দুর্বল মুমিনদের সহযোগিতা ইমানের দাবি

দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য এবং উত্তম জীবন নির্ভর করে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও সৃষ্টিজীবের যাবতীয় অধিকার আদায়ের ওপর। পক্ষান্তরে মানুষের দুর্ভাগ্য, ক্ষতি, ধ্বংস ও চিরস্থায়ী জাহান্নাম নিহিত মহান আল্লাহ ও মানুষের হক নষ্ট এবং তাদের ওপর জুলুম করার মাঝে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ওইসব জনপদ, তাদের অধিবাসীবৃন্দকে আমি ধ্বংস করেছিলাম, যখন তারা সীমালঙ্ঘন করেছিল এবং আমি তাদের ধ্বংসের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করেছি।’ সুরা আল কাহাফ : ৫৯

বস্তুত মহান আল্লাহর প্রতি ইমান, উপকারী জ্ঞান, সৎ আমল ও ইনসাফের মাঝেই নিহিত সারাবিশ্বের কল্যাণ। আর অন্যায়-অপকর্ম ও মানুষের পাস্পরিক জুলুমের মাঝে আছে সারা জাহানের ধ্বংস। মানুষের কল্যাণ সাধন এবং জীবন ধ্বংসকারী জুলুম থেকে তাকে রক্ষা করতেই আল্লাহতায়ালা শরিয়ত প্রণয়ন, হালাল-হারামের বিধান, ওয়াজিব বিষয় ও পারস্পরিক অধিকারের বর্ণনা দিয়েছেন এবং তা পালন অবধারিত করেছেন যেন মানুষ দুনিয়া ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে সুখী হতে পারে। কাজেই তিনি ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা আবশ্যক আর মন্দ কাজে সহযোগিতা হারাম করেছেন। তিনি পারস্পরিক দয়া ও সৌহার্দ্য রক্ষা করা, মজলুমের সহযোগিতা ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা এবং অকল্যাণকর ও কষ্টদায়ক কাজ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব করেছেন। কেননা এগুলো ছাড়া মানুষের জীবন সংশোধন হতে পারে না। হজরত নুমান বিন বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের দৃষ্টান্ত তাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি, দয়ার্দ্রতা ও সহমর্মিতার দিক থেকে একটি মানবদেহের মতো। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন সমগ্র দেহ তাপ ও অনিদ্রা ডেকে আনে।’ সহিহ বোখারি ও মুসলিম

হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে জালেমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন।’ সুনানে আবু দাউদ

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে এমন স্থানে অপদস্থ করে যেখানে তার সম্মান ক্ষুণœ হতে পারে, মহান আল্লাহ তাকে এমন স্থানে অপমানিত করবেন; যেখানে সে আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবে। অপরপক্ষে, যদি কেউ কোনো মুসলিমকে এমন স্থানে সাহায্য করে যেখানে তার অপদস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে আল্লাহ তাকে এর বিনিময়ে এমন স্থানে সাহায্য করবেন যেখানে তার সাহায্য অধিক প্রয়োজন হবে।’ সুনানে আবু দাউদ

সুতরাং কষ্ট-আনন্দ ও বিপদাপদের সময় এক মুসলিম অপর মুসলিমের সঙ্গে থাকবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।’ সুরা আল হুজুরাত : ১০

মুসলমানদের ওপর আল্লাহতায়ালা পারস্পরিক দয়ার্দ্রতা, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতাকে আবশ্যক করেছেন। অতএব আপনারা দোয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের গাজার দুর্বল শিশু, নারী ও বৃদ্ধ যাদের কষ্ট ও দুর্দশা বেষ্টন করে রেখেছে তাদের সাহায্য করুন; তাদের সাহায্য করুন খাবার দিয়ে, ওষুধ দিয়ে এবং অর্থ ও পোশাক দিয়ে। তাদের প্রয়োজন পূরণ করুন, কষ্ট দূর করুন এবং অনুদানের মাধ্যমে তাদের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ সুরা সাবা : ৩৯

আপনারা তাদের সহযোগিতা করুন, কেননা তারা অধিকার বঞ্চিত এবং তাদের সাহায্য করা আবশ্যক। ফিলিস্তিনি ইস্যুর সমর্থনে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর অন্য মুসলমানদের জন্য বিশেষ কর্তব্য। ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য আল্লাহ অতঃপর মুসলিম মিল্লাত ছাড়া আর কেউ নেই। মহান আল্লাহর তাকওয়া ও তার প্রতি দৃঢ় ইমান ছাড়া অন্য কিছু মুসলিমদের তাদের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।’ সুরা আন-নাহাল : ১২৮

আর আল্লাহ যার সঙ্গে রয়েছেন তার কোনো ভয় নেই। তেমনি ধৈর্য ও আল্লাহর তাকওয়া ছাড়া অন্য কিছু তাদের শত্রুদের অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে পারবে না। ‘তোমরা যদি ধৈর্যশীল হও ও মুত্তাকি হও তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।’ সুরা আলে ইমরান : ১২০

মুসলমানদের উচিত নানা ঘটনাপ্রবাহ ও বিপদাপদ থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং বিচ্ছিন্নতা ও মতবিরোধ পরিহার করে সংঘবদ্ধ থাকা। কেননা মতবিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা হলো দুর্বলতার প্রতীক এবং দ্বীন ও দেশের জন্য ভয়াবহ বিপদ। একতাবদ্ধতা হলো- শক্তিমত্তার প্রতীক। আল্লাহর নীতি ও অনুগ্রহ হলো, তিনি জালেমদের বিপরীতে হকপন্থিদের বিজয় দান করেন এবং অবিচলতা, ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারীদের সাহায্য করেন। আপনাদের ওপর ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাপ্রবাহ ও বিপদাপদ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, সব বিষয় আল্লাহরই ইখতিয়ারে।’ সুরা আলে ইমরান : ১৫৪

আর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর জেনে রাখ যে, বিজয় বা সাহায্য আসে ধৈর্যের সঙ্গে, মুক্তির উপায় আছে কষ্টের সঙ্গে এবং কঠিনের সঙ্গে সহজ জড়িত।’ মুসনাদে আহমদ

কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাকো; আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ সুরা আলে ইমরান : ২০০

হে আল্লাহ! আপনি ইহুদিদের করতল থেকে মসজিদে আকসাকে পবিত্র করুন। এটাকে আপনার আমানত ও জিম্মায় রাখুন, যাতে দখলদার সীমালঙ্ঘনকারীরা এর নিকটবর্তী হতে না পারে। কেয়ামত অবধি আপনার নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে এবং অপরাধীদের শিরকি কর্মকা- থেকে এটাকে পবিত্র রাখুন। আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম গাজার মুসলিম ভাইদের সাহায্য করুন এবং তাদের ছোট-বড় ও নারী-পুরুষদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন। তাদের ওপর অত্যাচারী ইহুদিদের বিজয়ী করবেন না। ইহুদিদের ষড়যন্ত্রকে সংকুচিত ও দুর্বল করুন, তাদের কূটকৌশলকে ধ্বংস করুন। হে আল্লাহ! আপনি ফিলিস্তিনিদের আপনার হেফাজত ও আশ্রয়ে রাখুন। আমিন।

২৪ নভেম্বর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান