দেশের মানুষের মধ্যে আয়-বৈষম্য বেড়েছে এবং এ বৈষম্য গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলে বেশি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন। দেশের বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এ আয়-বৈষম্য কমাতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না বলেও জানান তিনি।
রাজধানীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ৬৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বিনায়ক সেন এ তথ্য তুলে ধরেন। সেমিনারে ‘বাংলাদেশে দারিদ্র্য প্রবণতা এবং নিয়ামকসমূহ : সাম্প্রতিক প্রমাণ থেকে অন্তর্দৃষ্টি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। প্রবন্ধে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কভিড-১৯ মহামারী ও ইউক্রেন সংঘাতকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, এ দুটি কারণ দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তবে এর আগে গত এক দশকে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
প্রবন্ধে বিনায়ক সেন খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেন, দেশে এখন গিনি সহগের মান (আয়-বৈষম্য পরিমাপ পদ্ধতি) শূন্য দশমিক ৫০। শহরাঞ্চলে গিনি সহগের মান শূন্য দশমিক ৫৪ ও গ্রামাঞ্চলে শূন্য দশমিক ৪৫। সে হিসেবে গ্রামের চেয়ে শহরে আয়-বৈষম্য বেশি।
দেশে ভোগের ক্ষেত্রেও অসমতা বেড়েছে বলে জানান বিনায়ক সেন। তিনি বলেন, ২০২২ সালে দেশে জাতীয় পর্যায়ে ভোগ অসমতার ক্ষেত্রে গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩৩৪। শহরাঞ্চলে এ সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৩৫৬ ও গ্রামাঞ্চলে শূন্য দশমিক ২৯১।
গিনি সহগের মান শূন্য হলে বোঝা যায়, সমাজে চূড়ান্ত সমতা আছে। ১ হলে বোঝা যায় চূড়ান্ত অসমতা আছে; শূন্য দশমিক ৫০ অতিক্রম করলে বোঝা যায়, দেশে উচ্চ অসমতা আছে। অর্থাৎ দেশে এখন উচ্চ অসমতা বিরাজ করছে।
এ গবেষক ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলেন, তখন দেশের ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ছিল। তবে গ্রাম ও শহরাঞ্চলের মধ্যে এ নিয়ে বড় ব্যবধান আছে। গ্রামাঞ্চলের ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকলেও শহরাঞ্চলে এই হার মাত্র ১০ দশমিক ১ শতাংশ।
বিনায়ক সেন বলেন, আয়-বৈষম্য বাড়ছে এ কথার অর্থ হলো ধনী আরও ধনী হচ্ছে ও দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে অসমতার প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন। দেশে দরিদ্র ও অদরিদ্র উভয় শ্রেণির মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অদরিদ্র শ্রেণির উন্নতির হার বেশি।
বিনায়ক সেন দেশে দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলো তুলে ধরেন এবং তা থেকে উত্তরণে বেশ কিছু নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি প্রবন্ধে স্মার্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, টেকসই প্রবৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থার বিবেচনায় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সেসব নীতি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুপারিশ তুলে ধরেন।
প্রবন্ধ উপস্থাপনায় তিনি বলেন, দেশে সরকারি ব্যয় বাড়লেও কর-জিডিপির অনুপাত কমে যাচ্ছে। ২০০০-০১ সালে দেশে কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, সে বছর জিডিপির অনুপাতে সরকারি ব্যয় ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, কিন্তু সরকারি ব্যয়-জিডিপির অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ কারণে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।