দুই ইমামকে রাজকীয় বিদায়

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান নামাজ। নামাজে সবাইকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন মসজিদের ইমাম। মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইমাম। ইমাম শব্দের অর্থ পথপ্রদর্শক, নেতা ও পরিচালক। ইমাম শুধু মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন বরং মুসলিম সমাজেরও নেতা তিনি। ইমামতি ছাড়াও মুসলমানদের যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।

দেশে প্রায় ৩ লাখ মসজিদ রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ ছাড়া বাকি মসজিদগুলো স্থানীয়ভাবে পরিচালিত হয়। মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে ইমাম-মোয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচও তারা মেটান। ফলে মসজিদে ইমাম-মোয়াজ্জিন কিংবা অন্যরা অবসরকালীন কোনো সুবিধা পান না। কিন্তু হালসময়ে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলের মসজিদ কর্র্তৃপক্ষ ইমাম-মোয়াজ্জিনদের নিজ উদ্যোগে নানাভাবে সম্মান ও বিদায় জানান। সম্প্রতি দেশের দুই জেলার দুজন ইমামকে রাজকীয় বিদায় দিয়েছে এলাকাবাসী।

পাবনায় কান্নাভেজা চোখে প্রিয় ইমামকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায়

পাবনায় দীর্ঘ ৫০ বছর ইমামতি করার পর ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয় বিদায় দেওয়া হয়েছে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ আবুল কাশেমকে। বিদায় বেলায় মসজিদের ইমামকে সম্মানিত করার এমন উদ্যোগের কারণে প্রশংসায় ভাসছেন এলাকাবাসী। জেলার সুজানগর উপজেলার তাঁতীবন্দ ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামে গত শুক্রবার বাদ জুমা ইমামের সম্মানে এ বিরল বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এলাকাবাসী জানান, সুজানগর উপজেলার তাঁতীবন্দ ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে দীর্ঘ ৫০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এই ৫০ বছরের মধ্যে তিনি গ্রামবাসীর সঙ্গে মিশে গেছেন। এখন তিনি বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। এ অবস্থায় তার বিদায় নিতে হচ্ছে। বিদায় বেদনার হলেও এলাকাবাসী তা কষ্টে মেনে নেন এবং তার সম্মানে আয়োজন করেন রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনার। বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইমামকে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার সামগ্রী। পরে তাকে ঘোড়ার গাড়ির বহরে করে রাজকীয় বিদায় দেওয়া হয়। এ সময় এলাকার মুরব্বিসহ সর্বস্তরের মানুষ কান্নাভেজা চোখে প্রিয় ইমামকে ঘোড়ার গাড়িতে করে তার বাড়ি স্কুলপাড়া পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসেন।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, খতিব হাফেজ আবুল কাশেম দীর্ঘ ৫০ বছর তাদের মসজিদে ইমামতি ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। তিনি আমাদের সবার সঙ্গে মিশে ছিলেন। গ্রামবাসী তার পরামর্শ নিয়ে কাজকর্ম করতেন। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবকের মতো। তাই তাকে বিদায় বেলায় এভাবে সম্মানিত করার চেষ্টা করেছি।

বিদায় বেলায় হাফেজ আবুল কাশেম জানান, জীবনের দীর্ঘ সময় যাদের ইমামতি করেছি তাদের এমন আয়োজনে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। বাকি জীবনে সবার কাছে তিনি দোয়া চান।

কুমিল্লায় পাঁচ লাখ টাকা হাদিয়া ও ফুলেল সংবর্ধনা

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মনোহরগঞ্জ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা হাজি আব্দুর রবকে অর্ধশত বছর ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালনের পর রাজকীয় বিদায় দেওয়া হয়। মাওলানা আব্দুর রব ২৫ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালে মনোহরগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে ইমামের দায়িত্ব নেন। ইমামতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি এক মসজিদে কাটিয়ে দেন ৪ যুগেরও বেশি সময়। ইমামতির পাশাপাশি তিনি মনোহরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের দৃষ্টান্ত। অসুস্থতা ও হজ পালন করার সময় ছাড়া তিনি কখনো অনুপস্থিত থাকেননি।

তার ছেলে মাওলানা সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমার বাবা হজের সফর ছাড়া জীবনে কোনোদিন শ্বশুরবাড়িতেও রাত কাটাননি এজন্য যে, মসজিদের নামাজ পড়ানো এবং স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হবে।’

তিনি একজন ভালো পরামর্শক ছিলেন, স্থানীয় লোকজন তাকে খুবই সম্মান করতেন এবং নানা বিষয়ে তার কাছে পরামর্শের জন্য যেতেন। দলমত নির্বিশেষে তিনি সবার কাছে একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ইমামের দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার সময়, মসজিদ পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় মুসল্লিরা তার সম্মানে আলোকোজ্জ্বল বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে। কয়েকদিন আগে থেকেই মসজিদ ও আশপাশের এলাকা রঙিন আলোয় সাজানো হয়, পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন রাস্তায় তোরণ নির্মাণ করা হয়। গত শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ানোর মাধ্যমে তিনি তার দায়িত্বের ইতি টানেন। নামাজের পর তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাজহারুল ইসলামসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য, বাজার পরিচালনা কমিটি এবং সর্বস্তরের মুসল্লিরা তার বিদায় অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ইমাম সাহেবকে ফুলেল সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। ইমাম মাওলানা আব্দুর রবকে মসজিদ কমিটি নগদ পাঁচ লাখ টাকা হাদিয়া দেন, এছাড়া নানা উপহার দেওয়া হয়। মাওলানা আব্দুর রবও আশপাশের ৩০টি মসজিদের ইমামদের জন্য উপহার পাঠান। বিদায় অনুষ্ঠান শেষে মাওলানা আব্দুর রবকে ঘোড়ার গাড়িতে করে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।