হুঁশিয়ার! যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনকারীদের সতর্ক করেছেন একদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিজ এক্সেলেন্সি ঋষি সুনাক। তিনি বলেন, বিক্ষোভ কর্মসূচিটি ছিল উসকানিমূলক এবং জাতীয় অনুভূতির প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ এতে ছিল না। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন করেছেন যুক্তরাজ্যের মুসলমানরা এবং অভিবাসী বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রুপ। ব্রিটিশ পুলিশ জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের পর শুধু রাজধানী লন্ডনেই কমপক্ষে তিনটি বিশাল মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। এসব মিছিলে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পরের মিছিলের তারিখ ছিল ১১ নভেম্বর। কিন্তু ওই দিন যুক্তরাজ্যে ‘আর্মিস্টিস ডে’, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ ব্রিটিশ সেনাদের সম্মান জানানোর জন্য। শহীদ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা তিনি বলতেই পারেন। যেমন ইসরায়েলের হাতে নিহত ফিলিস্তিনিদের প্রতি হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শ্রদ্ধা নিবেদনও একই যুক্তিতে আমলযোগ্য। তবে ঋষি সুনাক সেটা জানাতে বা করতে অপারগ। কারণ ব্রিটিশরা ইতিহাসচেতনা তাদের কাছে যতটুকু আমলযোগ্য ততটুকুই মানে। অন্যের ইতিহাসচেতনা তারা মানতে রাজি না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বার্তায় ঋষি সুনাক বলেন, ‘আর্মিস্টিস ডে’তে বিক্ষোভ মিছিলের পরিকল্পনা উসকানিমূলকই নয়, জাতীয় অনুভূতির বিষয়ে তা অশ্রদ্ধাবোধের প্রকাশও বটে। ওই দিন বিক্ষোভ হলে শহীদ সেনাদের স্মৃতিস্তম্ভ ও অন্যান্য স্মৃতিস্তম্ভে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে তা হবে যুক্তরাজ্যের জন্য অপমানজনক, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের অবমাননা। হামলা হয়েছে কি না সে খবর অবশ্য জানা যায়নি।
১১ নভেম্বরের মিছিলের অনুমতির জন্য লন্ডন পুলিশের কাছে আবেদন করেছিল আয়োজকরা। আবেদনে সংগঠকরা বলেনি যে, তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ ও পার্লামেন্ট এলাকা দিয়ে মিছিল নিয়ে যাবে। তবে ঋষিজী আঁচ করেছেন, ইসরায়েল ও হামাসের লড়াইকে ঘিরে যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি বর্ধমান সহিংসতা ও ইহুদিবিদ্বেষ (সত্যিকার অর্থে তা ইহুদিবিদ্বেষ নাকি জায়নবাদবিদ্বেষ তা স্পষ্ট নয়) বাড়তে থাকায় সুনাক সাহেব (যেহেতু বিটিশ তথা বিলাতের নাগরিক অতএব সাহেব তো অবশ্যই; ঋষি সুনাকের পূর্বপুরুষ একদা ভারতীয় ছিল এবং তার অবশ্য এখনো স্ত্রী সূত্রে ভারতযোগ আছে।) এ সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ফ্রান্সের সরকারি বার্তা সংস্থা এএফপি লন্ডন পুলিশের হিসাব দিয়ে জানিয়েছে, সহিংসতা ও ঘৃণা ছড়ানোর অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অক্টোবরে শুধু লন্ডনেই ১৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঋষিজী যে হামাস ইস্যুতে তার মতো ব্রিটিশদের অর্থাৎ অভিবাসনসূত্রে ব্রিটিশদের সাবধান করেছেন সেটাই বড় কথা। ফিলিস্তিনে অভিবাসীদের অর্থাৎ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের (ইসরায়েলের বর্তমান ইহুদিদের, যাদের নির্ধারক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জায়নবাদী) উদ্দেশে তিনি যদি এ সাবধানবাণী উচ্চারণ করতে পারতেন তাহলে হোসে সারামাগোর কাবিলকে ঊষর মরুপ্রান্তরে একা ঘুরে বেড়াতে হতো না। কিন্তু যেহেতু ঋষি সাহেব একজন ব্রিটিশ, তার পক্ষে কি ব্রিটিশ জাতীয় মূল্যবোধের বিপরীতে দাঁড়ানো সম্ভব! নিজের কথার জালে নিজেই আটকা পড়বেন তাহলে। ব্রিটিশ প্রাইডের বিপ্রতীপ অবস্থানে তার দাঁড়ানো অসম্ভব, তাহলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ‘আত্মবলিদান’ করা ব্রিটিশ সেনাদের বিপরীতে তাকে দাঁড়াতে হবে। যদুদের মুষল প্রসবের মতো একটি ঘটনা ব্রিটিশ ঐতিহ্য-উপাখ্যানেও আছে, তার নাম বেলফুর উপাখ্যান। আর সেটা রচিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালেই, ১৯১৭ সালে। আর বেলফুর নাটিকা মঞ্চস্থ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরে ১৯৪৯ সালে। এ দুই ঐতিহ্যের অবমাননা কি ঋষিজীর পক্ষে সম্ভব!
আরব নেতাদের (আরবরাও সেমিটিক, অর্থাৎ শামের পুত্র; তবে ব্রিটিশ এবং মার্কিন ভাষ্যমতে তারা সেমিটিক অর্থাৎ শামীয় নয়; এ ন্যারেটিভ তারা অনুসরণ করছে জায়নবাদীদের প্ররোচনায়, বলা ভালো ওল্ড টেস্টামেন্টাল প্রেসক্রিপশনে। হায় শামের পুত্ররা!) সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন। হামাস-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে আরব বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে ব্লিঙ্কেন জর্দানের রাজধানী আম্মান অবধি গিয়েছিলেন। সেখানে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয় লেবাননের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিয়াকাতির সঙ্গে। সফরে জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গেও আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ব্লিঙ্কেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল-থানির সঙ্গেও কথা বলেছেন। এরপর জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্লিঙ্কেন। কাতার, জর্দান, মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিও যোগ দিয়েছিলেন। আরব দেশগুলো হামাসকে নির্মূল করার নামে গাজায় ইসরায়েলিরা যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার নিন্দা জানিয়েছে। ব্লিঙ্কেনের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিন মিন করে যুদ্ধ বন্ধ রাখার কথা বললেও ইসরায়েলিদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করতে পারেনি। এটা করার নৈতিক মনোবল তাদের নেই। ইসরায়েলের সৃষ্টির পর এ কাজ অদ্যাবধি করতে পারেনি তারা। পারবেও না। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসও তো ইসরায়েলিদের মতো গণহত্যার ইতিহাস। উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে রেড ইন্ডিয়ানদের কচুকাটা করার ইতিহাস। এ কাজে সম্মিলিত পাশ্চাত্যের আরেক দেশ স্পেন ও তাদের লাতিনো অনুজাতদের ভূমিকাই মুখ্য ছিল যদিও। তবে উত্তর আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রই মুখ্য সঞ্চালক এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের রক্তরঞ্জিত হাতই বিস্তৃত ছিল। উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাংশে যত ওয়েস্টার্ন উপাখ্যান-উপকথা লিখা হয়েছে তার কোনো না কোনোটিতে রেড ইন্ডিয়ান খলচরিত্র তথা ভিলেন ক্যারেক্টার আছে। মার্কিনিদের কাছে পাখি শিকার করা আর রেড ইন্ডিয়ানদের গুলি করে হত্যা করা একই ব্যাপার ছিল।
এসব ‘টার্কি শুটিং’-এর কোনো এক কাহিনি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এক উপকথা ‘আমারে কবর দিয়ো হাঁটুভাঙার তীরে’ (বারি মাই হার্ট এট উন্ডেড নি)। মার্কিনিদের কাছে টার্কি (মোরগ জাতীয় পাখি) শিকার আর রেড ইন্ডিয়ান শিকার একই ব্যাপার ছিল একসময়। এখন যেমন গাজায় টার্কি শিকারে নেমেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েলি হামলায় অবরুদ্ধ গাজায় লাশের সারি। স্কুলে বিমান হামলা, অ্যাম্বুলেন্সেও বিমান হামলা। নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। মৃতদের অর্ধেকের বেশি শিশু ও নারী। গাজা শিশুদের গোরস্থান, এ কথা বলেছে জাতিসংঘ। গাজা মৃত্যুপুরী। গাজায় ইসরায়েলি টার্কি শুটিং চলছে। নির্বিচার বিমান হামলা থেকে বাদ পড়ছে না হাসপাতাল, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসামরিক নাগরিকদের বাসাবাড়িও। শিশুমৃত্যু পাঁচ হাজারের কাছে। হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলা থামছে না। এ কারণে হামাসও বন্দিবিনিময় স্থগিত রেখেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গাজার ভিডিওতে দেখা গেছে, গাজার দক্ষিণের দিকে চলে যাওয়া একটি রাস্তায় লাশের পর লাশ পড়ে আছে। রয়টার্স, আলজাজিরা, বিবিসি প্রায় সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ খবর আছে, যদিও এসব গণমাধ্যম পল ক্রেইগ রবার্টসের ভাষায় প্রেস্টিটিউট (প্রেস+প্রস্টিটিউট বা বার্তাগণিকা)। গাজা শহর থেকে দক্ষিণের ওয়াদি’র মধ্যবর্তী আল-রশিদ উপকূলীয় সড়কে ভিডিওটি ধারণ করা। এমন দৃশ্য টার্কি শুটিংয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের এমন হত্যাযজ্ঞ থামাতে পারেনি। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করানোর কৃতিত্ব কাতারের। প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য সংঘাতে ইসরায়েলের পক্ষে ইন্ধন জুগিয়েছে। কারণ আধুনিককালে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিবাদের সূচনাকারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর এ সমস্যার প্রণোদক, প্রবর্ধক যুক্তরাষ্ট্র। গেম অব থ্রোনস-এ, যদিও তা একালের ফিল্ম, ব্রিটিশ এবং মার্কিনিদের এমন চরিত্রেরই প্রকাশ ঘটেছে।
সিনেমা আর বাস্তব এক জিনিস নয় বটে, তারপরও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, সিনেমায় বিশেষ করে হলিউডি সিনেমায় জাতীয় মানসের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর কোনো চেষ্টা থাকে না। যেমন উপনিবেশ কায়েমের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অ্যাভাটার বা অবতার নামের জেমস ক্যামেরনের ছবিতে; চিত্রসমালোচকদের ভাষ্য এ রকমই। এ কারণেই হয়তো প্রবচনে বলা হয় যার মনে যা লাফিয়ে ওঠে তা। ফলে চলচ্চিত্রেও তা পরিস্ফুটিত হয়। চলচ্চিত্রেও সুপ্তরাজ্যের (ডিপ স্টেট) গুপ্ত কথাকলির উপস্থাপনা হওয়া উচিত নয়। কোনো লরেন্স অব অ্যারাবিয়া হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে এখনো রাজনৈতিক খেলার ভেলকি দেখাচ্ছে। প্রাচীনকালের এ রকম অসংখ্য উপাখ্যান-উপকথার বিবরণ আছে আদিপুস্তকে (ওল্ড টেস্টামেন্টে)। আছে দাভিদের কথা, আছে শলোমনের কথা। সেসব উপকথার বয়ান আছে আবুল বাশারের রাজাবলী উপন্যাসে এবং আসিরীয়-ব্যাবিলোনীয় পুরাণের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত উপন্যাস মরুস্বর্গে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি, দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের কথা বলেছেন খ্রিস্ট-ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসও, পবিত্রভূমিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তিতে থাকুক, এটা তার ধর্মগুরুসুলভ আহ্বান। কিন্তু এ কথা আদিপুস্তকের দোহাই দিয়েই মানবে না জায়নবাদী নেতানিয়াহু। বাইডেন যতই তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখুক। পুতিন বলেছেন, গাজার হত্যাযজ্ঞে যার প্রাণ কাঁদবে না, তার হৃদয় পাথরের। রুশরা (যেমন ছিল সোভিয়েতরা) বরাবরই জায়নবাদবিরোধী, ইহুদিবিরোধী না হলেও। তারাও দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের গান গায়। অতএব পুতিনের কথায় কান না দিলেও হয়তো চলবে। কলম্বিয়া ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বলিভিয়া, রাষ্ট্রদূত সরিয়ে নিয়েছে চিলি, কিউবা, ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলাও একই পথে হাঁটছে।
বাহরাইন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে বলেছে, বলুক; তারা তো হাগারের পুত্রের বংশধর। চীন-উত্তর কোরিয়াও দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধান চায়। তাতে কী! কালাপানির সম্রাট (ইউএসএ) বলেছে এরা তো এক্সিস অব ইভিল এবং জায়নবাদী ইসরায়েলও সে কথা সঠিক মনে করে। আর ভূতপূর্ব এম্পায়ারের প্রতিনিধি ঋষি সুনাক (জেনতিল হলেও) ইসরায়েলের পক্ষেই কথা বলছেন। জায়নবাদীরা একা নয়, বেলফুরের কুশীলবরা, টার্কি শিকারের দ্রোণাচার্যরা তাদের সঙ্গে আছে। থাকুক, যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় শেষ পর্যন্ত হামাসের জয় হয়েছে। হামাস এখন অনির্মূলযোগ্য এক অস্তিত্ব।
লেখক: সাংবাদিক
tarik69@gmail.com