দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে তৃণমূল বিএনপি। দলটি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও হিসাব মেলাতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার কথা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানিয়েছে তারা। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আসন ভাগাভাগি করে ৩০০ প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে দলটির নেতাদের। এর আগে ১৮ নভেম্বর তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার ইসিতে আবেদন করে জানান, প্রগতিশীল ইসলামী জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটটির সব প্রার্থী তৃণমূল বিএনপির দলীয় প্রতীক সোনালি আঁশ নিয়ে অংশগ্রহণ করবে। এজন্য ইসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে দলটির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
সরেজমিন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আসা অধিকাংশই স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পেশার মানুষ। তাদের মধ্যে যেমন রয়েছেন আইনজীবী, মোটর শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা, তেমনি রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্রিডম পার্টির নেতাও। স্থায়ী ও সংশোধিত গঠনতন্ত্র দিতে না পারায় ২০০৯ সালে ফ্রিডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করেছিল ইসি।
তৃণমূল বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, গত শনি ও রবিবার দুদিনে দলটি ৭৮টি ফরম বিক্রি করেছে। ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ফরম বিক্রি চলবে। আগামী পঁচা দিনে গড়ে ৩৯টি করে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করতে পারলে, ১৮ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আট দিনে ৩১২টি ফরম বিক্রি হবে। প্রতিটি আসনে গড়ে তিনটি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হলে ১০৪টি আসনের জন্য প্রার্থী দিতে পারবে দলটি। প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া দলটি ফরমের মূল্য ধরেছে ৫ হাজার টাকা। পে-অর্ডার অথবা নগদ জমা দিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। ফলে গত দুদিনে ফরম বিক্রি বাবদ দলটির আয় হয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রথম দিন ১৮ নভেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত তৃণমূল বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১৩ জন প্রার্থী। আর গতকাল বিক্রি হয়েছে ৬৫টি।
দলটির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী জানান, মনোনয়ন বোর্ড ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আক্কাস আলী খান জানান, ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের ফরম বিক্রি করা হবে।
গতকাল রবিবার বিকেলে কথা হয় আনিসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফের বিপক্ষে কুষ্টিয়া-৩ আসনে নির্বাচন করতে চান। পেশায় ব্যবসা জানালেও এ প্রার্থী নিজেকে কুষ্টিয়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাও পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আত্মবিশ^াস নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনোনয়ন পেলে অবশ্যই জয়ী হয়ে আসব।’
কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান মো. বাদশা আলম। পেশায় ধান-চাল ব্যবসায়ী, আগেও নির্বাচন করেছেন। বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টির এক সময়কার এ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন আমার জন্য নতুন নয়। ফ্রিডম পার্টি থেকে নির্বাচন করেছি কিন্তু জয়ী হতে পারিনি। এবার মনোনয়ন পেলে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করব। তবে জয়ী হওয়া অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।’
আরেক প্রার্থী মো. অনিক রহমান মহিত। ঢাকায় তার ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা। কুষ্টিয়া-৪ আসন থেকে মনোনয়ন চান তিনি। শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা জানালেও ঠিক কোন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত সেটি পরিষ্কার করে বলতে পারেননি।
বাগেরহাট-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে ফরম কিনেছেন অ্যাডভোকেট মরিয়ম সুলতানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তনের জন্য নতুনদের এগিয়ে আসতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না হলেও সমাজসেবা করছি অনেক আগ থেকেই।’
গত ১৩ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করা প্রগতিশীল ইসলামী জোট নামের রাজনৈতিক মোর্চার সঙ্গে আসন ভাগাভাগি অনেকটাই চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। তৃণমূল বিএনপির সূত্র জানায়, ১৫ দলীয় এ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল। এ জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো হলো ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি, নেজামে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গণ আজাদী লীগ, বাংলাদেশ তরীকত ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক লীগ, বাংলাদেশ জনমত পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী জনতা দল (বিএনজেপি), ইসলামী লিবারেল পার্টি, জনতার কথা বলে, বাংলাদেশ স্বাধীন পার্টি, বাংলাদেশ গণতন্ত্র মানবিক পার্টি, সাধারণ ঐক্য আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামিক গণতান্ত্রিক লীগ ও বাংলাদেশ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক ফোরাম। তবে এ ১৫ দলের কোনোটির ইসিতে নিবন্ধন নেই। এ জোটের নেতারা অন্তত ৫০টি আসন দাবি করছেন।
এ ছাড়া তৃণমূল বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি গত ১৮ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘সেদিনও শুনেছি, তৈমূররা নাকি ইলেকশন করবে। আমি তো ইলেকশন করতে পারব। আমার গামছা নিয়া, আগের থাইকা যদি আমি প্রস্তুত হতাম তাইলে ৩০০ সিটের, ৩০০টাতেই নমিনেশন দিতাম। এখন হয়তো ৩০০ দিতে পারব না, আড়াইশটা তো পারব। না হলে দুইশ তো পারব। যদি এমন হয়, এই যে তৃণমূল বিএনপি, তাদের দুই-চাইরজন যদি আমার সঙ্গে আসে বা আমার লোক যদি যায়। আমি সেটাকেও মেনে নেব।’
তৃণমূল বিএনপির দপ্তর সূত্র বলছে, দলটির পক্ষ থেকে মনোনয়ন ফরম নেওয়াদের মধ্যে আলোচিত হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর ছেলে চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী গাজীপুর-১ আসনে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের আলোচিত রাজনীতিক প্রয়াত উকিল আবদুস সাত্তারের ছেলে মাইনুল হাসান তুষার। এর বাইরে উল্লেখ্যযোগ্য তেমন কেউ মনোনয়ন ফরম কেনেননি।
বিএনপির সাবেক নেতা নাজমুল হুদার তৃণমূল বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলটির প্রতীক ‘সোনালি আঁশ’।
তৈমূর আলম খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনোনয়ন ফরম বিতরণে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সাবেক সংসদ সদস্য, মেয়র, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তৃণমূল বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করছেন। নির্ধারিত সময়ের পর আমরা আরও বিস্তারিত বলতে পারব।’