আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিল শেষে বাছাই চলছে। এবার ৩০০ আসনে নিবন্ধিত ২৯ দল ও স্বতন্ত্র মিলে ২ হাজার ৭১৬ জন মনোনয়নের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ ২৯৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। মনোনয়ন দাখিলের প্রক্রিয়া শুরুর আগে জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত কেউই ৩০০ আসনে এবার প্রার্থী দিতে পারেনি। জাতীয় পার্টি ২৮৯টি, তৃণমূল বিএনপি ২২৯টি, বিএনএম ৮২টি আসনে এবং অন্য দলগুলোও কমসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী ট্রেনে চড়েছে। তবে এবার দলগুলোর বাইরে রেকর্ড ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। যা অতীতে কখনো ঘটেনি। রাজনীতির মাঠে অন্যতম বড় দল বিএনপি এবার নির্বাচনের মাঠে না থাকায় ছোট দলগুলো আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ছোট দলগুলোই এখন বড় দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। যা বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে দলগুলো।
যদিও সরকার গঠনের মতো সক্ষমতা দলগুলোর নেই, কিন্তু সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তর দল বা বিরোধী দলের আসনে বসার লড়াইয়ে তারা একে অপরের মুখোমুখি। বলা যায় দুই নম্বর দল হতে তাদের এই নির্বাচনী লড়াই। সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এবার আওয়ামী লীগ, দলের মনোনয়ন না পাওয়াদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা দেয়নি। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিত ও অন্য যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তারা এবার ভোটে প্রভাব ফেলবেন। এতে জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বা বিএনএম-এর মতো দলগুলো বিরোধী দলের আসনে বসার স্বপ্ন দেখলেও স্বতন্ত্রী প্রার্থীদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচনে রাজনীতির মাঠে অন্যতম বৃহত্তর দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের একক প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ছোট দলগুলো মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ এর সংসদ নির্বাচনে তৃতীয় স্থান অধিকারী এরশাদের জাতীয় পাটি নির্বাচনের মাঠে আছে। বিগত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থেকে স্বল্প সংখ্যক আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে ছিল। এবারও দলটি বিরোধী দলের বসার আশাই করছে। যদিও দলটিতে দুই পন্থির বিভাজনের কারণে ভোটে প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারপরও দলটি মনে করে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এর বাইরে তৃণমূল বিএনপি আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার কথা ভেবেছিল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসহ (বিএনএম) অন্য দলগুলো এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে দাবি করছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে যদিও দলগুলো ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু তা তারা পারেনি। তারপরও বিরোধী দলের আসনে বসার স্বপ্ন তাদের আছে। তবে তাদের সে স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-কেন্দ্রিক। ৯১ থেকে ২০০৮ এর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে এ দুটি দলই ঘুরে ফিরে সরকারে ও বিরোধী দলের আসনে বসেছে। তৃতীয় দল বা অন্য দলগুলো এ দুটি দলের হাল ধরেই টিকে আছে। যাদের নির্বাচনী মাঠে বড় প্রভাব ফেলার সক্ষমতা নেই। এবার বিএনপি নির্বাচনে না থাকায় বিভিন্ন মহলে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে এবার সংসদের বিরোধী দলের আসনে কে বসছে? যদিও ভোটের অঙ্ক বিবেচনায় জাতীয় পার্টি আবারও বিরোধী দলের আসনে বসার কথা। অন্য দলগুলো মূলত নামসর্বস্ব, ওয়ান ম্যান শো পার্টি, তবু শঙ্কা তৈরি হয়েছে কয়েকটি জায়গায়। তৃণমূল বিএনপি সাবেক দুই বিএনপি নেতাকে সামনে এনে আলোড়ন তুললেও শোনা যায় ২২৯ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পর বাকি আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো কাউকে তারা পায়নি। একই সঙ্গে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম যুক্তফ্রন্টের নামে তিন দলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে এসেছেন। তারাও ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বলেছিল। মনে হয়েছিল তারাও নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা প্রার্থী দিয়েছে ১৮ আসনে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ৮২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে বলে দাবি করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে তাদের প্রার্থী ৪৯ জন। অবশ্য সাংবাদিকদের কাছে দলটির মহাসচিবও বলতে পারেননি আসলে তাদের দলের প্রার্থী কত। যদিও নবগঠিত দলটির ভোটের কোনো অঙ্ক নেই।
তৃণমূল, কল্যাণ পার্টির দলীয় নেতৃত্বের কিছু ভোট ব্যাংক আছে। যদিও তা নির্বাচনে জয়ী হাওয়ার জন্য কতটুকু কাজে লাগবে তা দেখার বিষয়।
মূলত ছোট দলগুলো গত দুটি নির্বাচনের মতোই সরকারের সঙ্গে থেকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চিন্তা করেছিল। যে সুবিধাটি এতদিন আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোট শরিকরা পেয়ে আসছে। সরকারের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে পারলে তৃণমূল, বিএনএম বা কল্যাণ পার্টির মতো দলগুলোও আগামীতে দ্বিতীয় বৃহত্তর দল হিসেবে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসার পথ সুগম হতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখনো তার ১৪ দলীয় শরিকদেরই আসন ভাগাভাগির বিষয়টি সুরাহা করেনি। ১৪ দলীয় জোটের অনেকেই আলাদা স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন কিনেছে। ফলে জোট শরিকরা নির্বাচিত হয়ে আসা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছে। তাই ছোট দলগুলোর সরকারের সঙ্গী দল হওয়ার স্বপ্ন এখনো ধোঁয়াশায় আছে। এছাড়া অন্য ছোট দলগুলোর মধ্যে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মতো দলগুলোর প্রধানরাই কেবল নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। কারণ আগের নির্বাচনগুলোতে তারা বিজয় দেখেছে। এর বাইরে এই দলগুলোর প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। দলগতভাবে বিগত নির্বাচনগুলোতে তাদের ভোটপ্রাপ্তির হার ছিল ২ শতাংশের নিচে। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি না থাকার সুযোগে ছোট দলগুলোর বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন এখনো নির্ভর করছে সরকারি দলের সুযোগ দেওয়ার ওপর। জনগণের ম্যান্ডেটের ওপর নয়।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটেও হাহাকার চলছে। বিগত দুটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), সাম্যবাদী দল ও জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে শুধু সংসদ সদস্যই হননি, পেয়েছেন মন্ত্রিত্বও। কিন্তু এবার কী হবে? আওয়ামী লীগ ২৯৮ আসনে প্রার্থী দিয়ে বসে আছে। জোট শরিকদের জন্য আসন খালি রাখেনি। বিগত ৬টি নির্বাচনের ভোট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ছাড়া বাকি দলগুলো সবাই মিলে ১০ শতাংশের কম ভোট পেয়েছে। ফলে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া আর না নেওয়ায় কোনো যায় আসে না। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে দাঁড়াতেই পারবে না। এ কারণে এসব দল চায় সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে নির্বাচন করতে। যেন কিছু আসনে নির্বাচিত হতে পারেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোটের সঙ্গীদের আভাস দিয়ে রেখেছেন ‘নির্বাচনে জোট থাকবে। সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষে’। ওবায়দুল কাদের এখানে কিছুটা কৌশলী হয়েছেন। কারণ সরকারি দল চাচ্ছে অন্য দলগুলো ভালোভাবে নির্বাচনমুখী হোক। কিন্তু ছোট দলকে কিছু আসনে ছাড় না দিলে যে দলগুলোকে খালি হাতে ফেরত আসতে হবে, সেটাও কিন্তু ভালো দেখাবে না।
শঙ্কার কথা বলছে জাতীয় পার্টি। তাদের নেতারা আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। আসনভিত্তিক সমঝোতার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া তারা মনে করেন, গত কয়েক বছরে কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেওয়া আওয়ামী লীগের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের এই অভ্যাস বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ পেশিশক্তি বা প্রশাসনিক শক্তি কোনোটাই নেই জাতীয় পার্টির। আসন ভাগাভাগি না হলে তাদের লড়তে হবে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে, যা ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলবে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সাতটি দল এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক ‘নৌকা’ ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ইসিকে চিঠি দিয়েছেন। এগুলো হলো জাতীয় পার্টি (মঞ্জু), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (ইনু) ও তরিকত ফেডারেশন। এর কারণ আর কিছু না, দলীয় প্রতীকে ভোট করে তারা জয়ী হতে পারবে না। আর নৌকা প্রতীক চাওয়ার অর্থ হচ্ছে তারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে চায়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে আসন ভাগাভাগি করতে হবে।
কিন্তু সরকার চাচ্ছে এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে। যেহেতু সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে বিদেশি চাপ আছে। এক্ষেত্রে সব দল আলাদাভাবে নির্বাচন করলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাবে। এতে বহির্বিশ্বকে আওয়ামী লীগ সরকার সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে কথা দিয়েছে তা রক্ষিত হবে। কিন্তু সমস্যা হবে তখনই যখন ছোট দলগুলো আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রদের মোকাবিলায় পেরে না উঠবে। কারণ বিগত ১৫ বছর ধরে বর্তমান সরকারের সঙ্গী হয়ে ছোট দলগুলো নির্বাচনের মাঠে আছে। জয়ী হয়েছে সংসদে গেছে। তাদের দলীয় কার্যক্রম তেমন ছিল না। নির্দিষ্ট কিছু আসন বাদে অন্য আসনগুলোর ভোটারের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষার কথা তারা জানে না। ফলে একক ভোট হলে সব কূল হারানোর পথ তৈরি হবে। এ অবস্থায় নৌকা প্রতীক ছাড়া তাদের কাছে বিকল্প কী হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক