কোস মিনার— পথ দেখানো মোগল যুগের মাইলস্টোন

বহু দিন ধরে' বহু ক্রোশ দূরে
      বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
            দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একটি শিশির বিন্দু’ নামক কবিতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বেশ কিছুদিন ধরে দূরের পথে চলেছি। সাইকেলে চেপে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে পথচলা শুরু। গন্তব্য ভারতের সর্ব দক্ষিণের বিন্দু তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী। পথিমধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর এবং হিমাচল প্রদেশের পর্বতমালায় চোখ রাখা হয়েছে। সিন্ধু নদের দেখা অবশ্য এ যাত্রা মিলবে না।

পান্ডব আর কৌরবদের রণস্থল কুরুক্ষেত্র থেকে বেরিয়েছি ভোরবেলা। আজকের গন্তব্য দিল্লির কাছের জনপদ মুরথাল। মহাভারতের কুন্তীর আরেক ছেলে কর্ণের আলয় তথা কারনাল জেলা পেরিয়েছি সবে। ভারতের দীর্ঘতম মহাসড়ক এনএইচ-৪৪ এর রাস্তা ধরে চলছি। রাস্তার পাশাপাশি চোখ রাখছি পথের পাশেও। জানি, আজকের পথেই দেখা মিলবে ক্রোশ তথা কোস মিনারের।

কিছুদূর এগিয়ে দাহার খানিকটা দূর থেকেই লম্বা এক রক্তিম স্তম্ভে চোখ আটকাল। এই সেই কোস মিনার! ভারতীয় উপমহাদেশকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কিংবা জি টি রোডের বেশ কিছু জায়গায় এখনো সটান দাঁড়িয়ে আছে এসব দূরত্ব নির্দেশক স্তম্ভ। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে মধ্য এশিয়ার কাবুল পর্যন্ত এক সময় বিস্তৃত ছিল এই সড়ক। দেশ, সীমান্ত, ধর্ম, রাজনীতি— এসবের বেড়াজাল গলে এই এক সড়কেই এখন এন্তার নিয়ম, অনেক সীমান্ত।

বাংলা সাহিত্যের নানান শাখায় ‘ক্রোশ’ শব্দটির বহুল ব্যবহার ছিল

‘কোস’ মূলত সংস্কৃত শব্দ। এক কোস বা এক ক্রোশ হলো দুই মাইল কিংবা ৩.২০ কিলোমিটারের সমান। কোস শব্দটি খানিকটা অচেনা ঠেকলেও ‘ক্রোশ’ শব্দটির সঙ্গে বাঙালির বহুদিনের জানাশোনা। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি বাংলা সাহিত্যের নানান শাখায় ‘ক্রোশ’ শব্দটির বহুল ব্যবহার ছিল। দূরত্বের একক হিসেবে সেই মধ্যযুগ থেকেই এর উপযোগিতা। দূরত্ব মাপার মাইল কিংবা কিলোমিটার একক চালু হবার আগে লোকে ক্রোশ হিসেব করেই পথ চলত।

মজার ব্যাপার হলো, ‘ক্রোশ’ মাপা হতো যে এককে, সেটি এক এক সম্রাটের শাসনামলে একেক নাম ধারণ করেছিল। সম্রাট বাবরের শাসনামলে ‘গজ’কে বলা হতো ‘বাবুরি গজ’। ‘গজ-ই-শের শাহ’ নামে পরিচিত ছিল শের শাহ আমলের গজ। আকবর রাজসিংহাসনে বসে প্রচলন করেন ‘ইলাহি গজ’। অন্যদিকে, ফার্সি থেকে আগত ‘মিনার’ শব্দের অর্থ স্তম্ভ।

ব্রিটিশরা এসে অবশ্য ‘ক্রোশ’ নামক এই একককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু অত সহজে সফল হয়নি তারা। বাবর পুত্র হুমায়ুনকে সরিয়ে দিল্লির মসনদে বসা সুর সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সুরির আমলেই প্রথম নির্মিত হয় কোস মিনার। শের শাহ সুরি বিখ্যাত ছিলেন দারুণ সব উদ্ভাবন এবং সংস্কারের জন্য। তার হাত ধরে এর শুরু হলেও এটি ছড়িয়ে দেওয়ার ভূমিকা মোগলদেরই।

সুরিদের হটিয়ে মোগলরা ফের রাজাসনে বসলে প্রচুর পরিমাণে নির্মিত হয় এসব মাইলফলক। আগ্রা থেকে পবিত্র দরগা আজমিরের রাস্তায় সম্রাট আকবরের নির্দেশে নির্মিত হয় থামগুলো। মোগল সাম্রাজ্যজুড়ে কোস মিনার ছড়িয়ে দেওয়াটা মূলত সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং শাহ জাহানের অবদান। অবশ্য অন্য এক মতে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের আদেশে মুলতানের ফৌজদার বাকির খান রাজন্যবর্গের চলাচলের রাস্তায় এসব কোস মিনার নির্মাণ করেন। গুগল ম্যাপ এবং মাইলস্টোন বিহীন সে যুগে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব মিনারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

ধারণা করা হয়ে থাকে, সে যুগে মোগল সাম্রাজ্যের তিন হাজার কিলোমিটার রাজপথজুড়ে প্রায় এক হাজারের মতো কোস মিনার ছিল। ক্ষয়ের নানান স্তর পেরিয়ে প্রায় ১১০টির মতো স্তম্ভ এখনো আছে ভারতজুড়ে। অল্প কিছু আছে পাকিস্তানের লাহোরে।

‘লাখাউরি’ নামক লাল ইটে তৈরি কোস মিনারগুলো প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। উপরের দিকে বৃত্তাকার আকৃতির স্তম্ভগুলো দাঁড়িয়ে আছে চতুষ্কোণ কিংবা অষ্টাভুজাকার প্ল্যাটফর্মের উপর। মিনারগুলো উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। লাল ইটের উপর চুনের প্রলেপ দিয়ে তৈরি এসব মিনার। প্রতিটি স্তম্ভেই অনেকগুলো ফোঁকর আছে। ল্যাম্পপোস্ট বিহীন সে যুগে ফোঁকরগুলোতে রাতের বেলা মশাল জ্বালিয়ে কোস মিনারের উপস্থিতি জানান দেওয়া হত।

এখন অবশ্য বিদ্যমান ফোঁকরগুলোতে টিয়া-কবুতরের কিচিরমিচির আর বাকবাকুম শোনা যায়। অন্য মোগল স্থাপনাগুলোর মতো অতটা চোখধাঁধানো না হলেও যোগাযোগ এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর সবচেয়ে অনন্য দিক হলো এর ৩০ ফুট উচ্চতা। মিনারগুলোর মাঝে মোটা দাগে কিছু গঠনগত সাদৃশ্য থাকলেও স্থান এবং নির্মাণকাল ভেদে কিছু পার্থক্যও দেখা যায়। নির্মাণশৈলীতে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও কোস মিনার স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন।

শের শাহ সুরির আমলেই প্রথম নির্মিত হয় কোস মিনার

দূরত্ব মাপার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী, যাত্রী এবং তীর্থযাত্রীদের পথ দেখাতেও সাহায্য করত এসব স্তম্ভ। অধিকাংশ মিনারের পাশেই মুসাফিরদের পানি পানের সুবিধার্থে খনন করা হয়েছিল কুয়া। আর অনেকগুলো কোস মিনারের পাশে যাত্রীদের রাত্রিযাপনের সুবিধার্থে বানানো হয়েছিল ক্যারাভ্যানসরাই। সে যুগে রাজকীয় বার্তা আদানপ্রদানের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল থামগুলো। বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সুবিধার্থে অনেক মিনারেই মজুত থাকত ঘোড়াসমেত অশ্বারোহী। সঙ্গে ক্যানেস্তারা পেটানোর লোকও।  শাসকদের প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ‘রিলে স্টেশন’ হিসেবেও ছিল এর বহুল ব্যবহার।

কিছু কোস মিনার এখনো ভারতের পথেঘাটে আছে। ভারতের উত্তর দিকের প্রদেশগুলোতে এখনো দেখে মেলে এসব মিনারের। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং রাজস্থানের কোস মিনার কালের আঁচড় সামলেও দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কোস মিনার আছে হরিয়ানা রাজ্যে। তবে সময়ের গড়িয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই মূল রাস্তা থেকে সরে গেছে। অবশ্য সেটা হওয়াই স্বাভাবিক।

রাস্তা প্রশস্তীকরণের ডামাডোলে অনেক কোস মিনারের স্থান হয়েছে মূল রাস্তা থেকে দূরে। শিল্পায়ন আর নগরায়নের এই যুগে টিকে থাকা অল্প কিছু কোস মিনার গগনচুম্বী সব স্থাপনার চাপে সৌন্দর্য হারাচ্ছে। এককালে যে স্তম্ভগুলো মানুষকে পথ দেখাত, সেগুলোই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আরকিওলজিক্যাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়া অবশ্য কোস মিনার সংরক্ষণে বেশ তৎপর। 

অনেক পর্যটকের চোখে কোস মিনার এখন অবধি ভারতের অন্যতম বিস্ময়। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার সেই যুগে এসব স্তম্ভ শুধুমাত্র মাইলফলক নয়, একই সঙ্গে সুন্দর প্রশাসনের প্রায়োগিক নজিরও। ধূসর গৌরব আর অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অনেক কোস মিনার। দাহারের এই কোস মিনার ছাড়াও পথ চলতি আরো বেশ কিছু কোস মিনারের দেখা পেয়েছি আমি। নির্মাতাদের উদ্ভাবন পটুতা এবং সমৃদ্ধির সাক্ষ্য এসব মিনার ভারতীয় উপমহাদেশের অতীত ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের। এদের সামনে ইট-সুরকিতে নির্মিত আধুনিক রংচঙে মাইলস্টোনগুলো বড্ড ফিকে আর কেজো মনে হয়।