পরীক্ষার খাতাও খোলাবাজারে

সমস্ত পরীক্ষার খাতা ছাপানোর একটা নিয়ম রয়েছে। সেই হিসেবে এসএসসি বা এইচএসসির খাতা ছাপানোরও একটা নিয়ম আছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড সরকারি নিয়ম মেনেই কোনো প্রেসকে সেই খাতা ছাপানোর দায়িত্ব দেয়। যে সমস্ত শর্ত পালন সাপেক্ষে কোনো প্রেসকে ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন অবশ্যই দেখা উচিত বোর্ডের দেওয়া সমস্ত শর্ত প্রেসগুলো পালন করছে কি না? বিতর্ক ছাড়াই এমন কথা বলা যায় যে, এই তদারকির শতভাগ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বোর্ডের। এক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নরকম। শর্ত ভঙ্গ করে এখন কুমিল্লা বোর্ডের এসএসসি এবং এইচএসসির খাতা ছাপা হচ্ছে খোলা প্রেসে। যেখানে নেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা। বিষয়টা আরও ভয়ংকর যে, রাজধানীর সূত্রাপুরের একটি প্রেসে খোলামেলাভাবে ছাপা হচ্ছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের খাতা। এক পক্ষের দোষ আরেক পক্ষের ঘাড়ে চাপানোর অভ্যাস অনেকেরই থাকে। এখানেও তাই। যে প্রেস উত্তরপত্র ছাপানোর দায়িত্ব নিয়েছে, সেই এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের স্বত্বাধিকারী আবদুল মান্নানের কথায় এক ধরনের বৈপরীত্য এবং তাচ্ছিল্য প্রকাশ পেয়েছে। একবার তিনি বলেছেন সূত্রাপুরে যে প্রেসে কাজ চলছে সেটাও আমাদের। আমরা কোনো সাব-কন্ট্রাক্ট দিইনি। আর খাতা যেকোনো প্রেসে ছাপলে কী সমস্যা? এটা দিয়ে ঠোঙা বানালেও সমস্যা কী? মূল হচ্ছে ওএমআর শিট, সেটা আমরা নিমতলীর নিজস্ব প্রেসে করছি। আপনারা নিমতলীর প্রেসে আসেন, দেখে যান। আবদুল মান্নানের কাছে নিমতলীর প্রেসের ঠিকানা চাইলে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। আবারও ঠিকানা চাইলে বলেন, ‘কুমিল্লা বোর্ডের লিখিত অনুমতি ছাড়া তো আপনাকে প্রেসে নিতে পারব না।’ এমন বক্তব্য জানা গেল দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘খোলাবাজারে ছাপা হচ্ছে পরীক্ষার খাতা’ প্রতিবেদনে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ বিষয়ে বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ কী বলছেন?

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লার চেয়ারম্যান অধ্যাপক জামাল নাসের বলেন, ‘পরীক্ষার খাতা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। নিজে কাজ করবে এমন শর্ত দিয়েই টেন্ডার দেওয়া হয়। অন্য কোথাও সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের কারখানা পরিদর্শন করে সমক্ষতা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। তার প্রেসে কাজ বেশি থাকলে অন্য কাজ বাইরে দিতে পারত। এই খাতার কাজ কোনোভাবেই বাইরে দেওয়া যাবে না।’

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, পরীক্ষার উত্তরপত্রের ওএমআর শিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই খাতা যেন বাইরে না যায় তা নিশ্চিত করাটা খুবই জরুরি। এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের ঢাকায় ভিন্ন প্রেসে কাজ চলছে বলে বোর্ডেও অভিযোগ জমা পড়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি খাতার নিরাপত্তা বিঘিœত হয়েছে কি না, তা যাচাই করাটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সূত্রাপুরের আফতাব আর্ট প্রেসে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি প্রেসে উন্মুক্তভাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের খাতা ছাপানো হচ্ছে। সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তার বালাই নেই। রাস্তার পাশের এ প্রেসে লোকজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। বুধবার দুপুরে ‘মেঘনা’ সেটের খাতার কাজ চলছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে প্রেসে পাওয়া যায়নি। কর্মচারীরা জানান, সোহেল নামের একজন খাতা ছাপানোর কাজ এ প্রেসে দিয়েছেন। এই প্রেস এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের নয়।

এখন যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার, তা হচ্ছে এই ধরনের খাতা ছাপানোর দায়িত্ব সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না? উন্মুক্ত পরিবেশে  কোনো গোপন বিষয়কে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা যায় কি না? যদি কেউ  নিরাপত্তার বিষয়টি থোড়াই কেয়ার করে, তাহলে বোর্ড কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? অথবা এই পর্যন্ত আদৌ কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কারণ এর আগেও বেশ কয়েকবার খোলাবাজারে খাতা ছাপা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এইসব অনিয়ম-বেআইনি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, আমাদের জানা নেই। এবার কী করা হবে, তাও অজানা। তবে একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মনীতির আওতায় সবকিছুকে রাখা দরকার। আর এই বিষয়টি তো দেশের আগামী প্রজন্মকে ঘিরে। কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন?