মালদ্বীপের মধ্যপ্রাচ্যমুখী কূটনীতি

১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শপথ নিলেন মালদ্বীপের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুইজ্জু। মালদ্বীপে যখন মোহাম্মদ মুইজ্জু ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন তখন দেশটিতে রাজনীতিবিদরা ‘চীনপন্থি’ ও ‘ভারতপন্থি’ দুইভাগে বিভক্ত। বিশ^ মিডিয়া মোহাম্মদ মুইজ্জুকে ‘চীনপন্থি’ বলে আখ্যায়িত করছে। ‘চীনপন্থি’ ট্যাগের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারে তার সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্ত ভারত সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। মোহাম্মদ মুইজ্জুর ‘দৃঢ়তা’ ভারতকে বিচলিত করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।  গত এক দশকে দেশটিতে চীন ও ভারতের প্রভাব জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। চীন-ভারত দুই দেশের বিনিয়োগ ও উপস্থিতি এমনভাবে রয়েছে যে, কোনো একটি দেশকে অগ্রাহ্য করা নতুন সরকারের কাছে প্রায়ই অসম্ভব। ফলে যারা মহাসাগরীয় ভূ-রাজনীতির ওপর নজর রাখেন তাদের মূল আগ্রহের জায়গা, নতুন রাষ্ট্রপতি মুইজ্জু কীভাবে চীন-ভারতকে ভারসাম্য করবেন?

মালদ্বীপে চীন-ভারতের এই প্রতিযোগিতার মধ্যেও পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উদে¦গ ও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। মালদ্বীপে চীনা নজরদারি অবস্থান কাতারের দোহায় অবস্থিত মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটির চলাচলের ওপর নজর রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত সবাই একে অপরের মালদ্বীপ সংযোগকে সন্দেহের চোখে দেখে। 

মালদ্বীপ মাত্র ৫ লাখ জনগোষ্ঠীর বাস। মালদ্বীপে প্রায় সবাই মুসলিম ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব রয়েছে। জাতিগতভাবে তারা বেশ শান্তিপ্রিয় জাতি। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তাদের উদ্বেগ বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে মালদ্বীপের তরুণ স্কলাররা পশ্চিম বিশ্বে পড়াশোনা করছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে গর্বের সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু গত দশক ধরে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলে মালদ্বীপের সমাজ  চীনপন্থি ও ভারতপন্থি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি বিনিয়োগ এমনকি রাষ্ট্রীয় পলিসি ঠিক করতেও রাজনীতিবিদরা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। পরাশক্তিদের হেজেমনি প্রায়শই ছোট দেশগুলোকে স্বাধীনভাবে পলিসি ঠিক করতে দেয় না। ফলে মালদ্বীপ তার অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা থেকে বের করে এনে ভিন্ন কোনো দেশের প্রতি ঝুঁকতে পারে। সেক্ষেত্রে মালদ্বীপের পছন্দের দেশ হতে পারে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও মালদ্বীপের গুরুত্ব কম নয়।

মালদ্বীপ কোনোভাবেই শুধুমাত্র একটি বিনোদনের গন্তব্য নয়। ভারত মহাসাগরের ম্যারিটাইম জিওপলিটিক্সের গুরুত্ব ‘কোহিনূর হীরা’র তুলনীয়। পারস্য উপসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যিক রুট রয়েছে। হরমুজ প্রণালি থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটগুলোর ওপর নজর রাখতে মালদ্বীপ খুবই কৌশলগত ভূখন্ড। আরব দেশগুলোর তেল বাণিজ্যকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট এবং চোকপয়েন্টগুলোতে নজরদারি করতেও মালদ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ দেশ। ফলে শুধু চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রই নয় উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও মালদ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। 

ভারত মহাসাগরে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাডেজি ঘোষণার পর ইন্দো-প্যাসিফিক যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে উপসাগরীয় দেশগুলোও নড়েচড়ে বসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হওয়া ও সৌদি আরবের জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ তাই নির্দেশ করে। মালদ্বীপকে নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রায়শই ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ফোকাস করে এবং দেশটিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাব ও আগ্রহকে আমলে নেওয়া হয় না। কিন্তু মালদ্বীপে কূটনীতি, বিনিয়োগ ও সংস্কৃতিতে দেশগুলোর প্রভাব অপরিসীম।

১৯৭৬ সাল থেকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আবুধাবি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে মালদ্বীপে বিমানবন্দর উন্নয়ন এবং বর্জ্যকে শক্তি প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এছাড়া মালদ্বীপের কৃষি, পর্যটন এবং সামাজিক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আমিরাতের সহায়তা এবং বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৪ সালে, তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স এবং এখন বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল-সৌদ তার সরকারি সফরে মালদ্বীপ এলে অন্তত এক মাস দেশটির সবচেয়ে বিলাসী তিনটি রিসোর্ট বুকড করে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, মালদ্বীপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জমি কেনার অনুমতি দেওয়ার পর সৌদিরা অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে বলে আলোচনা আছে। এর বাইরে, সৌদি আরব ইসলামের প্রাণকেন্দ্র, পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার আবাসস্থল হিসেবে মালদ্বীপে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করে। ২০১৭-২০২১ সালে কাতারের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধে প্রথম দিকের একমাত্র অ-আরব দেশ ছিল মালদ্বীপ। মালদ্বীপ ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল এমনকি বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয়ের পর, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত মুইজ্জু আরব ইসলামিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুইজ্জু প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সফর শেষ করেছেন। তার সফরের পর আমিরাতের পক্ষ থেকে মালদ্বীপের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়নের জন্য ৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা আসে। এই সফরের আগে মুইজ্জু সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আল-আজালিন আলদোসারির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মোহাম্মদ মুইজ্জু প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে সৌদি আরব যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ধারণা করা যায়, নতুন প্রেসিডেন্ট আরব আমিরাত সফরের পর যেভাবে একটি বিনিয়োগের ঘোষণা পেয়েছেন, সৌদি সফরেও তেমন বিনিয়োগ ঘোষণা পেতে পারে। মুইজ্জু তার দেশ মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটক যারা হালাল বিনোদনকে প্রাধান্য দেন তাদের কাছে জনপ্রিয় করতে সৌদি ও আমিরাতের বিনিয়োগ চাইবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মুইজ্জুর এই পদক্ষেপগুলো মূলত চীন-ভারত প্রতিযোগিতার বাইরে তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের প্রতি মালদ্বীপ যে এতদিন একচেটিয়া কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল নতুন সরকার তার প্রতিদান চাইতে পারে। তবে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টকে ‘প্রতিদান’ দিতে আপত্তি করবে না দুই প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্র। কারণ মালদ্বীপ শুধু তাদের পরীক্ষিত মিত্রই নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ভোট ব্যাংক। এছাড়া মালদ্বীপের কৌশলগত অবস্থান ও পরাশক্তিদের আগ্রহের কারণে মালদ্বীপ হয়ে গেছে এখন ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’। ফলে মালদ্বীপের নতুন প্রেসিডেন্ট সৌদি আরবে রাজকীয় সংবর্ধনা ও বিনিয়োগের ঘোষণা পাবেন বলেন ধারণা করা হচ্ছে।

মালদ্বীপসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীনা বিনিয়োগ ‘অবকাঠামো কূটনীতি’ বলা হয়। যদি সৌদি আরব ও আরব আমিরাত মালদ্বীপের পর্যটন খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে সে বিনিয়োগকে বলা যেতে পারে ‘পর্যটন কূটনীতি’। ‘পর্যটন কূটনীতি’র মাধ্যমে সৌদি-আমিরাত মালদ্বীপে একটি কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।   একদিকে বিনিয়োগের মাধ্যমে মালদ্বীপে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী হবে অন্যদিকে তাদের বিলাসী পর্যটকদের জন্য হালাল বিনোদনের একটি জনপ্রিয় গন্তব্য হতে পারে মালদ্বীপ। ভারত মরিশাসে ভারতীয় অভিবাসীর উপস্থিতি ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকের প্রসিডেন্ট হওয়ার সুযোগে ‘অভিবাসী কূটনীতি’র মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। মালদ্বীপেও সৌদি-আরব আমিরাতের সঙ্গে মালদ্বীপের ধর্মীয় মূল্যবোধের মিল কূটনীতির পথকে সহজ করে দেবে। এছাড়া মুইজ্জুর এই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি সফল হলে, তার দেশ চীন-ভারত প্রতিযোগিতার বিতর্ক ও বিভাজন থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পেতে পারে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের বাণিজ্য রুটকে নিরাপদ করতে মালদ্বীপকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে নিতে পারে। মালদ্বীপে তারা সফল হলে ভারত মহাসাগরীয় দেশ শ্রীলঙ্কা, মরিশাস ও সিসিলিতেও নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। তাদের এই উপস্থিতির মূল লক্ষ্য হতে পারে, নিজেদের তেল বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিজেরা নিশ্চিত করার সক্ষমতা অর্জন করা। অন্যদিকে মহাসাগরীয় দেশগুলো উপসাগরীয় বিনিয়োগ গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে। কারণ এই বিনিয়োগ দেশগুলোর বিলাসী পর্যটকদের ডেকে নিয়ে আসবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক রিসার্চ স্কলার ও কলামিস্ট

Shahadatju44@gmail.com