এনআইডিই হবে টিআইএন

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা ছায়া বাজেট প্রস্তাব করেছে। বিকল্প এই বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় অভিসিক্ত আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরা হয়। এতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশের জনপ্রশাসন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে।

পাশাপাশি ইমাম মুয়াজ্জিন ভাতা, শিক্ষায় করছাড় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা রেখে জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) টিআইএন সার্টিফিকেট করার প্রস্তাব করেছে দলটি। একইসঙ্গে ঘাটতি বাজেট মেটাতে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কথাও বলেছে তারা।

রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দলটি। এতে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে মিলিয়ে অর্থবছর করার প্রস্তাব দেন।

জামায়াত আমিরের উপস্থিতিতে ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন দলের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বাজেট প্রস্তাবনায় এনআইডি হবে টিআইএন। করজাল সম্প্রসারণের জন্য আলাদা টিন নম্বরের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রকেই ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর প্রবর্তনের কথাও বলা হয়।

করমুক্ত আয়সীমা ও করছাড় বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করদাতাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বাবদ বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকা কর রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাইফুল আলম বলেন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা ৬৫০- ৯০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার টাকা এবং পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। দেশের সব মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সাইফুল আলম খান বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনাই হবে বাজেট ঘাটতি মেটানোর অন্যতম উপায়।

জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঞ্চালনায় এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার সভাপতি তাসমিয়া প্রধান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির মজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রমুখ।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের অর্থবছর  হচ্ছে জুলাই থেকে জুন। জুন মাস বর্ষা, খরা, দুর্যোগ, সাইক্লোন- এগুলায় সাধারণত আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়। আমরা লক্ষ্য করি, এডিপির একটা বিশাল অংশ শেষের দুই মাসে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নয়। এটি হচ্ছে গণলুটপাট। এর সুফল জনগণ পায় না। কিছু অসৎ সুবিধাভোগীদের পকেটের সুফল চলে যায়।’

ডা. শফিক বলেন, ‘আমরা সংসদে প্রস্তাব দেব, আমাদের ফিসকাল ইয়ারটি ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করা হবে। তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে না। এই টাকাগুলোর খবর পাওয়া যাবে ইনশা আল্লাহ।’

তিনি বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিকÑ সব জায়গায় নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একেবারেই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা কর্পোরেশন সবগুলোতে আজ সেই থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিভিন্নভাবে প্রমাণিত। এভাবে যদি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকে, তাহলে জাতির গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটি নিশ্চিত নয়। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা লাগবে। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে যে বাজেটই সরকার দিক, ওই বাজেট কার্যকর হবে না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক বাজেট বছর শেষ হওয়ার ন্যূনতম তিন মাস আগে সংসদে পেশ করতে হবে। কিন্তু সম্পূরক বাজেট পাওয়া যায় শেষ মাসে। এর মধ্যে বৈধ, অবৈধ, ন্যায্য, অন্যায্য সব খরচ হয়ে যায়। কালো-সাদা একাকার হয়ে যায়। তারপরে সম্পূরক বাজেট সংসদের সামনে এলে জনগণের লাভ হয় না।

দেশের কর আদায়ের পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ তিনটি কর দেয়। একটা ট্রেজারিতে জমা হয়; একটা যায় কিছু ব্যক্তির পকেটে; যারা কর আদায় করে, আরেকটা যায় চাঁদাবাজদের পকেটে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ, যার কারণে ট্রেজারির ট্যাক্স তার টার্নওভার ভলিউমের দিক থেকে ছোট হয়ে আসে। এখানে যদি সততা এবং স্বচ্ছতা মেনটেইন করা যায়, অটোমেটিক্যালি ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে আরও বেশি ট্যাক্স দেবেন।

জামায়াতের এই ছায়া বাজেটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে, টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে বাধ্য হয়েছে দলটি। সুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা (৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ) বরাদ্দের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

এই বাজেটে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা (৬ দশমকি ১৫ শতাংশ) এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা (৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ) এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা (৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ) বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য খাতের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা (৫ দশমিক ১৮ শতাংশ), অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা (৪ দশমিক ১০ শতাংশ), এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা (২ দশমিক ৯৭ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত