সাংবাদিক নাদিম হত্যা

মামলায় অগ্রগতি নেই, দ্বিতীয় আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে

জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম হত্যা মামলার ৫ মাস পার হলেও মামলায় নেই কোনো অগ্রগতি। এ মামলার দ্বিতীয় আসামি চেয়ারম্যানের ছেলে রিফাত এখনো ধরছোঁয়ার বাইরে। এদিকে জামিনে এসেছেন ৩ আসামি। মামলার প্রধান আসামি সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর আপিলের প্রেক্ষিতে জামিন স্থগিত হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও মামলায় নেই তেমন কোনো অগ্রগতি। এ মামলার প্রধান আসামি বাবুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে মিথ্যাচার করায় ক্ষুব্ধ জেলার সাংবাদিকরা।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ও পরিবারসূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরের সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যায়। এ ঘটনায় সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী বাদী হয়ে বাবু চেয়ারম্যান ও তার ছেলে রিফাতসহ ২২ জনের নামে ও ২০/২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। র‌্যাব ও পুলিশ ১৭ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড শেষে জেলহাজতে প্রেরণ করে। এ হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মামলায় প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যানসহ কারাগারে রয়েছেন ২২ জন। জামিনে আছেন তিন আসামি। এখনো মামলার দ্বিতীয় আসামি চেয়ারম্যানের ছেলে রিফাত রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি বাবু চেয়ারম্যান, রেজাউল করিম ও মো. মনিরুজ্জামান ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। বাবু চেয়ারম্যানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। আসামিদের জবানবন্দি নিয়ে মিথ্যাচার করায় আইনের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে সাংবাদিক নাদিমের পরিবার। এদিকে প্রধান আসামি মাহমুদুল আলম বাবুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দিলেও তা নিয়ে মিথ্যাচার করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় আইনজীবী ও সাংবাদিকরা। তাই দ্রুত চার্জশিট দাখিল করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি সকলের।

নিহত সাংবাদিক নাদিমের মা আলেয়া বেগম বলেন, 'বর্তমানে সংসার খুব অভাব-অনটনে চলছে। আমরা খুব অসহায়। রোজগারের কোনো লোক নাই। আমার একটা ছেলে ছিল, তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করল ওরা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা, কত বড় বড় মন্ত্রী-এমপির কাছে গিয়েছি। সবাইকে ধরেছি। কিন্তু বিচারের কোনো আভাস পাইতেছি না। সবাই খালি পাশ কাটিয়ে যাইতেছে। এখন মনে হয় সাগর-রুনির মতো আমরা ছেলের বিচারটা সঠিক পাব না।'

মামলার বাদী ও সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন, 'পাঁচ মাস পার হয়ে যাচ্ছে এখনো চার্জশিট বা মামলার তদন্তকার্যক্রম শেষ হয় নাই। আমার স্বামী হত্যা হওয়ার পর আইনমন্ত্রী বলেছিলেন মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই আশ্বাসের কোনো কার্যক্রম হয় নাই। আর এই মামলাটি নিয়ে আমরা খুব ভয়ে আছি। এই মামলা যাতে সাগর-রুনি হত্যা মামলার মতো নষ্ট হয়ে না যায়। যাতে আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার পাই।'

প্রধান আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিষয়ে বাদী পক্ষের আইনজীবী ইউসূফ আলী বলেন, 'চেয়ারম্যান বাবুর পুত্র রিফাত। সে এজাহারভুক্ত দ্বিতীয় আসামি। এখন পর্যন্ত পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে নাই। সে নিজেও কোর্টে সারেন্ডার করে নাই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে পুলিশ তাকে পাঁচ মাসেও খুঁজে পায় নাই। মামলার তদন্ত কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। পাঁচ মাসেও মোকদ্দমার খুব বেশি অগ্রগতি হয় নাই।'

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ) স্বাগত ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, 'সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলাটি প্রথমে বকশিগঞ্জ থানা পুলিশ এবং পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে। আমরা এই মামলাটি পেয়েছি খুব বেশি দিন হয়নি। ডিআইজি স্যার নিয়মিত এই মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। আমরা মামলার প্রতিটি পয়েন্ট খুব গভীরভাবে তদন্ত করছি। আমরা আশা করছি তদন্ত খুব দ্রুত শেষ করতে পারব।'

প্রসঙ্গত, সাংবাদিক নাদিম গত ১৪ জুন পেশাগত দায়িত্বপালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে পৌর শহরের পাটহাটি মোড়ে বাবু চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে হামলার শিকার হন। পরে ১৫ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে গত ১৭ জুন নিহত সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বাদী হয়ে বাবু চেয়ারম্যান ও তার ছেলে রিফাতসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২০/২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। সাংবাদিক নাদিম বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। মামলাটি গত ১৯ জুন তদন্তের জন্য বকশিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছ থেকে জামালপুর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ও এখন সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।