একটি ওয়ারেন্ট একটি মৃত্যু কয়েক হাত

(প্রথম কিস্তির পর)

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের ৩২৩ আর ৫০৬ ধারা (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের দণ্ডবিধির) দুটোই আপসযোগ্য করা আছে (১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ফৌজদারি কার্যবিধিতে), তবে সেটা মামলা শুরু হয়ে যাওয়ার পরে। স্বাধীন দেশে মামলা শুরুর আগেই আপসে মিটমাটের বন্দোবস্ত হবে হবে আওয়াজ শুনছি সেই কোন কাল থেকে। ডিজিটালের স্মার্ট-কালে এসে সোশ্যাল মিডিয়ায় মাতন দেখি সরকারি ‘লিগ্যাল এইড’ অফিসে (সব জেলা জজ আদালতেই আছে) আপসে মামলা মিটমাট চলছে বিস্তর। ভাবলাম, এই মামলাটা তাহলে ওয়ারেন্ট না পাঠিয়ে লিগ্যাল এইডে পাঠালেই তো পারতেন ম্যাজিস্ট্রেট বাহাদুর। খোঁজ নিয়ে দেখি, সরলমতি কেউ যদি মামলা ঠুকতে কোর্টে না গিয়ে বিবাদ মেটাতে যান লিগ্যাল এইডে তবেই শুধু মামলা শুরুর আগে মিটমাটের কাজে হাত দিতে পারে সেখানে, এমন বন্দোবস্ত হয়েছে ২০১৫ সালে। আর, উকিলের হাতে পড়ে মামলা ঠোকা সারা হয়ে গেলে আপসে মিটমাটে লিগ্যাল এইডে পাঠাবার হাত দিয়েছে কোর্টকে ২০১৭ সালে, তবে সেটা শুধুই দেওয়ানিতে, তাও আবার বিবাদীর জবাব দাখিলের পরে। ঝাল মেটাতে গরলমতি কেউ ফৌজদারি ঠুকে দিলে আর আপসে মিটমাটে লিগ্যাল এইডে পাঠাবার হাত দেয়নি কোর্টকে।

দেওয়ানির শোধ তুলতে বাঙালি যে ফৌজদারি ঠোকা ধরেছে সেই কবে থেকে, সেদিকেতে দৃষ্টি নেই আইন জারির দৃষ্টিমান কর্তাদের। আপসে মিটমাটে কোর্ট থেকে পাঠাবার ব্যবস্থাটা হওয়া উচিত আসলে, দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুটোতেই, মামলা ঠোকার সঙ্গে সঙ্গেই, অপরপক্ষকে ডাকাডাকিটা হবে মিটমাটকারীর কাছে গিয়ে। কোর্টের পরোয়ানার অপব্যবহারের সুযোগ না পেলে মিথ্যা মামলা লাগানো ছুটে যাবে। হেফাজতে মরে যাওয়া আমার সেই প্রাক্তন সহকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যে করে লাগানো মামলার সাজানো ঘটনাটাও ছিল তুচ্ছ একেবারে। তার গৃহকর্মী বলে নিজেকে দাবি করে এক নারী নালিশ ঠোকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গিয়ে। নালিশের মূল কথা হলো: ‘মাসে তিন হাজার টাকা বেতনে সে জানুয়ারিতে কাজে ঢোকে, মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ৫ মাসে তার বেতনের ছয় হাজার পাঁচশ টাকা মাত্র বকেয়া পড়ে। সেই বকেয়া সে মরিয়া হয়ে চাইতে যায় আগস্টের শেষদিকের এক রাতে, সঙ্গে আবার আরেক নারীকে নিয়ে। পরদিন সকালে আসতে বলায় তখনই নেওয়ার জেদ লাগালে তাদের জোর করে বের করতে আসামি কিল-চড়-লাথি মেরে গলাধাক্কা দেন, আসামির শ্যালক ছোরা দিয়ে সঙ্গিনীর উরুতে কাটা জখম করে, বাসায় আবার গেলে মেরে লাশ ঘুম করে ফেলবে বলে হুমকি দেয় শেষে। চিকিৎসা নেওয়ার পরে থানায় যাওয়া ধরে, থানা মামলা না নেওয়ায় আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করতে গিয়ে কোর্টে আসতে মাসখানেকের দেরি হয়েছে।’

সেই গৎবাঁধা নালিশ। স্থান-কাল-পাত্র শুধু ফিট করে হামেশাই চলে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে, উকিলের হাতে, আন্ধা কানুনকে ধোঁকা দিয়ে, অপরপক্ষকে জব্দ করার হাতিয়ার হিসেবে। হেফাজতে বেচারির মরে যাওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে, মামলার পুরোটাই ডাহা মিথ্যে, সে-মামলাকারীরাই এখন পড়েছে মিথ্যে মামলা করার দায়ে। নালিশটা ঠোকার আগেই তো সেটা ধরা পড়ার কথা ছিল উকিলের হাতে, বয়ান শুনে বাদিনীকে দুটো প্রশ্ন করলে আর চিকিৎসার কাগজটাতে চোখ বুলালে। দৃষ্টির না হয় বালাই নেই তাদের; তাই বলে, আয় আছে দায় নেই (সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের), শুধু চাই মোকদ্দমা, আন্ধা কানুনের যত ধারা মনে আসে সব লাগিয়ে মোকদ্দমা ঠুকে দেওয়ার হাত আছে নাকি আন্ধা কানুনে? মিথ্যে এ-মামলাটাই কাল হলো যে মানুষটার জীবনে!    

মিথ্যেটাও তো লাগানো হয়েছে কাঁচা হাতে। দেখাই যাচ্ছে মারপিটটুকুর কারণ ঘটিয়েছে বাদিনী নিজে রাতে গিয়ে জুলুম তুলে, সত্য কি না সে প্রশ্ন তো আছেই। বাকি থাকে পাওনাগণ্ডার ব্যাপারখানা, সেটারও সত্য-মিথ্যা দেখার আছে। মামলা আমলে নেওয়ার আগেই তো মিথ্যেটা ধরা পড়ার ছিল তীক্ষèদৃষ্টির ম্যাজিস্ট্রেটের [দৃষ্টিশক্তিহীন তো আগেই বাদ, ক্ষীণদৃষ্টিও হওয়ার নয় ম্যাজিস্ট্রেটের; রীতিমতো দৃষ্টিশক্তি মেপে নেওয়া হয় বিজেএস পরীক্ষাতে] চোখে, বয়ান শুনে বাদিনীকে এসব নিয়ে দুটো প্রশ্ন করলে আর চিকিৎসার কাগজটাতে চোখ বুলালে। সেটাই তো করতে বলা আছে আন্ধা-কানুনে। বলানো টিয়ার মতো করে নালিশকারীকে সাক্ষীর ডকে উঠিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করবে উকিলে, আর শুনে শুনে লিখবে ম্যাজিস্ট্রেটে! তাই আছে নাকি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের আইনে? সেখানে তো হুঁশ করেই লেখা আছে: সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়ার বেলায় “… examination of witness by the party …” (১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের এভিডেন্স অ্যাক্টের ১৩৫ ধারা), আর নালিশকারীর বক্তব্য নেওয়ার বেলায় “… Magistrate … shall at once examine … the complainant  … ” (১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের সিআরপিসির ২০০ ধারা)। কাজের বেলায় স্বাধীন দেশে দুটোই এক হয়ে যায় কী করে? স্বাধীন বিচার বিভাগের উকিল আর ম্যাজিস্ট্রেটের হুঁশ কি আছে তাতে?        

মামলাটার আদেশনামায় আমলে নেওয়ার পয়লা আদেশটা ছাপানো ছকে, শূন্যস্থানে আসামি দুজনের নাম আর ধারা দুটো ৩২৩/৫০৬ হাতে লিখে পূরণ করেছে পেশকারে। ‘অভিযোগের উপাদান থাকায় আমলে লওয়া হইল’ ছাপানোই আছে ছকে। ‘লওয়া হইল’ কী দেখে, কী বুঝে, তা লেখার মতো একটুকুও জায়গা নেই তাতে। ‘লওয়া গেল না, ডিসমিস করা হইল’ লেখার কোনো কায়দাই নেই তাতে। আসামি হিসেবে বাড়তি আর একজনেরও নাম লেখার, আর একখানা ধারাও বেশি লেখার স্থান নেই সে-ছকে। ‘সমন/ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হোক’ ছাপানোই আছে তাতে। চোখ বন্ধ করে সমনের ওপর টিকটা যে দুজনের কে দিয়েছে তা জানেন তারা দুজনে, হুজুরে আর পেশকারে। ‘জুডিশিয়াল মাইন্ড’ লাগানোর একটা কথাও লেখা নেই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে। জুডিশিয়াল অর্ডার হয় যন্ত্রের হাতে! আছে নাকি আন্ধা-কানুনে!

পরবর্তী তারিখটা রাখলেন সমন ফেরতের জন্য। সমন ফেরত আসেনি। বাদীও আসেনি, উকিলে চাইলেন সময়। দেওয়ার কথা, সময় আর সমন ফেরতের তাগিদ। তা না করে সময় দেওয়ার সঙ্গে এবার নিজে হাতে লিখে দিলেন আসামির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যুর আদেশ। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাখানা যে শেষে মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দেখা দিল আসামির সামনে! বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারে পুলিশের বাড়াবাড়ির অভিযোগের অন্ত নেই যেখানে, সেখানে কোর্টের পরোয়ানা পেলে যে খুশিতে আটখানা হয়ে অপব্যবহারে এমন কাণ্ড ঘটাবে সেদিকেও তো একটুখানি দৃষ্টি রাখতে হবে এখনকার দৃষ্টিমান ম্যাজিস্ট্রেটের! সমন ছেড়ে দেওয়ার পরে সেটা ফেরত আসার আগে ওয়ারেন্ট হাঁকাবার হাতও ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়েছে বটে, আন্ধা-কানুনে যে সেটা লাগাতে বলেছে আসামি ভেগে গেছে বা, আগের ছাড়া সমনে সাড়া দেবে না বলে কারণ দেখা গেলে (সিআরপিসির ৯০ ধারা)! কোনো কারণই না লিখে বিনা কারণে ওয়ারেন্ট দিলেন কোন খেয়ালে? আন্ধা-কানুনের কথাটা মানলে কি আর এ মৃত্যু পরোয়ানা উঠত হাতে! ধার্য তারিখে নিজে গিয়ে কোর্টে হাজির হবে বলে আসামি সিকিউরিটি দিলে আসামি ছেড়ে সিকিউরিটি হাতে করে গ্রেপ্তারকারীকে ফিরে আসার নির্দেশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপরেই লিখে দেওয়ার আরেকটা হাতও কোর্টকে দিয়েছে আন্ধা-কানুনে (সিআরপিসির ৭৬ ধারা)। ধারা দুটোই ছিল জামিনযোগ্য, সিকিউরিটি নিয়ে ফিরে আসার নির্দেশটা লেখার কথা তো এ-মামলারই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটাতে। সেটা লিখে দিতে আর হাত ওঠেনি ম্যাজিস্ট্রেট হুজুরের। ৩২৩/৫০৬ ধারার জামিনযোগ্য মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতে যদি তা না লেখেন তবে, হাতখানা দিয়েছে কি মার্ডার কেসে লিখতে? আন্ধা-কানুনের কথাটা মানলেও তো হেফাজতকাণ্ডটা ঘটে না!

একের পর এক এত সব কাণ্ডে কসুর কোথায় আন্ধা-কানুনের? দোষটা কোথায় ঔপনিবেশিক আইনের? ঘটেছে তো সব হৃদয়হীন জ্ঞানান্ধদের হাতে, আত্মম্ভরীদের সব ঔপনিবেশিক আচরণে। ঘটিয়েছে আইন-কানুনের কালো অক্ষরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেপরোয়ারা সবে। কানুনের কারবারে, আইনের কার্যসাধনে বাহ্যদৃষ্টির চেয়েও অন্তর্দৃষ্টির শক্তিটা বেশি লাগে। মানুষটার মৃত্যু ঘটে যাওয়ার পরে কোথায় শোধরাবে, তা না, শুরু করেছে আরেক কাণ্ড। কাণ্ড সব সারা হয়ে এলে এখন হাত লাগিয়েছে সেই মিথ্যে মামলাকারীদের ধরতে। এই ধরার কাজও চলেছে আইনকানুনের কালো অক্ষরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, নিজস্ব সেই স্টাইলে। সে আলাদা আরেক প্রস্থ হবে। স্টাইল চেঞ্জে কাজ হবে না তাতে। স্বাধীন দেশে স্বাধীন সবাই, পুলিশ স্বাধীন, উকিল স্বাধীন, বিচারক স্বাধীন, বিচার বিভাগ তো পুরোই স্বাধীন! ক্ষমতা হাতে আইন মেনে কি আর স্বাধীনতাসুখ উপভোগ করা যায়!  (সমাপ্ত)

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com