বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরাজয়

দক্ষ, কার্যকর ও যোগ্য জনশক্তিকে সংগঠিত করার জন্য উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ১৯৯২ সালে যুগোপযোগী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করা হয়েছিল। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় অবদান রাখতে যথেষ্ট সক্ষম ছিল। ১৯৯৬ সালে সরকার অনুমোদিত প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের গ্র্যাজুয়েটরা পাস করার পরই তুলনামূলকভাবে ভালো বেতনে চাকরি পাওয়ায় এই আশঙ্কা অমূলক বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই।

বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই নাজুক। সেগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা, নেই মানসম্পন্ন শিক্ষক বা অবকাঠামো। আবার কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মেরও অভিযোগ রয়েছে। দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১২টি। এরপরও প্রতি বছরই নতুন নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিচ্ছে সরকার। অথচ অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ন্যূনতম মান নেই, শিক্ষকরাও মানহীন। ভাড়াবাড়িতে যত্রতত্রভাবে স্থাপিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা হলেও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানেন না, গবেষণা কী! এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে। প্রতিনিয়তই রুগ্্ণ থেকে রুগ্্ণতর হচ্ছে দেশের অর্ধেকের বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আমাদের বিস্মিত করে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘আয় কমায় মন নেই ট্রাস্টিদের’ শিরোনামের সংবাদে জানা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। কিন্তু বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। গবেষণা কী, তা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানেন না। নেই ল্যাবরেটরি, প্রয়োজনীয় ক্লাসরুম, সিনিয়র শিক্ষক, লাইব্রেরি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যে শিক্ষকরা এসে হাজিরা দিয়ে যান। আবার কিছু শিক্ষার্থী এলেও তাদের কোনো রকম একটা শিট ধরিয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু ওই একই শিক্ষক পরীক্ষা নেন, খাতা দেখেন, প্রশাসনিক কার্যক্রমও বলতে গেলে তাদের হাতে। ফলে শিক্ষার্থীরা কিছু লিখলেই ভালো জিপিএ নিয়ে পাস করছেন। কিন্তু এসব শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে গিয়ে বড় ধরনের বিপদে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকায় ওই সব শিক্ষার্থী কোনো ধরনের ব্যবসা বা কারিগরি কাজেও যুক্ত হচ্ছেন না। দেশে বাড়ছে শিক্ষিত বেকার। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আর ১০ লাখ টাকার নিচে ব্যয় করেছে ৪২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ৪২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছরে কোনো গবেষণা নিবন্ধ বের হয়নি।

এই যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেহারা, তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অবশ্যই দ্রুত চিন্তা করতে হবে। নিতে হবে জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বছরের পর বছর ধরে প্রায় অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও তা থেকে উত্তরণের কোনো চিন্তা ট্রাস্টিদের নেই। প্রতি বছরই নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারিতে শিক্ষার্থী কমছে। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়ায়, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছেন। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আয়ের সুযোগ দেখতে না পাওয়ায় মনোনিবেশ কমিয়ে দিয়েছেন। এতে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিন দিন টিউশন ফি কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এরপরও তারা শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এতে যেমন অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে না আবার বেতন কম হওয়ায় ভালো শিক্ষকরা সেখানে যাচ্ছেন না।

বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিণতি, অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। ‘শিক্ষা’কে যখন ‘পণ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেটিতে পচন ধরা স্বাভাবিক। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি যখন ব্যবসায়ী থাকেন, তখন তাদের কাছে শিক্ষা নয় ব্যবসাই মুখ্য হবে। হয়েছেও তাই। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ট্রাস্টি যখন দেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে অর্থ আয়ে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হচ্ছে না, তখন তারা এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এর পরিণতি কী হতে পারে? সিদ্ধান্ত কে নেবে! ইউজিসি না সরকার?