চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই গতকাল ঘোষিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানিয়েছেন আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। দেশের ৪২ লাখ ভোটকেন্দ্রে ১১ কোটি ৯৭ লাখ ভোটার তাদের প্রার্থীকে নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট প্রদান করবেন। যদিও সব ভোটার যাবেন না ভোটকেন্দ্রে। নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার বক্তব্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সংলাপে (যদি হয়) মুখ্য আলোচনাই হবে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে মঙ্গলবার এফবিসিসিআইর আয়োজনে বিরাজমান বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ এবং এফবিসিসিআইর সাবেক নেতাদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে। অবশ্য এরকম ব্যবসায়িক ঝুঁকি, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আগেও তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ সংঘাত? সুষ্ঠু নির্বাচনই যদি মুখ্য হয়, তাহলে তো সংলাপের পথ এখনো খোলা! সংলাপের কথা গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি সব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অসংকোচ পরিহার করে জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আমরাও প্রত্যাশা করি, ভোটাররা নির্বিঘেœই তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের অর্থনীতিকে শঙ্কার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে যদি আমাদের অর্থনীতি অগ্রসর হতে থাকে, তাহলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ যে আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ বিষয়ে বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘ঝুঁকিতে ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশের সাপ্লাই চেইনকে ভীষণভাবে বিঘিœত করছে, যার প্রভাব পণ্যের উৎপাদন, বাজারমূল্য, রপ্তানি ও সেবা খাতের ওপরও পড়ছে। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সব ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পরিহারের আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি জানান, তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক ও কর্মচারীদের চাহিদা অনুযায়ী মজুরি কমিশন গঠন এবং শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। প্রকৃত শ্রমিকরা কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারে না। এ ছাড়া ডলার সংকট সমাধান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি। পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে। এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম অর্থনীতির এ সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক সহিংস কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের বিতর্কিত মন্তব্য থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে এফবিসিসিআইকে কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া বিদ্যমান সহিংস কর্মসূচির বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য এফবিসিসিআইকে আহ্বান জানান।
প্রশ্ন হচ্ছে, এমন আহ্বানে হরতাল-ধর্মঘটে অবিচল রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কি পাল্টাবে? এর ওপর গতকালের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের প্রত্যাশা প্রবল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে কোনো ব্যক্তি এবং দেশ বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না। ফলে বেশ দ্রুতই দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা। তখন আর বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় দেশবাসীকে। এটা কস্মিনকালেও কেউ আশা করে না যে, দেশ এমন একটি দুর্যোগের মধ্যে পড়ুক। তাই সময় থাকতেই সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের আন্তরিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। মনে রাখা দরকার, এই দেশ সবার। দেশের উন্নতি-অবনতির কোনো দলীয় পরিচয় নেই।