ভবিষ্যতের রাজনীতি অনিশ্চিত অর্থনীতি

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নীতি, স্বস্তি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক সুস্থতা ও সমৃদ্ধির জন্য জরুরি। আর এই স্থিতিশীলতার ভিত নির্মাণ, তাকে সুস্থ-সবল করতে বা রাখতে যত্ন ও প্রযত্ন প্রদানের দায়দায়িত্ব ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাইরের সবার। গণতন্ত্র যেমন, অর্থনীতিও তেমন সবার। প্রতিপক্ষতায়, পারস্পরিক দোষারোপে অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি সাধন কারোরই কাম্য নয়। মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর প্রত্যাশায় শিশু হাত-পা ছুড়ে দাবি জানাচ্ছে, সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তার এই চিৎকার ও হাত-পা দাবানিতে আশপাশে রাখা বা থাকা কাঁচের তৈজসপাত্র ভাঙার সুযোগ সৃষ্টি করে প্রকারান্তরে ওই শিশুকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে দুটি উদ্দেশ্য হাসিল হয়  এক. শিশুটির চরিত্র হরণ করে তাকে আরও দুর্বিনীত হতে দেওয়া ও পরিচয় সংকটে ফেলা; দুই. এই ভাঙচুরকে দেখিয়ে নিজেদের সার্বিক উন্নয়ন ব্যর্থতার দায় চাপানোর সুযোগ গ্রহণ। কর্তা বলতেই পারেন আমি ঘরকে জুতসই সাজাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই কাঁদুনে শিশুর জন্য পারলাম না। দেশভাগ পরিস্থিতিতে রচিত অন্নদাশংকর রায়ের সেই রাজনৈতিক ছড়াটির কথা মনে পড়ে গেল, ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ করো, তোমরা যেসব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো।’ বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে যতই করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের যুদ্ধ এবং দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গোলযোগ বিশৃঙ্খলার পরিবেশ উদ্ভূত বলে প্রচার পাক না কেন, বাংলাদেশের মতো অতি সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল অর্থনীতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হওয়া শুরু হয়েছে নানান কারণে, করোনার আগে থেকেই। এই মুহূর্তে যা দৃশ্যমান হচ্ছে তাতে প্রতীয়মান হয়, ভবিষ্যতের রাজনীতি অর্থনীতির অগ্রযাত্রাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে। অর্থনীতির অধোগতিকে সামাল দেওয়া দরকার। একটি অর্থনীতি সুস্থ, সবল ও গতিশীল থাকার সূচকগুলোর ব্যারোমিটার যেভাবে ওঠানামা করছে তা ক্রমে হিমাংকের দিকেই চলে যাচ্ছে। 

এনবিআর (রাজস্ব আহরণ), বাংলাদেশ ব্যাংক (অর্থবাজার তথা ব্যাংকিং সেক্টর), সিকিউরিটিস একচেঞ্জ কমিশন (পুঁজিবাজার), বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (দ্রব্যমূল্য তদারকি), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতো নিয়ন্ত্রক ও পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালালেও বল ও ব্যাটের সমন্বয় কেন হচ্ছে না? ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থবহ উন্নয়ন টেকসই হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উন্নয়ন ভাবনায় স্বার্থবাদী লুটেরা উপাদানের বাহুল্যতায়, বল্গাহীন দুর্নীতির অনুপ্রবেশে, জাতীয় চেতনাকে দলীয় চিন্তা ও স্বার্থবাদিতার নিগড়ে নিক্ষেপের কারণে, ‘যা কিছু হারায় কেষ্টা বেটাই চোর’ ধরনের আস্থাহীন পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ মিলছে। উন্নয়নকে মন্দ বিনিয়োগ সাব্যস্ত হওয়ায় বা করায় তাতে অর্থনীতিতে যে সক্ষমতা গড়ে ওঠার কথা তার হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। আয় বৈষম্য বৃদ্ধি এখন সবখানে বুমেরাং হিসেবে ফিরছে। কিছু দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিকভাবে অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সুদান, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক, কোনো দেশই সেটি চায় না। এসব দেশের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী চেহারা উন্মোচিত  হতে অনুঘটকের কাজ করেছে সুশাসনের অভাব, জবাবদিহির দৈন্যতা এবং দুর্নীতির সর্বগামিতা সেখানকার এবং এখানকারও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এখানে দুর্নীতিই এখন সব দুর্নীতির উৎস হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে।

এটা বিবেচনায় আনতে, মানতে ও স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশ ৫২ বছরে নানা রকম বাধা-বিপত্তি, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মোটামুটি একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নটা, এখানে বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির গ্রোথই বেশি প্রচার পাচ্ছে। বাকি যে সার্বিক উন্নয়ন, তা লাগসই ও টেকসই হওয়া সম্পর্কে এখনো অনেক প্রশ্ন আছে। এটা এমন নয় যে, এক বা দুই দশকের মধ্যে এগুলো অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। গত পাঁচ দশকে কখনো কম অর্জন, কখনো বেশি অর্জন এভাবে বাংলাদেশ এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জটা হলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখা এবং সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থায়ী, টেকসই উন্নয়নের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এখনো সেটা বলার সময় তো আসেনি। বরং কীভাবে এটাকে ভঙ্গুর করে অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার আভাস ইঙ্গিত মিলবে। স্বনির্ভর অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করে তোলার পরিবর্তে একে আমদানিনির্ভর করে তোলা হচ্ছে। 

কারও বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি প্রকারান্তরে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যক্রমে বিগত বেশ কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের আগে একই ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারের এবং বিরোধীদের মনোযোগটা বেশি বিচ্যুত হয়েছে। এটা সর্বজন বিদিত যে, রাজনৈতিক সংঘাত এবং সহিংসতায় সম্পদের ক্ষতি হয়। মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, পণ্য সরবরাহ এবং ব্যক্তি ও সামষ্টিক আয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ক্ষতি শেষমেশ সামাজিক সংহতি এবং অর্থনীতির সহনশীল শক্তিকে বিনষ্ট করে। ক্ষমতায়নে অন্তর্ভুক্তির চেতনা কার্যকর না থাকলে, জনগণকে বাদ দিয়ে, উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে ‘আমরাই সব দখল করব’ মনোভাবটি সঠিক নীতি নয়। সব নাগরিকের সমঅধিকার বণ্টনের বিষয় রয়েছে, সবাইর সমান অধিকার ও অবস্থান স্বীকার করা সাংবিধানিক দায়িত্ব। অর্থনীতি খারাপ হলে পক্ষ-বিপক্ষ সবার জীবনই অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।

সবাই ভয়ে ও আতঙ্কে ক্ষীণস্বরে হলেও বলছেন ভূরাজনীতি ও সিন্ডিকেট সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হতে হয় জাতীয় ঐকমত্যে, সংলাপে। সেখানে দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার আছে, স্বচ্ছতার ব্যাপার আছে, আছে পারস্পরিক অধিকারের ব্যাপার। এগুলো বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করার চিন্তা করা সমীচীন হবে না। মানতে হবে রাজনীতি যদি স্থিতিশীল না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটবে না। সমঝোতার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আনা বা আসা ছাড়া, কোনো অর্থনৈতিক কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদন করা যাবে না এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ততা ঠেকানো যাবে না। 

সবপক্ষের সব মনোযোগ যখন রাজনীতির দিকে, তখন গণমানুষের প্রতি কারও নজর থাকে না, তখন অসহায় মানুষ প্রতিকারের দাবিতে দাঁড়ানোর জায়গাও পায় না। মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক কষ্টে  রয়েছে। মূল্যস্ফীতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ছে না বরং আরও সংকুচিত হচ্ছে। নিজস্ব রেভিনিউ আর্নিং সক্ষমতা না বাড়িয়ে কঠিন শর্তের ধার-কর্জ করে বড় বড় ব্যয়ে উৎসাহ বোধের মতো আত্মঘাতী প্রবণতায় কোন দিকে যাবে সেটি ভাবতেও সবার মধ্যে ভয় ঢুকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামগ্রিক সংকটকে কতখানি নিচে নামিয়ে দিতে পারে, সেটি নিয়ে সবাই শঙ্কিত।

দেশ সমাজ ও রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা ও আস্থার জায়গা না থাকলে এবং আলোচনা-সমঝোতার সুযোগ ব্যর্থ হলেই অস্থির পরিস্থিতির অবতারণা হয়। রাজনৈতিক চর্চা যে মূল্যবোধের ভিত্তিতে করতে হয়, সেখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছু নেই। একটি দল ক্ষমতায় থাকবে, আরেকটি দল বিরোধী অবস্থানে থাকবে। সবার রাজনৈতিক চর্চাই হবে দেশের স্বার্থে কাজ করা। এটি ভুলে গেলেই দেশ কিছুদিন পরপর একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য নিপতিত হয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

এই মুহূর্তে এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, দিন দিন আর্থিক বৈষম্য বেড়েই চলছে। আর্থিক বৈষম্য মানে আয়ের বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য। এই যে আর্থিক বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য সাধারণ মানুষের বা যে কোনো মানুষের জীবনের ওপর নেতিবাচক সামাজিক প্রভাব ফেলছে। কারণ আয়ের সংস্থান যদি না থাকে এবং আয়ের বৈষম্য থাকে, তাহলে যতই সার্বিকভাবে সামষ্টিক উন্নতি হোক, বিষয়টার ফল কিন্তু সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে না। এখন জানতে হবে এর কারণ কী? মুখ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নীতির দুর্বলতা,  অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রক ও নিয়ামক প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবযুক্ত অদক্ষ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং সব জায়গায় সুশাসন অর্থাৎ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। নানারকম সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে,  উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন, প্রশাসনসহ অন্যান্য ব্যাপারেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যথেষ্ট অভাবের বিপরীতে প্রাইভেট সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও খুব ভালোভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় নেই। সেটার প্রতিফলন দেখা যায় বাজার অনিয়ন্ত্রিত। মূল্যস্ফীতি ঘটছে। লোকজনের আয়ের সংস্থান কমে যাচ্ছে দিন দিন। লোকজনের যে নানা রকম সমস্যা, সেগুলোর কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। এমন নয় যে, সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ কেউ জানে না যেখানে সদিচ্ছা, সচেতনতা ও সততার অভাব রয়েছে। রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়তো হবে না, তবে এসব থামানোর কাজ শুরু করতে হবে এই মুহূর্ত থেকে, যদি আমরা অর্থনীতিকে প্রকৃত উন্নয়ন অভিমুখী করতে চাই।