নিজস্ব ফুটবল স্টেডিয়াম না থাকা বড় আক্ষেপ

২০২০ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ডেভেলপমেন্ট কমিটির গুরুভার আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক-এর কাঁধে। বেশ কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগে প্রশংসিত হয়েছেন। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলো নিয়ে টুর্নামেন্টের মাধ্যমে প্রতিভা অন্বেষণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন অচিরেই। ফুটবল অঙ্গনে সক্রিয় হওয়ার অভিজ্ঞতা দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে তুলে ধরেছেন এই সংগঠক

আপনার প্রচেষ্টায় তিন বছর ধরে এগিয়ে চলছে বাফুফে এলিট অ্যাকাডেমির কর্মকান্ড। ইতিমধ্যে এর সুফলও পেতে শুরু করেছে দেশের ফুটবল। অথচ প্রায়ই এই অ্যাকাডেমি চালাতে গিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন?

আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক: আমি এখনো বিরক্ত, বিশ্বাস করেন। গত সেপ্টেম্বরে কর্মকা- বন্ধ রেখেছিলাম ছাত্রদের পরীক্ষার কথা ভেবে। ডিসেম্বর থেকে জোড়াতালি দিয়ে আবার শুরু করতে যাচ্ছি। আর্থিক অসচ্ছলতা নিয়ে আসলে কোনো কিছুই করা যায় না। অ্যাকাডেমির জন্য একজন ব্রিটিশ কোচ নিয়োগ দিয়েছি, যার মাসিক বেতন ৯ হাজার মার্কিন ডলার। এটা শুনে অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করছে, কেন এত বেতন দিয়ে এত উঁচুমানের কোচ নিয়োগ দিচ্ছি? ভালো কিছু করতে গেলে তো আপনাকে ভালো চিন্তা করতে হবে। এখন ভালো কিছু করতে গেলেও দেখছি সমালোচনা হয়। কী করলে আসলে সমালোচনা হবে না, সেটা আমি জানি না। সবাই যদি একটু ইতিবাচক চিন্তা না করে, তাহলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এখানে ফেডারেশনকে যেমন ইতিবাচক থাকতে হবে, তেমনি মিডিয়ায়ও ফুটবলটা থাকতে হবে ইতিবাচকভাবে। তবেই মানুষ ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হবে।

অনেকগুলো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। এর মধ্যে বেশ আলোচিত হয়েছে অর্থের বিনিময়ে অ্যাকাডেমিতে ফুটবল প্রশিক্ষণের উদ্যোগ। শুরুতে তো বেশ সমালোচিত হতে হয়েছিল আপনাকে?

মানিক : শুরুতে তো কী পরিমাণ সমালোচনা হয়েছে, বলে বোঝানো যাবে না। অথচ দেখেন, এখন মানুষের এটা কী আগ্রহ? শুরুতে মানুষ হেয় করে বলেছেন কয়জন অভিভাবক টাকা দিয়ে তার সন্তানদের ফুটবল শেখাবেন। অথচ এখন সন্তানদের ভর্তি করানোর জন্য লাইন পড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই আগ্রহীদের ফোন রিসিভ করতে হচ্ছে। এখন তো আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি প্রতিটি বিভাগে এ রকম অ্যাকাডেমি শুরু করব। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলায় করব। এর সুফল হচ্ছে, এই অ্যাকাডেমি পরিচালনায় বাফুফের একটা পয়সাও খরচ করতে হচ্ছে না; বরং এখান থেকে অর্জিত অর্থ বাফুফের কোষাগারে জমা পড়ছে। প্রতিটি বিভাগে অ্যাকাডেমির কর্মকা- শুরু হলে সেই সব বিভাগের অন্তত ছয়জন কোচের কর্মসংস্থান হবে। আর অভিভাবকরাও নির্দ্বিধায় বাফুফের অধীন অ্যাকাডেমিতে তাদের সন্তানদের ফুটবল শেখাতে পাঠাবেন। যখন নিজ নিজ জেলায় এ রকম কর্মকা- চলবে, তখন সাবেক অনেক ফুটবলারও কোচিংয়ের প্রতি আগ্রহী হবেন, নানা রকম কোচেস কোর্স করবেন। এতে কিন্তু সামগ্রিকভাবেই ফুটবলের উন্নয়ন ঘটবে।

উঁচুমানের কোচ নিচ্ছেন। তাকে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারবেন তো?

মানিক : ঢাকায় এলিট অ্যাকাডেমিতে সর্বোচ্চ ৬০ জনের বেশি ছাত্র আমরা রাখতে পারছি না আবাসনের অভাবে। তাই বিকল্প চিন্তা করছি। প্রয়োজনে বাসা ভাড়া করে আরও ছাত্র নেব। তবে তিনি কেবল এলিট অ্যাকাডেমি নিয়েই কাজ করবেন না। বাফুফের অধিভুক্ত যেসব অ্যাকাডেমি সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে, সেগুলো থেকে খেলোয়াড় স্কাউটিং করে প্রতিভা তুলে এনে পরিচর্যা করার দায়িত্বও তার থাকবে। এ কারণেই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলমান ২০০ নিবন্ধিত ফুটবল অ্যাকাডেমি নিয়ে একটা বড় আকারে টুর্নামেন্ট আয়োজন করব।

নতুন এই উদ্যোগটা সম্পর্কে আরেকটু খোলাসা করে বলবেন?

মানিক : দেখেন, অ্যাকাডেমির কোচের বেতনটা ফিফা দেবে। তাই এটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। তা ছাড়া ট্যালেন্ট হান্টের জন্যও ফিফার একটা বরাদ্দ থাকে। এগুলো ব্যবহার না করলে একটা সময়ের পর বরাদ্দ ফেরত চলে যায়। বাফুফে প্রায় ২০০ ফুটবল অ্যাকাডেমিকে বিভিন্ন স্তরে নিবন্ধন দিয়েছে। তবে শুধু নিবন্ধন করে বসে থাকলে চলবে না। তারা ঠিকঠাক ফুটবল নিয়ে কাজ করছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্বও আমাদের। তাই আমরা প্রতি বছর একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করব। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, নকআউট ভিত্তিতে প্রথম পর্ব করার। তবে সেই ভাবনা থেকে সরে এসে আমরা অ্যাকাডেমিগুলোকে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলাব। তাতে বাচ্চাদের খেলার সুযোগ বাড়বে। তা ছাড়া গ্রুপের খেলা শেষ হয়ে গেলে পরের ধাপে উত্তীর্ণ হওয়া অ্যাকাডেমিগুলো চাইলে বাদ পড়া অ্যাকাডেমিগুলো থেকে ফুটবলার নিতে পারবে। তাতে করে দেখা যাবে চূড়ান্ত পর্বে যে দুটি অ্যাকাডেমি ফাইনাল খেলবে, সেই দুটি দলে আসরের সেরা ৩০ জন ফুটবলারই খেলবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা কিন্তু অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে পাব, যাদের এলিট অ্যাকাডেমিতে রেখে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তোলা হবে। এই পুরো পরিকল্পনা আমরা ফিফার কাছে পাঠানোর পর তারা খুব প্রশংসা করেছে এবং আশ্বাস দিয়েছে এটা করতে যদি বরাদ্দ বাড়াতে হয়, সেটাও তারা বাড়াবে।

বড় উদ্যোগই নিতে যাচ্ছেন। তবে ট্যালেন্ট হান্ট হয়ে যাওয়ার পর তো আপনিই বিপদে পড়বেন। এমনিতেই আপনাদের মাঠ সংকট, আবাসন সংকট। আর্থিক সংকট তো আছেই।

মানিক : দেশের একটা পূর্ণাঙ্গ ফুটবল স্টেডিয়াম না থাকাটাই বড় আক্ষেপ। আমাদের দেশে ফুটবলের সম্ভাবনাটা অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যায় ভালোমানের মাঠ না থাকায়। ফুটবলের নিজস্ব মাঠ না থাকার দায় আমি মনে করি বাফুফে থেকে শুরু করে সবার। মিডিয়াও এই দায় এড়াতে পারে না। যদি ফলাও করে মাঠের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আসত, তাহলে এই সমস্যা মুহূর্তেই সমাধান করে দিতেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আসলে কোনো পর্যায় থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে মাঠের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বোঝানো হয়নি কখনো। তা ছাড়া মাঠ, আবাসন সংকট নিরসনে আমাদের উদ্যোগগুলোই নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। কক্সবাজারে ফিফার অর্থায়নে আমরা সেন্টার অব এক্সেলেন্সি করার পথে অনেকটা এগিয়েছিলাম। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় আমাদের জমিও বরাদ্দ দিয়েছিল। অথচ কিছু ব্যক্তি ফিফায় চিঠি লিখে তাদের ভুল বার্তা দিয়েছে। আমরা নাকি বন কেটে এই স্থাপনা করতে যাচ্ছি। এটাই যদি হতো, তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয় কেন আমাদের ২০ একর জমি বরাদ্দ দিত। আসলে যারা ফুটবলের উন্নতি চায় না, তারাই ফিফাকে ভুল বোঝাচ্ছে।

নিজস্ব স্টেডিয়াম না থাকার দায় তো বাফুফেকেই বেশি নিতে হবে?

মানিক : আমি আবারও বলিছ, এই ব্যর্থতা একক কারও নয়। এ দায় সবার। আগেই তো বললাম, প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্টেডিয়ামের প্রয়োজনীয়তাই বোঝানো হয়নি কখনো। তাকে বোঝানো গেলে অনেক আগেই এই সমস্যা কেটে যেত।

বাফুফেতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন তিন বছর হলো। অনেক রকম অভিজ্ঞতাই তো হলো। ফুটবল নিয়ে কি সত্যি স্বপ্ন দেখা যায়?

মানিক : কেন যাবে না। আমি তো স্বপ্ন দেখি। তবে একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। আর সুফলের জন্য সময় দিতে হবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করে সঠিকভাবে এগোনো গেলে এ দেশে ফুটবলে সফলতা পাওয়া সম্ভব। কারণ এ দেশের আছে বিপুল জনসংখ্যা। ১৮ কোটি মানুষের মধ্য থেকে ৩০ জন ভালো ফুটবলার বের করা যাবে না, এটা আমি মানি না।

ধরেন সরকার আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী সব করে দিল, আপনি কি পারবেন সত্যিকারের উন্নতি করতে?

মানিক : অবশ্যই পারব। এখানে আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে কী হয়েছে, সেটা নিয়ে কথা বলব না। সরকার যদি আমাকে একটা বিকেএসপি বরাদ্দ দেয়, তবে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আমি খেলোয়াড় সংকট দূর করে দেব। তবে আবার বলছি, উদ্যোগ বা পরিকল্পনা এখনই করে কাজ শুরু করে দিতে হবে। তাহলেই ১০ বছর পর এর সুফল মিলবে।