প্রখ্যাত সাংবাদিক, ছোটগল্পকার ও ঔপন্যাসিক ছিলেন তিনি। কিছুদিন অধ্যাপনাও করেছেন। ১৯৬৯ সালে দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে শুরু করেন সাংবাদিকতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান এই বরেণ্য সাংবাদিক ভূষিত হয়েছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারে। দৈনিক ইত্তেফাকে চতুরঙ্গ কলাম লিখতেন ‘সুহৃদ’ ছদ্মনামে। একুশে পদকে ভূষিত এই বরেণ্য সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ২০২০ সালের ২৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হচ্ছে তার লেখা উপসম্পাদকীয়
ইত্তেফাকের পৃষ্ঠায় শাহিমুদার কাহিনী পড়ে অনেকের মতো আমিও অভিভূত। হতাশা আর নৈরাশ্যের এই দেশে শাহিমুদা সত্যই আশাবাদ আর জীবন সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একটানা বারো বছর তার ওপর স্বামীর অত্যাচার-নির্যাতন চলেছে। গরুর মতো গলায় দড়ি দিয়ে গোয়ালঘরে বেঁধে রাখা হতো তাকে। শেষে পালিয়ে চলে এল বাপের বাড়ি। সেখানেও নানা গঞ্জনা। নানা রকম মানসিক নির্যাতন। তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই, ভাত-কাপড়ের সংস্থান নেই, সহায়-সম্বলহীন শাহিমুদা যায় কোথায়? জীবনের এই পর্যায়ে এসে তীব্র হতাশার শিকার হয়ে একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করে শাহিমুদা। পরে অবশ্য নিজের ভুল বুঝতে পারে। এরপর আর একবারও পিছু ফিরে তাকায়নি সে। যশোর শহরে আগে থেকেই ঝিয়ের কাজ করে, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করত। নতুনভাবে জীবন শুরু হয় ‘বাঁচতে শেখা’ নামক একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে। আমাদের ইত্তেফাকের ঝিনাইদহ সংবাদদাতা জানিয়েছেন, শাহিমুদা এখন মোটামুটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তার মাসিক রোজগার এখন ৫৪৬ টাকা। শাহিমুদার ছেলেমেয়েরা এখন খেতে-পরতে পারে। স্কুলে যায়।
শাহিমুদার সাফল্যের কাহিনি আমাদের অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই কারণেই যে, আমাদের দারিদ্র্য-উপদ্রুত সমাজে সাধারণত এমনটি দেখা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয় হয় হতাশার। গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হতাশা, নৈরাশ্য আর আকাক্সক্ষাহীনতা কতখানি প্রকট তার কোনো সংখ্যাতত্ত্ব হয়তো নেই। তবে ভাগ্যের হাতে প্রচন্ডভাবে মার খাওয়া মানুষের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কতখানি হতাশা আর নৈরাশ্যের তারা শিকার। ব্যতিক্রম দৃষ্টান্তের কথা বাদ দিলে, বেশির ভাগ মানুষই জীবনের লড়াইয়ে হার স্বীকার করে বসে আছে। এহেন সমাজে শাহিমুদারা অবশ্যই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। জীবনের হাতে প্রচন্ড মার খেয়েও তারা হার স্বীকার করে না। মার খেয়েও আবার উঠে দাঁড়াতে জানে। এরাই সমাজের প্রকৃত উদ্যমী মানুষ। সংগ্রামী মানুষ।
বেশ কয়েক মাস আগে চতুরঙ্গ কলামে সাফল্যের কাহিনী বর্ণনা করতে যেয়ে একজনের কথা লিখেছিলাম। প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। তখন তার বয়স উনিশ-কুড়ি। সংসারের লাথিঝাটা খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন কাউকে কিছু না বলে গৃহত্যাগ করেছিল। বছরের পর বছর যায় তার কোনো খোঁজখবর নেই। শেষে একদিন পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সে ফিরে এল গ্রামে। ততদিনে জীবন-সংগ্রামে সে জয়ী পুরুষ। বার্মা মুলুকে থেকে নিজের চেষ্টায় ভাগ্য ফেরাতে সমর্থ হয়েছে। গ্রামে ফিরে এসে জমি কিনল, বাড়ি তৈরি করল। যে সমাজ সংসার তাকে লাথিঝাটার বেশি কিছু কখনো উপহার দেয়নি, সেই সমাজেই সে পেয়ে গেল মর্যাদা। সাফল্য অর্জনের চেয়ে চমকপ্রদ কাহিনী আর কি হতে পারে? সে এখন সেই চমকপ্রদ কাহিনীর নায়ক।
আমাদের এই দরিদ্র দেশে প্রধানতঃ সম্পদের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণেই সমাজে উদ্যোগের অভাব প্রকট। বহুক্ষেত্রে জীবন যেন ছোট ছোট গর্ত, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার আকাক্সক্ষা নেই, নেই হতাশা ও নৈরাশ্য জয় করার আশাবাদ। প্রাচীনকাল থেকেই অবশ্য আমাদের সমাজে আশাবাদের ওপর চমকপ্রদ নানা ছড়া ও প্রবচন চালু আছে।
‘আশায় বাঁধে ঘর’, সংসার সমুদ্র মাঝে দুঃখ তরঙ্গের খেলা, আশা তার একমাত্র ভেলা এসব প্রবচন ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু স্বীকার করতেই হয়, ছড়া-প্রবচন চালু থাকা সত্ত্বেও সমাজে আশাবাদের প্রতিষ্ঠা হয়নি। কবি যতই বলেন, ‘ওরে বিহঙ্গ, বিহঙ্গ মোর, এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা’ কার্যক্ষেত্রে দেখতে পাই দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থাজুড়ে হতাশার কালো পানি আদিগন্ত থৈ থৈ করছে।
আশাবাদ একটা দৃষ্টিভঙ্গি। আশাবাদী মানুষ যে সর্বদাই জয়ী বা সফল মানুষ তা নাও হতে পারে। তবে আমাদের পক্ষে বলার মোক্ষম যুক্তি এটাই যে, আশাবাদ দুঃখ-দারিদ্র্য জয়ের সংগ্রামে মানুষকে অশেষ প্রেরণা যোগায়। দুঃখকে ভুলিয়ে রাখে। ক্ষুদ্রতা ও সঙ্কীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে রাখে। এও বলা যায় যে, মানুষের জন্য আশাবাদ একটা নির্ভরযোগ্য বর্ম। অনেক দুঃখ-দুর্ভোগ, অনেক পরাজয় এই বর্মের ওপর দিয়েই যায়। আশাবাদ নিয়ে হঠাৎ গরুর রচনা লেখার মতো প্যাঁচাল কেন? এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। আসলে শাহিমুদার কাহিনীই নতুনভাবে আশাবাদের কথা ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আশাবাদ একটা বায়বীয় ধারণাই বটে, তবে এটাও ঠিক আশাবাদের সঠিক ডোজ ছাড়া রাজনীতি একটা উদ্দেশ্যহীন ক্রিয়াকর্ম হয়ে দাঁড়ায়, অর্থনীতি একটা অবান্তর বিষয়ে পরিণত হয় আর সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি তা হয়ে দাঁড়ায় জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষের ছবির মতো। বলতেই হয়, রচনার মতো শোনালেও রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার প্রশ্নে আশাবাদের উচ্চারণ বাদ দিয়েও কিছু বলার উপায় নেই।
প্রশ্ন দাঁড়ায়, আশাবাদ তো ডাক্তারি সিরিঞ্জ দিয়ে লোকের মধ্যে ইনজেক্ট করার কোনো ব্যাপার নয়। তাহলে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থায় কীভাবে উপ্ত হবে এই আশাবাদ? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেই এমন যোগ্যতা আমার নেই। তবে এটুকু বলা যায়, সমাজে সুন্দর জীবনের সুযোগ-অবকাশ অবারিত করাই সমাজে আশাবাদ সঞ্চারের উপায়। সুন্দর থেকে সুন্দরতর জীবন, এক স্বাচ্ছন্দ্য থেকে ব্যাপকতর স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছার আকাক্সক্ষাই আশাবাদ। উন্নত দেশে এই আকাক্সক্ষাই মানুষকে বিপুল থেকে বিপুলতর শক্তি জুগিয়ে চলে। এরই নাম উন্নয়নের চাবিকাঠি।
বিষয়টি আর একটু প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করে দেখা যেতে পারে। আমাদের দেশে সমাজ-জীবনের পরতে পরতে হতাশা ও নৈরাশ্য যতই না কেন দানা বেঁধে থাকুক, স্বাধীনতার পর যে-ই জনশক্তি রপ্তানির একটা সুযোগ অবারিত হল, অমনি একদল উদ্যোগী লোক হতাশা ও নৈরাশ্য গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে এল এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। কয়েক লক্ষ লোক এই যাবৎ এই সুযোগ গ্রহণ করেছে এবং প্রতিবছর অন্যূন এক হাজার কোটি টাকা বাইরে থেকে নিয়মিত আসছে বাংলাদেশে। সীমিত পর্যায়ে এই সুযোগ এখনো অবারিত। উদ্যোগী লোকের জন্য এটা মস্ত বড় সুযোগ, বলতেই হয়। দেশের অর্থনীতির জন্যও এটা এক বিশাল আশীর্বাদ। তদ্দরুন সংশ্লিষ্ট পরিবারসমূহে হতাশা এবং নৈরাশ্য দূর হয়ে গেছে, এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সন্দেহ কি অর্থনীতির এই উদ্যোগ বহু লোককে নতুন আশায় সঞ্জীবিত করেছে, বহু লোকের জীবনে এনে দিয়েছে কিছু কিছু বাঞ্ছিত সাফল্য?
শাহিমুদার কথাই ধরা যাক। বিষপান করে একদা সে মরতে চেয়েছিল। পরে নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারে। আশাই তাকে দৈত্যের মতো শক্তি জুগিয়ে ছিল, তাতে আর সন্দেহ কী? রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় আশাবাদের প্রতিফলন ঘটলে দেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মশক্তিরও গুণগত পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়। অবশ্য প্রশ্ন সেখানে ‘টুু বি অর নট টু বি।’ চিরটাকাল ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ অবস্থা বজায় থাকলে কোনো ক্ষেত্রেই কোনো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়। সৎ সাহস, দৃঢ় ইচ্ছা, কর্মশক্তি এবং মানবপ্রেমই শুধু পারে অচলায়তনকে ভাঙতে।
লেখক: রাহাত খান সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫