লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও চন্দ্রপৃষ্ঠ

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো ২৩ আগস্ট চন্দ্রযান ৩-এর মাধ্যমে চন্দ্র জয় করতে সক্ষম হয়। এ নিয়ে পৃথিবীময় হাজার গল্প শোনা যাচ্ছিল। আমাদের দেশে গল্পের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বিতর্কও। বিশেষত চন্দ্রাভিযানের গবেষক দলে ছিলেন ৯ জন নারীবিজ্ঞানী যা আমাদের দেশে এই মুহূর্তে কল্পনাও করা যায় না। নারী-সম্পর্কীয় বলে স্বাভাবিকভাবেই এটি হয়েছিল মুখরোচক, কখনো কখনো অবমূল্যায়নধর্মীও। আমরা সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। তবে এ থেকে কী শিখলাম এবং ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞানের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রেরিত ছবির সঙ্গে কীভাবে আমরা নিজেদের বাস্তবতার তুলনা করতে পারি, সেটা নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। মূল বাস্তবতা হলো অন্যের আলোয় আলোকিত দূর থেকে যা দেখতে সুন্দর, কাছে গেলে তাকে কুৎসিতও মনে হতে পারে। তেমনি রাষ্ট্রীয় ও মানুষের শারীরিক দুর্বলতা, রোগবালাই দূর থেকে বোঝা ভার।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় ধীরে ধীরে অনেক কুসংস্কার দূর হচ্ছে। চাঁদ সম্পর্কেও এক সময় গল্পদাদুর গালগল্প প্রচলিত ছিল, চাঁদে এক বুড়ি সুতো কাটছে, পরীরা দূর মহাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, আরও কত কী! কিন্তু সেই চাঁদে মানুষ পাঠিয়েও বুড়ির সন্ধান পাওয়া যায়নি। চাঁদে যে কলঙ্ক আছে সেটা তো পৃথিবীর মানুষ জানতই। এবার সেসব স্পষ্ট হলো। চাঁদের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখে এবং ৪০০ মিটার গভীর গর্ত অবলোকন করে মনে হলো চাঁদে কখনো লেভেল প্লেয়িং সম্ভব নয়। পৃথিবীর মানুষেরাও এ-রকম অসমান বাস্তবতায় বাস করে, সবাই লেভেল প্লেয়িংয়ের সুযোগ পায় না। লেভেল প্লেয়িং পদবাচ্যদ্বয় বিশেষভাবে প্রচলিত হয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এই দেশে নির্বাচনের বাকি আছে ২ মাস। কিন্তু সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে সেটি অর্থবহ এবং গ্রহণযোগ্য হবে না এটিই মূল বিতর্ক। যতগুলো আয়োজন, ব্যবস্থা ও সুযোগের সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে আইন ও সংবিধান দ্বারা, সে সবের মধ্যে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় নির্বাচনের প্রতি আগ্রহই বারবার সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেশে সে সবের সঙ্গে বাড়তি ঝামেলা হিসেবে যুক্ত হলো নির্বাচনকালের সরকারব্যবস্থা, যুক্ত হয়েছে পর্যবেক্ষকদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়ও। সেটির মূল কারণ পারস্পরিক অবিশ্বাস। এই যে লেভেল প্লেয়িংয়ের সমান সুযোগ-সুবিধা, সেটির সঙ্গে জড়িত কালো টাকার দৌরাত্ম্য, পেশিশক্তির ব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা আঞ্চলিকতার বিষবাষ্প, অনিয়ম... ইত্যাদি। মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রার্থীদের নির্বাচন-উত্তর মুখও চাঁদের সঙ্গে তুলনীয়, বিজয়ীর মুখ দূর থেকে দেখায় উজ্জ্বল, বিজিতের মুখ চন্দ্রযানের প্রযুক্তিতে কাছে থেকে দেখায় ম্লান।

চন্দ্রপৃষ্ঠটি বৈষম্যে ভরপুর, কোথাও ছোট গর্ত, কোথাও বড় বড়। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ল্যান্ডার রোভার দেখিয়েছিল সূর্যের আলো পড়ায় সেখানকার ১৪দিন কাটে আলোতে ও উষ্ণতায়, ১৪দিন অন্ধকারে প্রচণ্ড ঠান্ডায়। এ জন্য মাইনাস ১৮০ ডিগ্রিতে যখন কাটবে চাঁদের এই অংশটি, তখন ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞানকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার কথা চিন্তা করছিলেন ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। শীতপ্রধান দেশগুলোতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেলেও শীতকেই তাদের ভয়। শীত নিয়ে আসে কষ্টের বারতা। উত্তুরে বাতাসে পাতা ঝরার শব্দে কারও কারও বুকও কেঁপে ওঠে।

সামাজিক জীবনে মানুষের কষ্টের বড় কারণ বৈষম্য। সে বৈষম্য আমাদের দেশেও আছে। আমাদের আছে আয়-বৈষম্য, নারী-পুরুষ বৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য, নৃতাত্ত্বিক বৈষম্য, প্রযুক্তি ব্যবহারে সুযোগের বৈষম্য, সর্বাধিক শ্রেণি-বৈষম্য। ব্যাংক আমানতের হিসাবে কোটিপতি ও অতি ধনী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আর চরম বৈষম্যের শিকার নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। এই বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রী মুহাম্মদ আবদুল মান্নান স্বীকার করে এটিকে সত্যায়ন করেছেন।

এদেশে বৈষম্যের পাশাপাশি যে শব্দমালা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। যে আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে রাষ্ট্রটির সূচনাকাল থেকে, তাকে করা হয়েছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিচারক বলছেন তারা ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’। এই অবস্থায় আদালতের শৃঙ্খলা বজায় না থাকলে সেই দোষ কাকে দেওয়া যায়? বিচারের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংবিধানে ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার যে বিধান রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে ন্যূনতম উদ্যোগও বিগত ৫২ বছরে নেওয়া হয়নি। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লিখিত যে (১) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন (২) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের যে কোন কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন (৩) ন্যায়পাল তাহার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।

উক্ত অনুচ্ছেদে এত কথা বলার পরও যদি জাতির প্রত্যাশার প্রতীক এ পদটি সৃজন না করা হয়, তবে কি সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটিকে চাঁদের ৪০০ মিটার চওড়া গর্তটির সঙ্গে তুলনা করা চলে না, যেখানে আলো পড়ছে না? চাঁদের এই গর্তটি প্রাকৃতিক আবর্তন-বিবর্তনের ফলে ভরাট হবে কিনা জানি না, আমরা সংবিধানের গর্তযুক্ত ৭৭ অনুচ্ছেদটি ভরাট করতে চাই।

লেভেল প্লেয়িংয়ে আবার প্রত্যাবর্তন করি। চাঁদের কলঙ্কবৎ দাগ তো সামাজিক সংঘর্ষ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, অতি মাত্রায় রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনেও তৈরি করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সরকারব্যবস্থা আগে ছিল সেটি রহিত হয়েছে। কিন্তু এর রহিতকরণ প্রক্রিয়াটিও ছিল মহাকাশের গ্যাসীয় আস্তরণের মতো ধূম্রজাল সৃজনকারী। বেশ কিছু দেশি ও বিদেশি পত্রিকা-জার্নালের উদ্ধৃতি দিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টি খোলাসা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ২ জুন (২০১১) তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যারিস্টার রফিক-উল-হকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘আগামীতে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে এটি আপিল বিভাগের আদেশ, পর্যবেক্ষণ নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বেআইনি হলেও প্রয়োজন এটাকে আইনানুগ করেছে বলে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে... সরকার নিজেদের সুবিধার জন্য রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে পর্যবেক্ষণ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে... বলছেন আগের অংশ জাজমেন্ট, পরের অংশ জাজমেন্ট নয়... কেন এটা বলছেন বোধগম্য নয়... অবশ্য পলিটিক্স করতে গেলে অনেক কথাই বলতে হয়। নিজে বিশ্বাস না করলেও অনেক সময় বলতে হয়। (তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত রায় নিয়ে ‘বিভ্রান্তি’, দৈনিক প্রথম আলো, ২৩ আগস্ট ২০২৩)।’ 

বর্ণিতাবস্থায় আগামী নির্বাচন নিয়ে নাগরিক তথা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্পষ্টতা, অনিশ্চয়তা কাটছেই না। দেশবাসী ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্রুত এর অবসান চায়। সব ধরনের প্রভাবমুক্ত, পোলিং বুথ ‘ডাকাত’মুক্ত, পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে, পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রহরায় একটি সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণের প্রাণের দাবি। বিরোধীদের দাবি এজন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। এত এত উন্নয়ন কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে জনগণ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অনুকূলেই রায় দেবেন এ আত্মবিশ্বাস তাদের থাকা উচিত। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেবল নির্বাচনপূর্ব বিষয় নয়, নির্বাচন-উত্তরও। অবাধ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে যারা গণরায়ে নির্বাচিত হবেন, তারা যেন তাদের রোল প্লেয়িং বা পারফরম্যান্স যথাযথভাবে প্রদর্শন করতে পারেন, সে বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইনসভার বাইরে নামমাত্র মাঠ থাকলেও, এর অভ্যন্তরে নেই। কারণ সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোটদানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সংক্রান্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ৭০ অনুচ্ছেদের  বিধানটি নিম্নরূপ: কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না। 

কোনো প্রস্তাব, উদ্যোগ ও কার্যক্রমের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে উচ্চতর মর্যাদা লাভ করলেন বটে, কিন্তু সামান্য কিংবা অসামান্য মৌলিক অধিকারটি হারালেন। এটি কেন, কীভাবে ঘটল সেটি বোধগম্য নয়, এজন্য এটি স্ববিরোধী ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ৪র্থ সংশোধনী বিলটি সংসদে পাস হওয়ার সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় দলীয় সদস্য জেনারেল এমএজি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অধিবেশন বর্জন করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, সরকারি দলই শুধু ভুল করে না, বিরোধী দলও ভ্রান্তির চোরাবালিতে পা দিতে পারে। তখন কি সেই দলের কোনো সদস্য বিবেকের তাড়নায় তার দলের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া বা কথা বলার অধিকার রাখেন না? এমতাবস্থায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও যেন চন্দ্রপৃষ্ঠের একটি ক্ষতের মতো বিরাজ করছে। আমাদের জাতীয় জীবনে এমন অনেক ক্ষত রয়েছে যেগুলো সারাতে হবে। বিজ্ঞান যন্ত্রচালিত, তাই ভুল নেই। মানুষ মস্তিষ্কচালিত, সে জন্য ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি, বিচ্যুতির অবধি নেই। কিন্তু সেই বিচ্যুতির মাত্রা থাকা উচিত। বিবেকের প্রয়োগ হলে বিচ্যুতির মাত্রা হ্রাস পাবে, এটাই বড় বিজ্ঞান।

লেখক :  প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

golamshafique@yahoo.com