ড.আরিফ হাসান। বয়স পঞ্চাশ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডিন। তার লেখা ‘সংবিধান ও মানবাধিকার’ বই সারাদেশে পঠিত। সুপ্রিম কোর্টে তার মতামত সম্মানিত। সারা জীবন তিনি বিশ্বাস করেছেন, আইনের শাসনই সভ্যতার প্রথম সিঁড়ি। স্ত্রী সালমা আহমেদ স্কুলশিক্ষিকা। শান্ত ও ধার্মিক। একমাত্র মেয়ে তানিয়ার বয়স তেইশ বছর। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। ক্লাসে প্রথম। স্বপ্ন দেখে গরিব মানুষের জন্য ফ্রি ক্লিনিক খোলার। আরিফ হাসানের জীবন ছিল একটি সুসজ্জিত বইয়ের মতো। কিন্তু জীবনের পাতায় কখনো কখনো রক্তের দাগ পড়ে যায়।
২০২৫ সালের ১৫ মার্চ। বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট। তানিয়া ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে রিকশায় ওঠে। বাসায় ফেরার কথা। কিন্তু তানিয়া বাসায় পৌঁছায়নি। ফোন বন্ধ। রাত ৪টার দিকে আরিফ অস্থির হয়ে পুলিশে জিডি করতে যান। ডিউটি অফিসার উদাসীন। মেয়েরা কখনো কখনো বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যায়। কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
আরিফ সারারাত রাস্তায় খোঁজেন। হাসপাতালে ফোন করেন কিন্তু কোথাও কোনো খোঁজ পাননি।
তিন দিন পর। ১৮ মার্চ। রবিবার। সকাল ৭টা।
বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। মেয়ের লাশ। বয়স তেইশ বছর। পুলিশ আরিফকে ফোন করে। মর্গে পৌঁছে তিনি দেখেন তানিয়া। তার সোনার মেয়ে। একটি ঠাণ্ডা মৃতদেহ। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, একাধিক ব্যক্তির দ্বারা গণধর্ষণ। শরীরে ১৭টি ছুরিকাঘাত। মৃত্যুর কারণ রক্তক্ষরণ ও শ্বাসরোধ। আরিফ হাসান রিপোর্ট পড়তে পড়তে বমি করেন। স্ত্রী সালমা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তানিয়ার সহপাঠী লিজা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে, সোহেল চৌধুরী। ছাত্রলীগ নেতা। দুই বছর ধরে তানিয়া আপার পেছনে ছিল। তানিয়া আপা তার কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সোহেল হুমকি দিয়েছিল তুই আমার হবি, না হলে আর কারও হতে পারবি না। লিজা রাজি হয় পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিতে।
সোহেল চৌধুরী। বয়স ছাব্বিশ বছর। চাচা আজিজুর রহমান চৌধুরী একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। সোহেল চাচার ক্ষমতার ছায়ায় যা খুশি করেছে। ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় সোহেল তানিয়াকে অপহরণ করে। তার চারজন সহযোগী, শফিক, জাহিদ, রিপন, সুমন। তারা তানিয়ার ওপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। পাঁচজন মিলে ধর্ষণের সময় প্রতিরোধ করায় ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার পর মৃতদেহ নদীর ধারে ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশ সোহেল এবং তার চারজন সহযোগী ও ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে ২০ মার্চ। পরদিন হাইকোর্টের উকিলের সঙ্গে মন্ত্রী আজিজুর রহমান পুলিশ স্টেশনে আসেন। পনেরো মিনিট পর সোহেল ও তার সহযোগীরা জামিনে মুক্তি পায়। আরিফ রেগে বিস্ফোরিত হন। খুনের মামলায় জামিন? ওসি চোখ এড়িয়ে বলেন, স্যার আমার পরিবার আছে।
মামলা শুরু। প্রধান সাক্ষী লিজা আদালতে হাজির হয় না। তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। দুদিন পর লিজা আত্মহত্যা করে। পুলিশের রিপোর্ট বিষণœতা। রিকশাওয়ালা আব্দুর রহিম যে তানিয়াকে শেষবার দেখেছিল সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ট্রাক তাকে পিষে ফেলেছে। ড্রাইভার পালিয়ে যায়। একে একে সব সাক্ষী মুখ ফিরিয়ে নেয়, না হয় মারা যায়। ফরেনসিক প্রমাণ হারিয়ে যায়।
ছয় মাস মামলা চলে। চূড়ান্ত শুনানি। ১৫ সেপ্টেম্বর।
বিচারক রায় পড়েন, প্রমাণের অভাবে এবং যুক্তিসংগত কারণে আসামিপক্ষ খালাস পাচ্ছে। সোহেল হাসে। তার উকিল অভিনন্দন জানায়। আরিফ হাসান পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকেন। বুকের ভেতর মরে যায় আশা ও ন্যায়বিচারের বিশ্বাস। আদালতের বাইরে সোহেল আরিফের সামনে দাঁড়ায়। প্রফেসর সাহেব, আপনি তো বড় আইনবিদ। কিন্তু বুঝলেন না? এই দেশে আইন চলে না। চলে টাকা ও ক্ষমতা। আপনার মেয়ে খুব সুন্দরি ছিল। ভালোই লেগেছিল। সোহেল হেসে চলে যায়। সেদিন বাড়ি ফিরে আরিফ হাসান তার সব আইনের বই পুড়িয়ে ফেলেন। ‘সংবিধান ও মানবাধিকার’ বই আগুনে নিক্ষেপ করেন। সালমা কাঁদেন। আপনি কী করছেন? আরিফ শান্ত কণ্ঠে বলেন, যে আইন আমার মেয়ের খুনিদের শাস্তি দিতে পারে না, সেই আইনের কোনো মূল্য নেই।
পরবর্তী তিন মাসে আরিফ একটা প্রাইভেট ডিটেক্টিভ এজেন্সি তৈরি করেন। তার সব সঞ্চয় ৫০ লাখ টাকা। তিন মাসে ডিটেক্টিভরা সংগ্রহ করেন, সোহেল চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১২টি ধর্ষণের প্রমাণ। ৭টি হত্যার প্রমাণ (সাক্ষী ও ভিডিও) ও চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার রেকর্ড। আরিফ এই প্রমাণ পুলিশের কাছে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি জানেন পুলিশ কিছু করবে না। সোহেলের চাচা মন্ত্রী। টাকা ও ক্ষমতা আছে। তাই আরিফ সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই বিচারক হবেন। কিন্তু তিনি খুনি হতে চান না। তিনি চান জনসম্মুখে সোহেল ও তার দলবল তাদের অপরাধ স্বীকার করুক।
১৫ ডিসেম্বর। শুক্রবার। রাত ১১টা। সোহেল চৌধুরী গুলশানের নাইটক্লাব থেকে বের হয়, সঙ্গে তার চারজন সহযোগী । মাতাল। একটা ভ্যান এসে থামে। মুখে মাস্কধারী পাঁচজন লোক। গ্যাস ডার্ট। সোহেল এবং তার দলবল জ্ঞান হারায়। তাদের একটা পরিত্যক্ত গোডাউনে নিয়ে যাওয়া হয়। চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা হয়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে। সামনে একটা পর্দা। পর্দায় ভিডিও চলতে শুরু করে। তাদের সব অপরাধের ভিডিও। ১২টি ধর্ষণ। ৭টি হত্যা। শেষ ভিডিওতে তানিয়া। তানিয়ার ওপর অত্যাচারের নির্মম চিত্র। সোহেল চিৎকার করে, বন্ধ করো! কিন্তু ভিডিও চলতে থাকে। বারবার। একটানা ২৪ ঘণ্টা।
পরবর্তী সাত দিন সোহেল এবং তার দলবল বন্দি। খাবার ও পানি আছে কিন্তু ঘুম নেই। ২৪ ঘণ্টা পর্দায় তাদের অপরাধের ভিডিও বারবার চলছে। বারবার চিৎকার করছে। বারবার রক্তের খেলা দেখছে। সাইকোলজিক্যাল টর্চার। তৃতীয় দিন শফিক ভেঙে পড়ে। আমি স্বীকার করছি। আমি সব লিখে দেব। পঞ্চম দিন জাহিদ, রিপন, সুমন স্বীকার করে। সপ্তম দিন সোহেল এখনো ভাঙেনি। অন্ধকার থেকে আরিফের কণ্ঠ, তোমার মা। শাহানা চৌধুরী। প্রতিদিন সকালে পার্কে হাঁটতে যান। আমার কাছে অনেক মানুষ আছে। যাদের মেয়েদের তুমি ধর্ষণ করেছ। তারা তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়। সোহেল চিৎকার করে। না! না! আমি স্বীকার করছি! কাঁপা হাতে লিখে ফেলেন তাদের সব অপরাধ। ১২টি ধর্ষণ। ৭টি হত্যা। শেষে লেখেন, আমি সোহেল চৌধুরী স্বীকার করছি যে, আমি একজন অপরাধী। আমি আমার শাস্তি চাই।
সোহেল জেলে। কিন্তু আরিফ জানেন, এটা যথেষ্ট নয়। সোহেলকে রক্ষা করেছিল একটা পুরো সিস্টেম।
আরিফের পরবর্তী টার্গেট, ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হক। যিনি ২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সোহেলকে জামিন দিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরে ১৫টি ধর্ষণ মামলা খারিজ করেছেন। এক রাতে আরিফ তার ঘরে ঢোকেন। প্রমাণ দেখান। আগামীকাল দুদকের কাছে যান। আত্মসমর্পণ করুন। না হয় জীবনে আর অনুশোচনা করার সঠিক সময় পাবেন না। নাজমুল হক পরদিন দুদকের কাছে যান। সব স্বীকার করেন।
একইভাবে আরিফ টার্গেট করেন, ওসি হুমায়ূন কবির যিনি সোহেলকে রক্ষা করেছিলেন। উকিল সাইফুল ইসলাম যিনি টাকা নিয়ে অপরাধীদের বাঁচান। পুলিশ সুপার যিনি ক্রসফায়ার করে ৩২ জন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন। যারা আত্মসমর্পণ করে না, তাদের লাশ জনসম্মুখে পাওয়া যায়। গলায় সাইনবোর্ড, আমি বিচারহীনতার অংশীদার। আমি শাস্তি পেয়েছি। মিডিয়ায় বিচারক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। কেউ বলে খুনি। কেউ বলে নায়ক।
ডিআইজি রেজাউল করিম। সৎ পুলিশ অফিসার। বিচারক হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান।
সব ভিকটিম দেখে বুঝেন হত্যাকারী শুধু বিচার ব্যবস্থার অপরাধীদের মারছে। সব মামলা সোহেল চৌধুরীর মামলার সঙ্গে জড়িত। তানিয়ার বাবা ড. আরিফ হাসান। রেজাউল আরিফের বাড়িতে যান। কিন্তু আরিফ নেই। শুধু পাগল স্ত্রী সালমা। এক রাতে আরিফ রেজাউলকে শহীদ মিনারে ডাকেন। মুখোমুখি রেজাউল, আপনিই বিচারক? আরিফ বলল, হ্যাঁ। রেজাউল বলল, আইন হাতে তুলে নিয়ে আপনি অপরাধী হয়ে গেছেন। আরিফ বলল, যে দেশে ন্যায়বিচার নেই, সে দেশে অপরাধী কে আর নায়ক কে সেটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। আরিফ একটা ব্যাগ দেন। এতে আছে আরও অনেক অপরাধীর প্রমাণ। আপনি এগুলো ব্যবহার করুন। সিস্টেম পরিবর্তন করুন। তারপর আরিফ অন্ধকারে হাঁটতে শুরু করেন। রেজাউল চিৎকার করেন, দাঁড়ান! কিন্তু আরিফ ততক্ষণে অন্ধকারে মিলিয়ে যান।
দুই সপ্তাহ পর সব টিভি চ্যানেলে একসঙ্গে একটা ভিডিও চালানো হয়। আরিফ হাসান ক্যামেরার সামনে, আমার নাম ড. আরিফ হাসান। আমি একজন আইনবিদ ছিলাম। আইনে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু যখন আমার মেয়েকে হত্যা করা হলো, আইন আমাকে ন্যায়বিচার দিতে পারেনি। আমি গত তিন মাসে ১২ জন মানুষকে হত্যা করেছি। স্বীকার করছি। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই ছিল প্রমাণিত অপরাধী যারা বিচারব্যবস্থাকে কলুষিত করেছিল। আমি শাস্তি চাই। কিন্তু প্রশ্ন করি, আসল অপরাধী কে? যে তার মেয়ের খুনিকে শাস্তি দিয়েছে, নাকি যে কৌশলে খুনিকে রক্ষা করেছে? আমি চাই না আমার কাজকে ন্যায়বিচার মনে করা হোক। আমি চাই রাষ্ট্র জেগে উঠুক। বিচারব্যবস্থা সংস্কার হোক। আমার পরে আর কোনো পিতাকে যাতে বিচারক হতে না হয়। ন্যায়বিচার হোক, প্রয়োজনে আকাশ ভেঙে পড়ুক।
