসঙ্গিকতায়, কবিত্বের ঔজ্জ্বল্যে, রবীন্দ্রনাথের কবিত্বের স্বরে আবির্ভূত হয়েছেন। অন্যের শিরোনাম এবং বিষয়কে স্পর্শ করার মধ্যে কোনো কবিত্ব নেই; প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নতুন স্বরে পরিবেশন করার প্রাচুর্যেই আছে রাবীন্দ্রিক নিরীক্ষণ ও কবিত্ব।

খ.

কে কবি? এই প্রশ্নের মীমাংসা করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন ‘সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী/ যার মনঃ কমলেতে পাতেন আসন/ অস্তগামী ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি/ ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ/ আনন্দ, আক্ষেপ, ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে/ অরণ্যে কুসুম ফুটে যার ইচ্ছা বলে/ নন্দনকানন হতে যে সুজন আনে/ পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে/ মরুভূমি তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে/ বহে জলবতী নদী মৃদু কালকলে!’ কবিত্বের এই নিস্তরঙ্গ শক্তিতে তার হাতেই রচিত হলো নতুন দিনের নতুন ‘রামায়ণ’। সময়ের এই রামায়ণের নাম ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। ভাষায়, ছন্দে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে, বিষয় ও চরিত্রবিন্যাসে এই কাব্যে প্রাচীনত্ব নেই, আছে চিরায়ত কাব্যের শাশ্বত সৌন্দর্য। এই কাব্য রচনায় বাল্মীকিকে তিনি অনুসরণ-অনুকরণ করেননি। রামায়ণের চরিত্র ও কাহিনির উৎসটুকু নিয়েছেন। রামায়ণের উৎসটুকুকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোয় সৃষ্টিশীল মহাকাব্যে রূপান্তর করেছেন। নতুন ভাষায়, নতুন ভাবনায়, ঐতিহ্যের নবায়নে জীবনের অন্তর্ঘাতে এই চোখ বাংলা কবিতাকে পাল্টে দিয়েছে। বর্তমানকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত এবং সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করতে হলে ঐতিহ্যের ক্রমবিকাশ ও বৈশিষ্ট্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে হয়। মাইকেল তাই করেছেন। একটা বিকশিত সময় ও সমাজের চিহ্ন বহন করছে তার কবিতা।

গ.

কবিকেও কবির আশ্রয়ে আশ্রমে যেতে হয়; নিতে হয় আশ্রম সাধুর ছায়া ও সংস্কৃতি। সাধুর সংস্কৃতি না-জেনে না-বুঝে আশ্রম নির্মাণ করা যায় না। কবিকে তাই অগ্রজকে বুঝতে হয় অগ্রজের মগ্ন নীরবতাগুলোকেও জানতে হয়। একজন ধীমান কবিকে অগ্রজকে অতিক্রম করতে হয়। প্রাচীনত্বের প্রভাবক থেকে মুক্তি নিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বিহারীলাল থেকে মুক্তি নিয়েছেন, লেটো দলের প্রভাব ও চুরুলিয়ার গ্রামসংস্কৃতি থেকে কবি নজরুল ইসলামও নতুনত্ব নিয়েই আবির্ভূত হয়েছেন। ভারতীয়-আরবিও সুর ও সংস্কৃতিকে সময়ের মাধুর্যতায়-নিজস্বতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। ‘মৈয়মনসিংহ গীতিকার’ উৎসপথে পরিভ্রমণ করে ‘বালুচর’, ‘রাখালি’, ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’, কাহিনিকাব্যে কবি জসীমউদ্্দীন যুক্ত করেছেন বাঙালিত্বের চিরায়ত সংস্কৃতি। এ সময়ের কবি বিজয় আহমেদও ‘আমি ইয়াসিন আমি বোরোধান’ কাব্যগ্রন্থে যমুনা পাড়ের কৃষকের সমাজ ও সংস্কৃতিকে কাহিনিকাব্যে লিখেছেন। জসীমউদ্্দীন যেমন ‘মৈয়মনসিংহ গীতিকা’কে অনুকরণ করেননি, বিজয়া আহমেদও জসীমউদ্্দীনকে অনুসরণ করেননি। দুজন কবিই বাংলা ও বাঙালিত্বের উত্তরাধিকার। উত্তরাধিকারকে বহন করাই প্রকৃত কবির কাজ।

ঘ.

একজন অগ্রজ লেখকের বিষয় ও দর্শনকে গ্রহণে, বিনির্মাণে শিল্পীর দায় ও সততা থাকা চাই। শিল্পীর দার্শনিকতাকে অন্ধ অনুকরণ করে, ভাবানুবাদ-পুনর্লিখন করে কোনো কবি কিংবা শিল্পী টিকে থাকতে পারেন না। সুরকার এ আর রহমানকে নিয়ে কথা হচ্ছে খুব। কথা নয়, নিন্দাই হচ্ছে। একটা ভুলকে প্রতিহত করার চিৎকারে দুই বাংলার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ফেসবুক থেকে মিডিয়া, মিডিয়া থেকে আমজনতা সবাই সংগীতজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। নিন্দাকে সমর্থন জানিয়ে নয়, স্বাভাবিক স্বরেই বলতে চাই পরিবর্তনই শিল্পের ধর্ম। কালান্তরকে ধারণ করে নতুন মিউজিসিয়ানও পাল্টে দিতে পারেন পুরনো রীতি। একটা গানের রীতিকে, চালকে, ইনস্ট্রুমেন্টকে বদলে দেওয়া যায়, কিন্তু শিল্পের দার্শনিকতাকে বদলে দেওয়া যায় না। কবি নজরুল ইসলামের এই গানটি রচনার একটা ইতিহাস ও দার্শনিকতা আছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসসহ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে লেখা ‘ভাঙার গান’ শিরোনামে কবিতাটি প্রকাশিত হয় ২০ জানুয়ারি ১৯২২ সালে। এ সময়ই তিনি এই গানটির সুর করেছেন। নিজেদের আত্মজাগরণে সে সময়ের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই গানটি প্রবল উদ্দীপনায় কারাগারে গেয়েছেন। গানটির সুর ও বক্তব্য রক্তের জোয়ার নিয়ে আসে। নজরুলকৃত এই সুরটিই বাঙালির রক্তে ও আত্মায় বসে গেছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গানটিও তো দুজন সুর করেছেন। কিন্তু বাঙালি আলতাফ মাহমুদের সুরটিকেই গ্রহণ করেছেন।