বিশ্বকাপ ব্যর্থতার রেশ কাটার আগেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু হয়ে যাচ্ছে দুই টেস্টের সিরিজ। এমনিতেই টেস্ট নিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের আগ্রহ কম, তার ওপর সামনেই জাতীয় নির্বাচন। ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, পরিচালক এমনকি টেস্ট দলের নিয়মিত অধিনায়কও ক্ষমতাসীন দলের হয়ে নির্বাচন করবেন আগামী সংসদ নির্বাচনে। রাজনীতির মাঠ সরগরম, ফেসবুক থেকে চায়ের আড্ডাতেও তাই ক্রিকেট ছাপিয়ে রাজনীতি। এমন নিরুত্তাপ মেজাজেই বাংলাদেশ আজ দুই টেস্টের সিরিজের প্রথমটিতে সিলেটে মুখোমুখি হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের।
সিলেট থেকে নির্বাচিত বিসিবির পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরি নাদেল জাতীয় নির্বাচনে এবারই প্রথম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে। স্বাভাবিকভাবেই টেস্ট ম্যাচের চেয়ে নির্বাচনী মাঠেই তার মন থাকবে। বছর পাঁচেক আগে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের আগে তার যে তৎপরতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল সেসব যে এখন আর থাকবে না সেটা প্রত্যাশিত। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানও নির্বাচনী তৎপরতায় ব্যস্ত, তামিম ইকবালকেই কয়েকদিন অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে ঢাকায় তার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ পেতে। কারণ কিশোরগঞ্জ-৬ আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়া নাজমুলকে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিজ এলাকায় বেশি সময় দিতেই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাকিব আল হাসানও প্রথমবার মনোনয়ন পেয়ে নিজ জেলা মাগুরায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নির্বাচনী প্রচার ও পরিকল্পনায়। সদ্যজাত কন্যার সান্নিধ্য উপভোগ করতে লিটন আছেন নিজের ফ্ল্যাটেই। তামিম ইকবাল নির্বাচন বা ক্রিকেট কোথাও নেই, তবুও তিনি যে আছেন সেটা জানান দিতে সাংবাদিকদের ডেকেছিলেন বাড়িতে। এতকিছুর মধ্যে সিলেটে যে একটা টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে বছর পাঁচেক পর, বাংলাদেশ দল যে প্রায় ৬ মাস পর লাল বলে খেলতে নামছে এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় চক্র শুরু করতে যাচ্ছে; এই নিয়ে খুব সম্ভবত দুই দলের ক্রিকেটার আর কিছু ক্রীড়া সাংবাদিক বাদে কারও খুব একটা আগ্রহ নেই। স্রেফ খেলতে হচ্ছে বলে খেলা।
বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিনের মাথায় সূর্যকুমার যাদব যখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-২০ সিরিজের সংবাদ সম্মেলনে যান, তখন সেখানে মাত্র ২ জন সাংবাদিক ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু ওয়েডের সংবাদ সম্মেলনে কেউই ছিলেন না। সিলেটে অমনটা হয়নি। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে শান্ত’র প্রথম সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক মাত্রাতেই। শান্তও বয়সভিত্তিকসহ বিভিন্ন ধাপে অধিনায়কত্ব করে আসায় সাবলীল ছিলেন মাইক্রোফোনের সামনে। প্রথম সুযোগেই বলেছেন, নেতৃত্ব চান দীর্ঘ মেয়াদে, ‘ক্যাপ্টেন তো ক্যাপ্টেনই। আমার মনে হয় ঐ সামর্থ্য আমার আছে। এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। যে-ই অধিনায়ক হবে যদি লম্বা সময়ের জন্য হয় দল নিয়ে তার পরিকল্পনা সাজাতে সুবিধা হবে। সামনে যে-ই আসবে যদি পর্যাপ্ত সুযোগ পায় অনেক ভালো কিছু করবে। অধিনায়ক লম্বা সময় ধরে থাকলে পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়, আশা করছি বোর্ডও লম্বা সময়ের জন্য দেবে। তবে আমার মনে হয় না খেলোয়াড়রা এটা নিয়ে এত কিছু ভাবছে। যে-ই অধিনায়ক হবে সে তার দায়িত্ব পালন করবে। প্রত্যেকে যার যার ভূমিকা পালন করলে দল ভালো অবস্থানে থাকবে।’ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এই বামহাতি ব্যাটসম্যান, ‘ আমরা প্রায় ১৪টি ম্যাচ খেলব। এ বছর ২টি, পরের বছর আরও ১২টি। যে ২ বছরের কথা বললেন, অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে ম্যাচগুলো দেশের মাটিতে হবে এগুলো জেতা খুব জরুরি। দল হিসেবে এটাই প্রথম লক্ষ্য। সঙ্গে বাইরে কীভাবে ভালো খেলতে পারি। আমাদের যে বোলিং অ্যাটাক আছে, বোলিং আছে, আমরা দেশে জেতার মতো দল। আস্তে আস্তে সেই অভ্যাসও তৈরি করা দরকার। হোমে ম্যাচ জেতা আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে। যেকোনো দলের বিপক্ষে। এরপর দেশের বাইরে কীভাবে অন্য দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি।’
উইকেট নিয়ে আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কাল বাংলাদেশের দুই নির্বাচক, কোচ এবং গ্রাউন্ডস ম্যানেজার মিলে রীতিমতো গবেষণা করেছেন উইকেটের কাছে গিয়ে! টিম সাউদি একাই দেখে তুলে নিয়েছেন ছবি। সংবাদ সম্মেলনে শান্ত উইকেট নিয়ে বললেন, ‘এখানে টেস্ট খুব কম হয়েছে। প্রথম শ্রেণির ম্যাচ যা হয়েছে ধারণা বলতে এতটুকুই। উইকেট নিয়ে খুব লম্বা আলোচনা হয়েছে তা না। উইকেট কীরকম বোঝার চেষ্টা করেছি। হোম অ্যাডভান্টেজ এই কথা বলতে চাই না। প্রত্যেক দলই যখন হোমে খেলে অটোমেটিক কিছু অ্যাডভান্টেজ থাকে। আমরা সেটা নেওয়ার চেষ্টা করব। কাল ম্যাচ শুরু হলে আরও স্পষ্ট বোঝা যাবে, উইকেট কেমন আচরণ করছে। তবে কিছুটা হলেও ধারণা হয়েছে। কী ধরনের উইকেট হবে এটা বলা তো ঠিক হবে না।’
সমস্যা হচ্ছে, ঠিক কোন ধরনের উইকেট হলে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলা যাবে সেটাই হয়তো বুঝতে পারছেন না চ-িকা হাথুরুসিংহে। নতুন কিউরেটর টনি হেমিং তার স্বদেশি গামিনি ডি সিলভার মতো হতে পারবেন কি না সেই পরীক্ষাও হয়নি। উল্টোদিকে নিউজিল্যান্ড দলেও এজাজ প্যাটেল, ইশ সোধি, মিচেল স্যান্টনার তো আছেনই; এমনকি গ্লেন ফিলিপস, রাচিন রবীন্দ্রদেরও হাত ঘোরাবার অভ্যাস কম নয়। বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতকে নিজেদের পাতা ফাঁদে পড়তে দেখে চ-িকা হাথুরুসিংহে সে পথে হাঁটবেন বলে তো মনে হয় না।
মাউন্ট মঙ্গানুইতেও বছর দুই আগে যখন বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের, তখন গণমাধ্যমের খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কাকভোরে উঠে খেলা দেখতে হতো, তখন আবার কভিড সংক্রমণের ঢেউ চলছে, নিউজিল্যান্ডে দীর্ঘ কোয়ারেন্টাইনের ভয়ে সাকিব তামিমসহ অনেকেই যাননি। সেই দলটাই গড়েছিল ইতিহাস, অলক্ষ্যেই। সিলেটে পাঁচ বছর পর মাঠে গড়ানো টেস্টে দর্শক ফেরাতে এমন একটা কিছুই দরকার।