পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৬ বছর

থমকে আছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’। দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক এই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির বয়স ২৬ বছরে পদার্পণ করেছে। চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল দুটি পক্ষের মধ্যে। একটি পক্ষ হচ্ছে জনসংহতি সমিতি এবং অন্য পক্ষ হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। চুক্তিটি ক, খ, গ ও ঘ এভাবে ৪টি খণ্ডে বিভক্ত। ক) খণ্ড সাধারণ, খ) খণ্ড পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা ও অন্যান্য বিষয়াবলি। ক) খণ্ডে ৪টি খ) খণ্ডে ৩৫টি গ) খণ্ডে ১৪টি এবং ঘ) খণ্ডে ১৯টি ধারা আছে। এসবের আবার অনেকগুলো ধারার বিভিন্ন উপধারা রয়েছে।

চুক্তির ক খণ্ডের প্রধানতম ধারাটি হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চল ‘উপজাতি’ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তাও এই ধারায় স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তির ২৬ বছরের মধ্যে এই চিত্রের উল্টো জনমিতি আমরা পরিলক্ষিত করছি। সুতরাং ‘উপজাতি’ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা এবং বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা কেবল কাগজে-কলমেই স্বীকৃত। বাস্তবতা হচ্ছে, জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তন ঘটতে শুরু হয়েছে। সর্বশেষ জনশুমারি বলছে, জেলা, সদর উপজলা এবং পৌরসভাগুলোতে পাহাড়ের জুম্ম জনগণের হার ৫০ শতাংশের নিচে চলে গেছে। চুক্তি মোতাবেক, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে পৃথক ভোটার তলিকা প্রণয়ন করে পার্বত্য ৩ জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন করার কথা ছিল। চুক্তির ২৬ বছরেও সরকার সেই ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজই শুরু করতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন গঠন এবং নিষ্পত্তির জন্য আইন প্রণীত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের তরফ থেকে ১ জানুয়ারি ২০১৭-তে ভূমি কমিশনের বিধিমালা ভূমি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এখনো সেই বিধিমালা চূড়ান্ত করেনি। এর ফলে ভূমি কমিশনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। এ ছাড়া ভূমি কমিশনের নেই পর্যাপ্ত তহবিল ও জনবল। চরম সত্য হচ্ছে, সেই ভূমি কমিশন একটি ভূমি বিরোধও নিষ্পত্তি করেনি। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১নং ধারায় বর্ণিত ‘তিন পার্বত্য জেলার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা’ সংক্রান্ত বিষয়টিও অদ্যাবধি বাস্তবায়িত হয়নি।

সূত্র জানায়, ২৭ জুন ১৯৯৮ তারিখ খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের তৃতীয় সভায় পার্বত্য জেলার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বলতে যে সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় তদানুসারে ২০০০ সালে অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু হিসেবে ৯৩ হাজার পাহাড়ি পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের স্ব স্ব জায়গা-জমি প্রত্যর্পণপূর্বক পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির মতে, শরণার্থীদের ৯ হাজার ৭৮০ পরিবার তাদের ভিটেমাটি ও জায়গা-জমি ফেরত পায়নি ও অন্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন ফেনী উপত্যকার মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি ও রামগড় উপজেলায়, মাইনী উপত্যকার দীঘিনালা ও চেঙ্গী উপত্যকার মহালছড়ি উপজেলায় এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন মাইনী ও কাচলং উপত্যকার লংগদু উপজেলায় অবস্থিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের ৪০টি গ্রাম, ভিটেমাটি ও জায়গা-জমি এখনো দখলে রয়েছে।

চুক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ৩ পার্বত্য জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কাঠামো। কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদকে অকার্যকর রেখে পাশ কাটিয়ে ৩ পার্বত্য জেলার প্রশাসনকে পরিচালনা করা হচ্ছে। চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ করার জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। সেই পরিবীক্ষণ কমিটির নির্দিষ্ট লোকবল নেই, এমনকি কার্যালয় পর্যন্ত নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় আছে। মন্ত্রী বাদে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের মধ্যে পাহাড়ের বাসিন্দার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন।

২ ডিসেম্বর, ২০২৩ এই চুক্তির বয়স ২৬ বছর হলো। চুক্তির ২৬ বছরের প্রথম ৩ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। মাঝখানের বিএনপি এবং ওয়ান ইলেভেন সরকার বাদে টানা ৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, আওয়ামী লীগ সরকার। চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে বেশি মেয়াদে ক্ষমতায়ও আওয়ামী লীগ। আর এই চুক্তি করার কারণেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন। বর্তমানে যে টানা ৩ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীও কিন্তু শেখ হাসিনা। তিনিও প্রায়ই বলেন, তার সরকার যেহেতু চুক্তি করেছে, তার সরকারই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। ১৯৯৭ সালের পর যত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। সর্বশেষ ২০১৮-এর নির্বাচনে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। চলতি সরকারের মেয়াদ প্রায় ফুরিয়েছে। দেশে আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কোনো আলোর মুখই দেখল না।

চুক্তির ২৬ বছর পাহাড়ের জুমিয়া মানুষের জীবন তেমন সুখকর হয়নি। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা তিক্ততায় ভরপুর। ২৬ বছরে পাহাড়ে অনেক জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট, বগাছড়ি, লংগদু, খাগড়াছড়ি ও মহালছড়ির  পাহাড়ি মানুষের বহু গ্রাম ও বসতভিটা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটি জেলা শহরও সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হয়েছে। এসব হামলা ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাবলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অপরাধী শাস্তি পেয়েছে বলে সেই রকম কোনো তথ্য জানা নেই। চুক্তি পরবর্তী ২৬ বছরে উন্নয়নের নামে পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য, ভূ-প্রকৃতি, প্রতিবেশ, বন-বনানীর সর্বনাশ করা হয়েছে। পাহাড়ের ঝিরি ঝর্ণা থেকে প্রাকৃতিক পাথর লুণ্ঠন করে পানির উৎস ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। জুমিয়া মানুষের জুম চাষের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাই প্রায়ই দূরবর্তী পাহাড়ি জনপদে খাদ্যের সংকট সৃষ্টি হয়। নারীদের মাইলের পর মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পাহাড়ে এখনো হাম, ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা অহরহ। জুমিয়া নারীদের ওপর সহিংসতা, নিপীড়নের মতো নৃশংস ঘটনার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। কিন্তু নিপীড়করা বরাবরই বিচারের বাইরে থেকে গেছে।

গত ২ ডিসেম্বর চুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষে দেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের সম্মিলিত প্রয়াসে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ বাস্তবায়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফরম গড়ে তোলা হয়। এই প্ল্যাটফরমটি চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রামকে এক নতুন আঙ্গিক প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য জুমিয়া মানুষই লড়াই চালাবে। দেশের অন্যান্য অংশের লোকজন পাহাড়ি সংগঠনগুলোর মিছিল, সমাবেশে গিয়ে সংহতি জ্ঞাপন করবে। এটাই আমরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যক্ষ করে আসছিলাম। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন নামক প্ল্যাটফরমটি সেই প্রচলিত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে প্রগতিশীল শক্তিগুলোর সমর্থন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সংগ্রামকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এক নতুনতর দিক সংযোজন করেছে। প্ল্যাটফরমটির দুই যুগ্ম সমন্বয়কারী মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন এবং অধ্যাপক ড. খায়রুল চৌধুরী জানাচ্ছেন রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সিলেট বিভাগে তারা সংহতি সমাবেশ ও গণমিছিল সম্পন্ন করেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রগতিশীল ছাত্র-যুবাদের সমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ৪ নভেম্বর ২০২৩ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন চুক্তি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করার মূল স্পিরিট ছিল নিরাপত্তার চশমা দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগের মধ্য দিয়েও নয় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। এই দর্শন ধারণ করেই সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। চুক্তির ২৬ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে সেই স্পিরিটের ক্ষয় দেখা যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যৎ সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নে মনোযোগী হবে।

লেখক: জুম পাহাড়ের সংগঠক

mawZum@hotmail.com