ব্যাংকঋণের সুদহার ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে 

ব্যাংকব্যবস্থায় তারল্য সংকটের কারণে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ট্রেজারি বিলের সুদহার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ধার আরও ব্যয়বহুল করা হয়েছে। আর ঋণের সুদহার নির্ধারণের অংশ হিসেবে স্মার্ট সুদহারের সঙ্গে যে মার্জিন যোগ করা হয়, গতকাল রবিবার সেটিও বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সব ধরনের সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক, পরিচালক সাঈদা খানম প্রমুখ।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে টাকার সরবরাহ কমিয়ে আনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে গ্রাহকপর্যায়ে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সুদহার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ব্যাংক টাকা ধার নিলে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ গুনতে হবে, যা আগে ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রাহকপর্যায়ে ঋণ নিতে গেলে এখন ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ প্রায় সোয়া ১১ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা আদায় করতে পারবে। কারণ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে স্মার্ট বা সিক্স মান্থ মুভিং এভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল।

প্রধান অর্থনীতিবিদ জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখন সুদহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প দেখছি না। ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়লে আগের চেয়ে কম ঋণ গ্রহণ করবে মানুষ। পক্ষান্তরে যাদের কাছে টাকা রয়েছে বেশি, মুনাফা পাওয়ার আশায় তারা ব্যাংকে টাকা রাখবেন। এতে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি। ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ এবং জুনের মধ্যে ৬ শতাংশে নামাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনে আবারও সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল আসতে কিছুটা সময় লাগে। পাশাপাশি কাক্সিক্ষত ফল পেতে বাধাগ্রস্ত করে বৈরী আবহাওয়া। আগেও আমরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু বর্ষাকাল হওয়ার কারণে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। এখন যেহেতু আবহাওয়াজনিত কোনো সমস্যা নেই, তাই আশা করছি খুব দ্রুতই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরের তিনজন অর্থনীতিবিদ নিয়ে গঠিত নতুন মুদ্রানীতি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল নীতি সুদহার করিডরের ঊর্ধ্বসীমা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) সুদহার ৯ দশমিক ২৫ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নীতি সুদহার করিডরের নিম্নসীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদহার ৫ দশমিক ২৫ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে।

যে পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে এখন ঋণের সুদহার নির্ধারিত হয়, তা হলো ‘এসএমএআরটি’ বা ‘স্মার্ট’ তথা সিক্স মান্থ মুভিং এভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল হিসেবে পরিচিত। প্রতি মাসের শুরুতে এই হার জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী, ‘স্মার্ট’ হারের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ হারে মার্জিন বা সুদ যোগ করে পরবর্তী মাসের ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হতো। পরে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই রেট দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এখন আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে অর্থাৎ ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ যোগ করে সুদহার নির্ধারণ করতে হবে।

চলতি বছরের অক্টোবরে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ৬ মাসের গড় সুদহার (স্মার্ট রেট) ছিল ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ‘স্মার্ট’ হারের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে মার্জিন বা সুদ যোগ করে নভেম্বর মাসে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। সেই হিসাবে ঋণের সুদহার হবে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে নভেম্বরে ঠিক করা ঋণের এই সুদহার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পরিবর্তন করা যাবে না।

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসাই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রয়োজনে জিডিপি কিছুটা কমবে। তারপরও সবার আগে মূল সমস্যায় নজর দিতে হবে। ইতিমধ্যেই আমরা ক্ষুদ্র এবং কৃষিঋণ বিতরণের গুরুত্ব বাড়িয়েছি। এ ছাড়া পদ্মা সেতু, বিভিন্ন রেল এবং সড়কপথের উন্নয়নের কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান সহজ হবে। সুদের হার বৃদ্ধির কারণে নির্বাচনে ব্যাংক থেকে ঋণ কম বের হতে পারে বলেও আশা প্রধান অর্থনীতিবিদের।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে গত ২২ নভেম্বর পুনর্গঠিত মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) প্রথম সভা হয়। সভায় অভ্যন্তরীণ, বৈশ্বিকসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার, তারল্য ও সুদহার পরিস্থিতি এবং নীতি সুদহারের গতিবিধি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ শতাংশে এবং আগামী জুন শেষে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা গত ১১ বছর ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।